আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আমাদের পাঠানোর সময় কেঁদে ফেলল এক সহবন্দি

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৮তম পর্ব

বসিরহাট সাব-জেলে থাকাটা সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠছিল। থাকা, খাওয়া, শোয়া – সব কিছুতেই অব্যবস্থা। অতঃপর আমরা ‘গোলমাল’ বাঁধাতে চেষ্টা করলাম। জোরে জোরে গান গাইতে লাগলাম। সব নকশালবাড়িকে নিয়ে গান। সাব-জেলার ওপরতলায় আমাদের ‘বিপদজনক আসামি’ বলে রিপোর্ট করলেন। আমাদের প্রথমে ওয়ার্ড থেকে নিয়ে গিয়ে সেলে ঢোকানো হল। এক সেলে চারজন। আমরা দু’জন, আর দুই জন ডাকাতির অভিযোগে আটক বিচারাধীন বন্দি। তাদের একজনের বুকে-পিঠে অসংখ্য ছড়রা গুলি চামড়ার মধ্যে সেঁধিয়ে আছে। ছোটো ছোটো নকুল দানার মতো ওই দানাগুলো টিপলে এধার থেকে ওধার, ওধার থেকে ওধার যাতায়াত করে। তারা কোথায় ডাকাতি করতে গিয়ে কীভাবে পালিয়েছিল, তার গল্প করে আমাদের কাছে। একবার ছাড়া পেলে কোথায় হানা দেবে এবং কীভাবে কাজ করবে তার গল্প আমাদের অনেক রাত পর্যন্ত অবিরত শুনিয়ে যায়। পাহারাদাররা ধমকে ঘুমিয়ে পড়তে বললে তখন গল্প থামায়। জেলে যা খাবার দেয়, তাদের বিশাল বিশাল দেহে তাতে খিদে মেটে না। আমরা ‘নকু’-রা নাকি খুব ভালো লোক, সব্বাইকে আমরা নাকি দিয়ে থুয়ে খাই, এসব গল্প শুনিয়ে আমাদের  চার-পাঁচ দিনের সেলবন্দি জীবনে দিনের বা রাতের খাবারের বেশিরভাগটা হাঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে ওরাই আত্মস্যাৎ করত।

(গত পর্বের পর)

এরপর আমাদের আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে যেদিন পাঠিয়ে দেয়, সেদিন একজন তো আমার হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল। বলেছিল, “আবার যদি আসেন, জেলারকে বলবেন আমাদের সঙ্গে যেন সেলে আপনাদের রাখে”। এদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে এরা সব জমিহীন কৃষক পরিবারের লোক। জমি-জমা হারিয়ে ডাকাত দলে নাম লিখিয়েছে বেঁচে থাকার তাগিদে। সুন্দরবন অঞ্চলে এদের সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের ধরার পেছনে অনেকের মনে আমরা ডাকাত দলের লোক এই সন্দেহও ছিল। এরা সাহসী, বলবান, লেখাপড়া প্রায় জানে না, অথচ প্রকৃতিগতভাবে এরা ভীষণ সরল মানুষ। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলেও প্রথম দিকে আমরা যে ওয়ার্ডে ছিলাম, ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, এমন অনেক লোকও সেখানে ছিল। ১৯৭২ সালে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ঐতিহাসিক পাগলিতে ‘নকশালপন্থী’ ছাড়াও যারা মারা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন ডাকাতির দায়ে ধরা পড়া বিচারাধীন বন্দিও ছিল। তার নামটা এখন মনে পড়ে না।

আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের সম্পর্কে অগ্নিযুগের বিপ্লবী জীবন পড়তে গিয়ে মনে মনে যে ধারণা ছিল, জেলে পৌঁছে দেখি, বিশালতায় তা আমাদের কল্পনা থেকে অনেক বড়ো। ডান পাশ দিয়ে চলে গেছে আদিগঙ্গার খাল। জেলের ঘরদোর, পাঁচিল – সবটার রং ইটের মতো লাল। প্রথমে লোহার গেট। তার মধ্যে দুটি মানুষ যাওয়া আসা করতে পারে, এমন একটা চৌকো ছোটো গেট। বড়ো গাড়ি ইত্যাদি ঢুকলে পুরো গেটটা খোলার প্রয়োজন হয়, এছাড়া সব কাজই হয় ওই ছোটো গেট দিয়ে। ঢোকার মুখে বাঁদিকে জেলারের দপ্তর। ডান পাশে জেলের ভেতরে আসা-যাওয়া পরীক্ষা করার জন্য নিযুক্ত খাকি ড্রেস পরা জেল কর্মচারীর দল, যাদের বলে ‘জেল সেপাই’। পনেরো বিশ ফুট পর আরেকটা সম্পূর্ণ ঢাকা কাঠের গেট। ওই গেটের জন্যই বাইরে থেকে জেলের ভেতরটা দেখার কোনো উপায় নেই। তারও নিচের দিকে সামনের গেটের মতো একটা চৌকো ছোটো দরজা আছে, যা দিয়ে যাতায়াত চলে।

সেই গেট খুলে আমাদের জেলের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে গেট বন্ধ হয়ে গেল। বিশাল বিস্তৃত আলিপুর সেন্ট্রাল জেলকে পুরোপুরি দেখার তখন আমাদের উপায় ছিল না। সন্ধে নেমে গেছে। উবু হয়ে আমাদের বসিয়ে রাখা হল কিছুক্ষণ। তারপর রেশন কার্ডের চেয়ে একটু বড়ো একটা কার্ড প্রত্যেককে ধরিয়ে দেওয়া হল। আর দেওয়া হল দু’টো করে কম্বল, দু’টো চাদর, একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালা, একটা বাটি ও একটা গ্লাস। ঘণ্টাখানেক বাদে অর্ডার হল আমাদের আমদানি ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার।

জেল সেপাইরা কিন্তু বাইরের পুলিশের মতো নয়। তবে পরনে বাইরের পুলিশের মতোই খাকি ড্রেস। জেল সেপাইদের উর্দ্ধতম দায়িত্বের পদাধিকারীদের ডাকা হয় জমাদার বলে। আর আছে জেলমেট ও পাহারাদার বলে পরিচিত একদল কর্মী। এরা কিন্তু সরাসরি কর্মচারী নয়। মেটরা হল দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের থেকে বাছাই করা কর্মী। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের দেখভাল এদের দায়িত্ব। খদ্দরের সাদা হাফ প্যান্ট ও জামা পরা মেটদের কোমরে থাকে চামড়ার বেল্ট। বেল্টে পেতলের চৌকো চাকতিতে জেলের নাম খোদাই করা। আর পাহারাদাররা হল স্বল্প মেয়াদের সাজাপ্রাপ্তদের থেকে বাছাই করা বন্দি কর্মী। তাদের ডিউটি হল মেটের আদেশ পালন করা, সাধারণ বন্দিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, যেদিন বাইরের লোকেদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ (ইন্টারভিউ) করতে দেওয়া হয়, সেদিন তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসা। এদেরও খদ্দরের হাফ প্যান্ট ও ফতুয়ার মতো জামাই ‘জেল ড্রেস’। ওই মেট ও পাহারাদাররা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাই রাতে ওয়ার্ড যখন জেল সেপাইরা বন্ধ করে, তখন এরাও বিচারাধীন বন্দিদের সাথে ওয়ার্ডের ভেতরে থাকে।

(চলবে…) 

Developed by DXDasia