
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৬তম পর্ব
আমি বুঝলাম, আমাদের রাজনীতির অপব্যবহারে সাধারণ মানুষের মধ্যে এরকমই ধারণা গড়ে উঠেছে। দু’চার কথা বলে এখানে আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কাছে তুলে ধরা অসম্ভব। তাই আমি বললাম, “আপনাদের কথায় হয়তো কিছুটা সত্য আছে, তবে সবটা না। কে শত্রু, কে বন্ধু – তা আমরা বিচার করি অন্যভাবে। আপনি যদি গরিব মানুষদের কেউ হন, গরিব কৃষক বা কারখানার মজুর বা মধ্য আয়ের চাকুরিজীবী মানুষ হন – আপনাকে আমরা শত্রু মনে করি না। কিন্তু যদি আপনি বড়োলোকদের কেউ হন, যদি হন জমিদার জোতদারদের কেউ, তাদের পা চাটা দালাল – তা হলে আপনাকে আমরা শত্রুপক্ষের লোক বলে ভেবে নেব। সে হিসেবে আপনারা দুইজনই, যারা নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পুলিশের কাজ করছেন, তাদের সাধারণভাবে আমরা শত্রুশ্রেণির লোক বলে বিবেচনা করি না। আপনি অন্য কোনো কাজ না পেয়ে পুলিশের কাজ করছেন হয়তো। অন্য কাজ পেলে, যাতে আপনার ও পরিবারের খাওয়া-পরা চলে যায় বলে মনে করতেন, আপনি সে চাকরিকে লুফে নিতেন”।
অন্য ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “শত্রু মনে করেন না, আবার আমাদের মারতেও ছাড়েন না – বলিহারি আপনাদের রাজনীতি”।
(গত পর্বের পর)
আমি তাকে বোঝালাম, “আপনি যখন পুলিশের উর্দি পড়ে লাঠি বন্দুক নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, তখন আপনি আমাদের শত্রু হয়ে ওঠেন। কেননা আপনি তখন আমাদের শত্রুপক্ষের হয়ে কাজ করছেন। কিন্তু আপনি যদি উর্দি পরা না থাকেন, চাকরি জীবনের বাইরের মানুষ হিসেবে আপনার বাড়ি যান, দোকান বাজার করেন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে নিয়ে যান, তখন কিন্তু পুলিশে চাকরি করেন বলেই আমাদের শত্রু হয়ে যান না। অবশ্য যদি আপনি সাদা পোশাকের পুলিশ বা খোচর হয়ে কাজ করেন – তবে সাধারণভাবে আপনার সম্পর্কে রায় দিতে আমাদের সময় লাগবে।”
একজন বলে উঠলেন, “আমরা আপনাদের বন্ধু, খুব মজা লাগছে শুনতে মশাই!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, পক্ষ বিচারে আপনারা সাধারণভাবে আমাদের বন্ধুদের পক্ষের। দু’একজন হয়তো একটি বাড়াবাড়ি রকমের সরকারি দায় পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত হন, এই যা। আচ্ছা, বন্ধুর মতো আপনারাই বলুন না, আমাদের কী কী ভুল নজরে পড়েছে?”
“ভুল মানে?” বলে উঠলেন একজন, “আপনাদের তো সবটাই ভুল। আপনারা মনে করেন, যাকে ‘খোচর’ বলেন, তারাই আপনাদের সব খবর এনে দেয়, আর আমাদের পুলিশেরা গিয়ে গোপন আস্তানা থেকে তাদের গপাগপ ধরে আনে, আপনাদের পেটাপেটি করে। মনে রাখবেন মশাই, পুলিশরা জ্যোতিষী নয়, আপনাদের ভুল, আর আপনাদের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা লোভী লোকেদের জন্যই আমরা সবচেয়ে বেশি খবরাখবর পাই।” একদমে কথা ক’টি বলেই দরজার দিকে তাকিয়ে একটু দেখে নিয়ে গড়িয়া স্টেশনের কাছে আমাদের ‘কমরেড’দের কার কী নাম, কার কী ভূমিকা, গড়গড় করে বলে চললেন। বাইরে জুতোর শব্দ শুনেই তিনি চুপ করে গেলেন। গোয়েন্দা বিভাগের কেউ সম্ভবত ঘরে ঢুকলেন। তিনি আদেশ দিলেন, “এদের নিচে নামিয়ে জিপে তুলে দাও।”
আমরা জিপে এসে উঠলাম, একজন অফিসার আর তিনজন রাইফেলধারীর প্রহরায় আমাদের জিপ আবার বসিরহাটের দিকে রওনা দিল। চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে। বড়ো ইচ্ছে হচ্ছিল, যাদের সঙ্গে আমরা এতক্ষণ কথা বলছিলাম, সেই ‘বন্ধুদের’ মুখগুলি যদি একবার দেখতে পেতাম।
আমরা ভিতর দিকে বসলাম। অফিসার ড্রাইভারের পাশে, রাইফেলধারী পুলিশেরা জিপের পিছন দিকে রাইফেলগুলোকে ভালোভাবে ধরে নড়েচড়ে ঠিক হয়ে বসলেন। কলকাতা শহর ছাড়িয়ে আমাদের জিপ বসিরহাটের দিকে ছুটছে। শহরের লোকজন সবাই স্বাভাবিক। তাদের জন্য সুখের দুনিয়া গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে পুলিশের আদর খাওয়া দু’জন যুবক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে – তাতে বোধ হয় কোনো তাপ-উত্তাপ নেই তাদের।
(চলবে…)
