বসিরহাটের এক কনস্টেবলকে খতম করল চারু মজুমদারের অনুগামীরা

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৪তম পর্ব

পুলিশটি আমার চেনা। আমাদের চাঁপাদানির বাড়ি থেকে সামান্য দূরে একটা পাড়া আটাপাড়া নামে পরিচিত। শ্রমিক ও বাড়িতে কাজ করে এমন নারীদের আধিক্য সেই পাড়ায়। শ্রমিক ও গরিব মানুষের বাস হওয়ায় সেখানে আমাদের যাতায়াত বেশি ছিল। রাজনৈতিক আড্ডা দেওয়ার ফলে বন্ধুবান্ধব হয়ে উঠেছিল অনেক। তেমনই এক বন্ধুর বাড়িতে এই পুলিশটি ভাড়া থাকতেন পরিবার নিয়ে। সম্ভবত চন্দননগরের দিকে ডিউটি করতেন। ওনারা বিহারনিবাসী মানুষ। আমাকে চিনতেন, জানতেন নামধামও। এবার কর্তৃপক্ষ আমার নাম জেনে গেলে হরিপদ আর নাম গোপন করল না। স্বাভাবিকভাবে ওনার নির্দোষ আনন্দের ফল পরিণতিতে আমাদের নাম জেনে গেল পুলিশ। কিন্তু আমরা যতদিন বসিরহাটের ওই পুলিশ গারদে ছিলাম, তিনি ‘অপরাধী’, ‘অপরাধী’ মুখ করে আমাদের সাহায্য করে গেছেন।  

(গত পর্বের পর) 

ইতিমধ্যে ঘটে গেল আরেকটি ঘটনা। চারু মজুমদারের রাজনীতির সমর্থক পার্টি বা কোনো গোষ্ঠী স্থানীয় একজন পুলিশ কনস্টেবলকে খতম করে বসল। সে ঘটনা ওখানকার প্রায় সব পুলিশকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তুলল। পরের দিন সেই কনস্টেবলের মৃতদেহ আমাদের দপ্তরের উঠোনে নিয়ে এল পুলিশের গাড়ি। সেই মৃতদেহের ওপর পড়ে তার স্ত্রীর উথাল-পাথাল কান্না সমস্ত পুলিশ ও উপস্থিত অসামরিক মানুষকে এমন ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল যে তারা বারবার গারদ ঘরের দরজা খুলে আমাদের বের করে নিতে চাইছিল উপযুক্ত বদলা নেবার জন্য। পুলিশের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের কড়া মনোভাব সেই ঘটনা ঘটতে দেয়নি সেদিন। 

কিন্তু সে রাতে বসিরহাটের যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল, তার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে প্রায় সত্তর-আশিজনকে পুলিশ তুলে এনেছিল। মারতে মারতে আমাদের গারদ ঘরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। সেদিন আমরা কেউ বসতে পর্যন্ত পারিনি, সারাটা রাত দাঁড়িয়ে কাটাতে হয়েছিল সব্বাইকে। ওই গারদের এক কোণে একটা ড্রেনের মুখে দু’টো ইট সাজিয়ে আমাদের প্রস্রাব করার জায়গা ছিল। এতজন লোকের প্রস্রাবের গন্ধে এবং ভিড়ের ভারে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল সে রাতে। 

পরের দিন সকাল থেকে প্রায় সন্ধে পর্যন্ত তাদের একে একে নিয়ে ইন্টারোগেশন চলে। সন্ধের মধ্যে দেখা গেল – সাত-আটজনকে রেখে আর সকলকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের সংসারে এখন আমরা প্রায় দশজন। আমাদের কাজ ছিল তাদের দেহে পুলিশের আদরের স্পর্শে ফেটে যাওয়া, ফুটে ওঠা স্থানগুলোর যন্ত্রণা মুক্তিতে সাধ্যমত সাহায্য করা।

সম্ভবত এই ঘটনার দু’দিন পরে পুলিশ পাহারায় একটা জিপে করে আমাদের কলকাতার আন্দুল রাজ রোডের গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হল। জিপ থেকে নামিয়েই ওরা আমাদের দু’চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর অনেকটা সিঁড়ি বেয়ে আমাদের দু’জনকে দু’টো ঘরে বসিয়ে রেখে গেল দু’জনের পাহারায়। তারা সম্ভবত সাদা পোশাকে পুলিশের লোক। তারপর দু’ঘরে অফিসার ধরনের পুলিশের মাধ্যমে চলল জিজ্ঞাসাবাদ। হরিপদকে কী করছে আমার জানার উপায় নেই। তেমনি হরিপদও জানে না আমার অবস্থা। আমার পা দুটোকে বেঁধে দু’হাতের ওপর একটা চেয়ারের দু’টো পায়া রেখে তার ওপরে একজন ওজনদার লোক বসেছিলেন। অফিসারটি কাঠের বা লোহার ডান্ডা দিয়ে আমার হাত-পায়ের গিটে গিটে পিটিয়ে পিটিয়ে ‘ফিজিওথেরাপি’ করছিলেন আর নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। আমাকে ‘থেরাপি’ করে তিনি আবার চলে যাচ্ছিলেন হরিপদ যেখানে ছিল সেখানে। এক সময় তার আসা বন্ধ হল। আমার হাতের ওপর চেয়ারের পা দু’খানি রেখে যিনি বসেছিলেন, তিনি অন্য সঙ্গীকে বলে উঠলেন, “ওনার কাজ কখন শেষ হবে কে জানে! আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিছু বাজার-টাজারও করা দরকার”। দ্বিতীয়জন বলে উঠলেন, “মনে হচ্ছে কাজ বোধ হয় শেষ হয়ে এল”। 

চেয়ারে বসা ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। আমি হাত দু’টো নাড়বার অবস্থায় ছিলাম না তখন। এতদ্সত্ত্বেও জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনাদের বাড়ি কি খুব দূরে?” একজন বলল, ওনাকে ট্রেনে করে ফিরতে হবে। আরেকজন বললেন, কাছেই কোনো পুলিশ কোয়ার্টারে থাকেন তিনি।

(চলবে…)

Developed by DXDasia