জেলে ‘গোলমাল’ বাঁধাতে চেষ্টা করলাম আমরা

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৭তম পর্ব

আমরা ভিতর দিকে বসলাম। অফিসার ড্রাইভারের পাশে, রাইফেলধারী পুলিশেরা জিপের পিছন দিকে রাইফেলগুলোকে ভালোভাবে ধরে নড়েচড়ে ঠিক হয়ে বসলেন। কলকাতা শহর ছাড়িয়ে আমাদের জিপ বসিরহাটের দিকে ছুটছে। শহরের লোকজন সবাই স্বাভাবিক। তাদের জন্য সুখের দুনিয়া গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে পুলিশের আদর খাওয়া দু’জন যুবক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে – তাতে বোধ হয় কোনো তাপ-উত্তাপ নেই তাদের। 

(গত পর্বের পর)

আমার হাতের তালু দু’টোয় রক্ত জমে থিকথিক করছে। হরিপদ আমার একটি হাত নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিয়ে বলল, “উঃ কী অবস্থা করেছে আপনার। আমাকে তো তেমন কিছু করেনি। শুধু আপনার সম্পর্কে হরেকরকম প্রশ্ন করছিল। মাত্র দু-এক মাস হল আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি কতটা জানি আপনার সম্পর্কে বলুন তো? ওরা কি কথা আদায় করবে আমার থেকে?”

গাড়ির সামনে বসা অফিসার পেছন ফিরে একবার আমাদের দেখলেন। বললেন, “কী ফিসফিস করছেন? চুপচাপ বসে থাকুন।” বলেই একটা সিগারেট ধরালেন। ‘বড়োবাবু’ মুখ ফেরাতেই জিপের দুয়ারের দু’পাশে বসে থাকা কনস্টেবল দু’জন দেশলাই থেকে বিড়ি জ্বালিয়ে ফুকফুক টানতে লাগলেন। হাওয়ার গতি তাদের উল্টোদিকে হওয়ায় ধোঁয়ার প্রায় সবটা আমাদের ধুম্রপানের হালকা স্বাদ দিয়ে বাইরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। 

পরের দিন আমাদের কোর্টে তোলা হল। পুলিশ কাস্টডি থেকে এবার আমাদের জেল কাস্টডিতে পাঠানো হল। বসিরহাট মহকুমা সাব-জেলের অতিথি হিসেবে আমরা বিকেলবেলা জেলে এসে ঢুকলাম।

নানা ধরনের কয়েদিতে ঠাসা জেল। একজনের পায়ে আরেকজনকে মাথা রেখে শুতে হয়। নড়াচড়া করার সাধ্য নেই। তার ওপর মশাদের অত্যাচার। হাতের ওপর মাথা রেখে শোয়ার উপায় নেই আমার। হাতটা ফুলে আছে। পরের দিন সকালে দেখলাম, আমার হাতের দু’টো পাতাই ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। সেই অবস্থায় আমাদের ওয়ার্ডের তালা খুলে দেওয়া হল ভোর সাড়ে ছ’টা নাগাদ। জেলের উঠোনে আমাদের লাইন দিয়ে দাঁড়ানোর হুকুম দিলেন জেলের ওই সময়ের ডিউটি অফিসার । তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেন – “অ্যাটেনশান”।

পুরোনো কয়েদিদের সঙ্গে আমরাও খাড়া হয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। ডিউটি  অফিসারের পাশে দাঁড়াল দু’টি যুবক। পরে শুনেছি, ওরা দু’জনেই স্বল্প সাহায্যপ্রাপ্ত আসামী। শুরু হল প্রার্থনা সংগীত। সার বেঁধে দাঁড়ানো সব কয়েদিদের সঙ্গে হাত জোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে আমাদেরও গাইতে হল “জনগণমন অধিনায়ক…পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ”। যস্মিন দেশে যদাচার! আমরাও প্রার্থনা শেষ করলাম। 

বসিরহাট সাব-জেলে থাকাটা সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠছিল। থাকা, খাওয়া, শোয়া – সব কিছুতেই অব্যবস্থা। অতঃপর আমরা ‘গোলমাল’ বাঁধাতে চেষ্টা করলাম। জোরে জোরে গান গাইতে লাগলাম। সব নকশালবাড়িকে নিয়ে গান। সাব-জেলার ওপরতলায় আমাদের ‘বিপদজনক আসামি’ বলে রিপোর্ট করলেন। আমাদের প্রথমে ওয়ার্ড থেকে নিয়ে গিয়ে সেলে ঢোকানো হল। এক সেলে চারজন। আমরা দু’জন, আর দুই জন ডাকাতির অভিযোগে আটক বিচারাধীন বন্দি। তাদের একজনের বুকে-পিঠে অসংখ্য ছড়রা গুলি চামড়ার মধ্যে সেঁধিয়ে আছে। ছোটো ছোটো নকুল দানার মতো ওই দানাগুলো টিপলে এধার থেকে ওধার, ওধার থেকে ওধার যাতায়াত করে। তারা কোথায় ডাকাতি করতে গিয়ে কীভাবে পালিয়েছিল, তার গল্প করে আমাদের কাছে। একবার ছাড়া পেলে কোথায় হানা দেবে এবং কীভাবে কাজ করবে তার গল্প আমাদের অনেক রাত পর্যন্ত অবিরত শুনিয়ে যায়। পাহারাদাররা ধমকে ঘুমিয়ে পড়তে বললে তখন গল্প থামায়। জেলে যা খাবার দেয়, তাদের বিশাল বিশাল দেহে তাতে খিদে মেটে না। আমরা ‘নকু’রা নাকি খুব ভালো লোক, সব্বাইকে আমরা নাকি দিয়ে থুয়ে খাই, এসব গল্প শুনিয়ে আমাদের  চার-পাঁচ দিনের সেলবন্দি জীবনে দিনের বা রাতের খাবারের বেশিরভাগটা হাঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে ওরাই আত্মস্যাৎ করত।

(চলবে…) 

Developed by DXDasia