
চিতে ডাকাত ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত চিত্তেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস
প্রাচীন শহর ব্যারাকপুরের পরতে পরতে লেগে রয়েছে অনেক অতীত ইতিহাস। ইতিহাস আমাদের পিছুটান। নোনা চন্দনপুকুর, জাফরপুর রোড, তালপুকুর… কত যে জায়গা আছে এরকম! মঙ্গল পান্ডের ইতিহাস তো সবাই জানে, কিন্তু অন্যান্য জায়গার ইতিহাসও কম নয়।
মনোহর ঘোষ ছিলেন এই অঞ্চলেরই বাসিন্দা। তিনি ছিলেন রাজা টোডরমলের গোমস্তা, পরবর্তীতে রাজার অনুগ্রহে মুহুরী হয়ে যান। মোগল পাঠানদের যুদ্ধে প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিনি কলকাতার আরেক প্রাচীন অঞ্চল চিৎপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন দেবী চিত্তেশ্বরী-কে। কাশীপুরের বর্তমান 'গান-অ্যান্ড-শেল' কারখানার পাশে তৈরি হল চিত্তেশ্বরী মন্দির। চিত্তেশ্বরী দেবীমূর্তি হল সিংহবাহিনী দুর্গামূর্তি। দুর্গার সঙ্গে অন্য দেবদেবীরা এখানে অনুপস্থিত। দেবীমূর্তির পাশে রয়েছে একটি বাঘ, যা সুন্দরবনের ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণরায়ের দ্যোতক। দেবীর প্রতিষ্ঠাকালে চব্বিশ পরগণা ও কলকাতার এই অঞ্চল যে সুন্দরবনের একটি অংশ হিসাবে জলাজঙ্গলময় ছিল এবং বাঘের উপদ্রব ছিল, এই মূর্তি তারই পরিচয় দেয়। সেইসময় চিৎপুরের যাত্রাদলের থেকেও ডাকাত দলের রমরমা বেশি ছিল। পরবর্তীতে চিৎপুরের এই ডাকাত দলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মনোহর ঘোষ চলে আসেন চন্দনপুকুর।
ব্যারাকপুরকে এখন সাজানো হয়েছে নতুনভাবে। সৌন্দর্যায়ন থেকে রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ধর্মীয় ভেদাভেদ এমন অনেক কিছুই। দুর্গাপুজোয় এখানকার জাঁকজমক দেখার মতো। যার সূচনাটাও বড় অদ্ভুত। গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্বপ্নাদেশে দেখলেন একটি শিবলিঙ্গ, দুধ চন্দন মাখানো তাতে। সেই বছর থেকেই গোপালবাবু এই অঞ্চলে দুর্গাপুজো শুরু করলেন। গঙ্গার ওপার থেকে আসত প্রতিমা। বৈদ্যবাটী থেকে চাতরা এসে নৌকা করে প্রতিমা আনা হত মণিরামপুর। সেখান থেকে ডুলিতে করে মণ্ডপে। সেই সময় থেকে এলাকার প্রতিপত্তি অন্যরকম হতে থাকলেও ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের লোকজন এ বঙ্গে আসতে থাকলে সর্বপ্রথম সাধুখাঁ-দের উদ্যোগে নোনা চন্দনপুকুরে প্রথম বাজার বসল। তার সঙ্গে তালপুকুর, নীলগঞ্জে হাট, আর্দালীবাজার হাট ক্রমশ বদল নিল। ব্যারাকপুর নতুন মোড়কে সেজে উঠল।
আরও পড়ুন
বাবুঘাটের ইতিকথা
এ গেল মনোহর ঘোষ এবং চিত্তেশ্বরী দেবীর গল্প। এখন গল্প হল চিৎপুর নামের মধ্যেই কত কত ইতিহাস লেগে আছে। কিছু জানা, কিছু অজানা। সেকালে চিৎপুর ছিল ডাকাতদের আখড়া। শোনা যায় চিতে অর্থাৎ চিতু ডাকাতের নামে সেখানে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত। চিতু ডাকাতের আসল নাম ছিল চিত্তেশ্বর রায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের নামেই আজকের চিৎপুর রোড।
একদিন স্বপ্নাদেশ পেলে গঙ্গার জলে ভেসে আসা নিম কাঠ দিয়ে দেবী চণ্ডীর বিগ্রহ নির্মাণ করেন চিতু ডাকাত। কালীপুজোর নিয়ম অনুসারেই শুরু হয় পুজো। তখন কলকাতা আজকের তিলোত্তমা ছিল না। কাশীপুরে গঙ্গার নির্জন পাড়ে বড়জোর গুটিকয় মৎসজীবী-ধীবরের বাস। চব্বিশ পরগনা আর কলকাতার এই অঞ্চল তখন সুন্দরবনেরই বর্ধিষ্ণু অঞ্চল ছিল। জল-জঙ্গলের রাজত্বে বাঘেরও উৎপাত নেহাত কম ছিল না। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে যেত বাঘ ভাল্লুকের অত্যাচারে। তাই চিত্তেশ্বরীর মন্দিরে বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়ের মূর্তি চোখে পড়ে। অর্থাৎ বাঘকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করা হচ্ছে। দেবী দুর্গার পুজোর আগেই বাঘকে পুজো করা হয়।
চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পরে তত্কাছলীন জমিদার মনোহর ঘোষ ও নৃসিংহ ব্রহ্মচারী এই মন্দিরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাবর্ণদের বংশধর, হালিশহরের কাশীশ্বর রায়চৌধুরী ও ইন্দ্রা রায়চৌধুরী বর্তমানে এই মন্দিরের সেবায়েত। এখানের দুর্গাপুজো শুরু হয় মহালয়া থেকেই। নিমকাঠের বিগ্রহে অঙ্গরাগ, চক্ষুদান, প্রাণ প্রতিষ্ঠা সবকিছুই। আগে চিতু ডাকাতের সময় নরবলি হলেও পরবর্তীতে ছাগবলি শুরু হয়। এখন তাও বন্ধ হয়ে শুধুমাত্র ফল বলি দেওয়ার রীতি। চিত্তেশ্বরী মন্দিরের ভেতরে চিতে ডাকাতের নরবলি দেওয়ার জায়গাটা এখনও আছে। বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়, ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসেরও যাতায়াত ছিল এই মন্দিরে।
