মণি নদীর তটও ভেঙে গেল…

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬১তম পর্ব

কোনো বাছবিচার না করে আমি এক বুক সমান ধান পাতার আড়ালে গা ঢাকা দিতে দিতে ধানখেতে নেমে পড়ি। হামাগুড়ি দিয়ে অনেকটা এগিয়ে যাই। কিছুটা যেতেই দেখি খেতের পাশ দিয়ে একটা খাল চলে গিয়েছে। খালের ওপারে একটা ছোটো মেয়ে ভেড়া চড়াচ্ছে। ওদিকে রাস্তার ওপারে ওপরে একদল লোকের মারমার কাটকাট চিৎকার। “ওদিকে গেছে ব্যাটা”, “ওইদিকে জলে নেমেছে শালা” – ইত্যাদি নানা আওয়াজ কানে আসছে। রাস্তার পাশে একটা ডোবা ছিল কচুরিপানায় ভরা। মনে হল, সেখানে ওরা বাঁশ দিয়ে কচুরিপানা পিটিয়ে আমার খোঁজ পাবার চেষ্টা করছে। আমি তখন ধানখেতের জলে সারা শরীর ডুবিয়ে খালি নাকটা নিঃশ্বাস নেওয়ার অবস্থায় রেখে একেবারে নট নড়নচড়ন। এদিকে পৃথিবীর যত জলজ পোকামাকড় আমাকে ওদের শত্রু ভেবে আক্রমণ হানতে শুরু করেছে।

(গত পর্বের পর)

বহুক্ষণ কেটে গেল এভাবে। তারপর ধানখেতের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম। যে হৈ-হুলুস্থুলু চেঁচামিচি চলছিল এতক্ষণ, তা আস্তে আস্তে স্থিমিত হয়ে গেল। চারদিক শুনশান। কোনো বিপদ আর এ মুহূর্তে নেই আন্দাজ করে উঠে দাঁড়ালাম। কোনো লোকজন ধারে কাছে নেই। দেখলাম, আমার সেই গ্রামের মা, ইরানের মা, সকালে যে গ্রামে গিয়েছিলাম, সেদিকে তাকিয়ে যেন আমার অপেক্ষায় চেয়ে আছেন। রাস্তার উল্টোদিকে ধানখেতের জলে ভাসছে সেই ডোঙাটি। আমাকে দেখতে পেয়ে মার চোখদুটো আনন্দে ঝিলিক মেরে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে নিজের পরনের কাপড় ভিজিয়ে নিলেন এবং আমাকে ডোঙায় বসিয়ে নিজেই তরতর করে ডোঙা বেয়ে ধানখেতের মধ্যে দিয়ে বাড়ি নিয়ে তুললেন। বাড়ির দাওয়াতে তুলে আমাকে একটা ছেঁড়া মাদুরে বসিয়ে গা মুছিয়ে দিলেন। 

ইরানের বউ ও অন্যান্যরা আমাকে ঘিরে ধরে কৌতূহল মেটাচ্ছে। আমার সারা শরীর রক্তহীন বিবর্ণ হয়ে গেছে দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার সুবাদে। পৃথিবীটা আমার সামনে ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে এল। আমি জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দু’ চোখ খুলে দেখি, ইরানের মা গরম জলে একটা কাপড় চুবিয়ে আমার শরীর মুছিয়ে দিচ্ছে। ইরানের বউ কাঁদো কাঁদো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর দিনের বেলা ঘর পাহারার দায়িত্বে থাকা ছোটো বোনটি আমার আমার পায়ের তলা ঘষে দিচ্ছে তার ছোট্ট দু’টি হাত দিয়ে। আমি প্রকৃত অর্থে তখন আমার জ্ঞান ফিরে পেলাম। 

মণির তটে আমার থাকা আর নিরাপদ নয় বুঝে সে রাতের শেষেই ইরান আমাকে নৌকো করে মণি নদী পার করে বলে গেল, “সাবধানে যেও সোনাদা!” ভোরের হাওয়া তখন আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে যেন বলেছিল, “এইসব আত্মজনদের কখনও ভুলিস না সোনা”।

না, আজও আমি তাদের ভুলিনি, ভুলতে পারিনি। 

(চলবে) 
 

Developed by DXDasia