
সমাজের চোখে ‘সিঙ্গেল মাদার’
ক্লাসের দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল শিশুটি। পেরেন্টস-টিচার মিটিংয়ে তার রোল নম্বর ধরে ডাক দেওয়া হচ্ছে। মায়ের বারবার অনুরোধেও সে নাছোড়। কিছুতেই ঢুকবে না। একটু আগেও এভাবেই তার রোল নম্বর ধরে ডাকা হয়েছিল। কর্মরতা মা যথাসময়ে এসে পৌঁছাতে পারেননি। তাই এখন আর সে শিক্ষকের সামনে যেতে রাজি নয়। “তুমি আগেরবারও সময় মতো আসতে পারোনি, পরের দিন আমায় শুনতে হয়েছিল, তোর মা একা সব পারে শুধু স্কুলের মিটিং-এ সময়মত আসতে পারে না।” ছোট্ট দুটো হাত তখনো সেই মায়ের মুঠোর মধ্যে ধরা। সন্তানের চোখে মায়ের প্রতি অবিশ্বাস। ছোট্ট দুই চোখ মাকে অনবরত প্রশ্ন করছে “তুমি কেন সব পারবে না! সকলে তো বলে তুমি সব পার। তাহলে তোমার ভুল হয় কেন?”
বহু জটিলতা পেরিয়ে ২০১৫ সালে একলা মা সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অভিভাবক হওয়ার স্বীকৃতি পায়। পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে এক তরুণী তার বাবার নাম দিতে অস্বীকার করে। যে বাবা কখনো তার সঙ্গে থাকেনি তার নাম পাসপোর্টে থাকবে কেন? পাসপোর্ট অফিস রাজি হয়নি। সেই তরুণী এবং তার মা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। অবশেষে ২০১৫ সালে নজিরবিহীন রায় বেরোয়। অবিবাহিত মা বা একলা মা সন্তানের সম্পূর্ণ অভিভাবক হতে পারে। শুধুমাত্র মায়ের নামেই সন্তান পেতে পারে পরিচিতি। নিয়মমতে, আধার কার্ড বা ভোটার কার্ডে বাবার নাম না দিলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
সন্তানের মনে প্রথম থেকেই এই ভাবনা গড়ে দেওয়া হয় যে একা মা সর্বহংসহা। সন্তানও সেভাবেই দেখতে চায় মাকে। মায়ের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিও মেনে নিতে পারে না। একাকী মায়ের ওপর ভার হয়ে চেপে বসে নিখুঁত হওয়ার দায়।
এ তো গেল আইনের কথা। কিন্তু তার বাইরে যে চোখ সমাজের গায়ে লেগে থাকে! সে কি স্বস্তিতে বাঁচতে দেয় একা মাকে! ‘সিঙ্গেল মাদার’ শব্দটা আজও কৌতুহল উদ্রেককারী। কেন একা থাকে মা? ডিভোর্সি, বিধবা নাকি স্বামী-পরিত্যক্তা? পরিবারের বাকি লোকেরাই বা থাকে না কেন তার সঙ্গে? যাবতীয় প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাকে ঘিরে। সন্তান ও মায়ের পরিসরটুকু ব্যক্তিগত থাকে না কিছুতেই। বাবার অনুপস্থিতি যেন সেই মা-সন্তানের বৃত্তটিকে কিছুতেই সম্পূর্ণ হতে দেয় না। আর মা স্বেচ্ছায় একা থাকার সিদ্ধান্ত নিলে সূক্ষ্ম, অব্যক্ত মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ চলতে থাকে মায়ের ওপর। “মায়ের ইচ্ছেতেই একা থাকতে হচ্ছে, অর্থাৎ দোষী মা, এই ভাবনা সন্তানের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয় অচিরেই। এক্ষেত্রে বাদ যায় না কেউ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থেকে শুরু করে পরিবারের একেবারে আপন সদস্যদের কথাতেও থাকে দোষারোপ। আরেকটি অবাস্তব এবং রুক্ষ ধারণা সন্তানের মনে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। “মা সন্তানকে নিয়ে একা থাকছে মানেই সে সর্বশক্তিসম্পন্না, সুপারওম্যান।” মাকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয় অনবরত। একলা হাতে সবকিছু সামলালেও ক্ষতবিক্ষত হতে হয় অভিযোগে। “বাবা থাকলে পরীক্ষার রেজাল্ট আর একটু ভালো হতো, আরেকটু বেশি যত্ন পেত শিশু”, এসব অভিযোগ নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। সন্তানের মনে প্রথম থেকেই এই ভাবনা গড়ে দেওয়া হয় যে একা মা সর্বহংসহা। সন্তানও সেভাবেই দেখতে চায় মাকে। মায়ের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিও মেনে নিতে পারে না। একাকী মায়ের ওপর ভার হয়ে চেপে বসে নিখুঁত হওয়ার দায়।
এমনিতেই আমাদের সমাজে একলা মায়েরা আজও প্রান্তিক। পরিসংখ্যানও তেমনটা বলে। কিন্তু সমস্যাটা পরিসংখ্যান নিয়ে নয়। একলা মায়ের জীবন কতটা কঠিন করে দেয় সমাজের চিন্তাভাবনা, সমস্যা হয়ে দেখা দেয় সেটা। সমাজের মূলস্রোতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কি একটুও বেড়েছে! শহরের ছবিটা একটু আরামদায়ক হলে গ্রাম বা মফঃস্বলের চিত্র যথেষ্ট রূঢ়। তিক্ত ও ক্লান্তিকর। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটা সমস্যা দেখা গেছে। যেমন স্বামীবিহীন নারী মানেই সে আর্থিক সঙ্গতিতে কোথাও যেন পিছিয়ে, অথচ স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে ব্যাংকের লোন সব ক্ষেত্রেই তাকে দিতে হয় ইনকাম সার্টিফিকেট। সন্দেহ এবং গুজবের বলয় ঘিরে থাকে একলা মাকে। আত্মীয়-স্বজনদের চোখে লেগে থাকে একটিই প্রশ্ন। “সন্তানের বাবা কোথায়?” এবার তার একটা সঙ্গত উত্তর পাওয়া গেলেই কি যাবতীয় কথা থেমে যায়! মিটে যায় সমস্যা? মোটেই না। “কেন স্বামী দূরে থাকে? নিশ্চয়ই কোন গন্ডগোল রয়েছে।” এজাতীয় কথা কখনো সরাসরি মন্তব্যের আকারে ধেয়ে আসে, কখনো অস্বস্তিকর ঘটনার মাধ্যমেও হানা দেয়।
একলা মায়ের ক্লান্তির সুর পৌঁছে যাওয়া উচিত সন্তানের কানে এবং মনে। তার রুক্ষতা, অসহায়তা শুধুমাত্র যেন আলোচনার বিষয় না হয়ে ওঠে। বরং তাকে উপশমের পথ খুঁজে দিই আমরা।
শুধু সমাজ নয়, পরিবারের মানুষজনও ধরে নেয় একলা মা মানেই সে দশভুজা। শুরুর দিকে ফোন বা মেসেজে পাশে আছি বার্তা দিলেও দেখা যায় মন খারাপ থেকে শরীর খারাপ, একলা মাকে সবটা সামলাতে হচ্ছে নিজেকেই। ব্যতিক্রম নয় কর্মক্ষেত্রও। দুধরনের দৃশ্য দেখা যায়। “একা হাতে সন্তান সামলাতে পারে, তাই যাবতীয় কঠিন কাজ কর্মক্ষেত্রেও সামলে নেবে”, অথবা “বাড়িতে পুরুষ সঙ্গী নেই, সন্তান একা সামলাতে হয়, অর্থাৎ কাজের ক্ষেত্রে তার মনোযোগ সম্পূর্ণ থাকবে না।” সেই কর্মরতা একলা মায়ের মতামতের মূল্য থাকে কি? এদিকে এই পরিস্থিতিতে মাকে দেখতে দেখতে সন্তানের মনেও গড়ে ওঠে বহু ভুল ধারণা। মা সব পারে, মা ক্লান্ত হয় না, মায়ের বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না, এসব ধারণা নিয়েই সে বড়ো হয়। মায়ের প্রতি সহানুভূতিশীলতার মনোভাব গড়ে ওঠে না। যে কোমল হাত মায়ের ক্লান্তি দূর করতে পারত তা-ই রুক্ষ আঙুল হয়ে শুধু প্রশ্ন করে চলে। এই ভাবনা বাধা হয়ে দাঁড়ায় শিশুটির মানবিক বিকাশেও।
এমন এক একলা মায়ের কথা জানি, যে তার সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে গেলে ট্রেনে-বাসে ওড়না দিয়ে নিজের সিঁথি ঢেকে ফেলে, অথবা সিঁদুর পরতে ভোলে না। প্রথমবার সে যখন তার চার বছরের শিশুকে নিয়ে বেরিয়েছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতাসঙ্গী হয়েছিল তার। হোটেলে পৌঁছেই একটি পরিবারের সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে। কথায় কথায় মেয়েটি জানায় সে আর তার সন্তান দুজনেই বেড়াতে এসেছে। মেয়েটি লক্ষ্য করে সেই পরিবারের এক সদস্যার চোখে যায় মেয়েটির সিঁথির দিকে। সিঁদুরবিহীন সিঁথি অপ্রাসঙ্গিক সন্দেহের জন্ম দেয়। পরের দিন থেকেই সেই মা-সন্তানকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে ওই পরিবারটি। কর্মসূত্রে বাইরে থাকে স্বামী, তাই সন্তানকে নিয়ে একা বেড়াতে বেরিয়েছিল সে। বাড়িতে এসে যখন এই অভিজ্ঞতার কথা অন্য সদস্যদের জানায়, তারাও প্রশ্ন করেছিল মেয়েটির ‘দুঃসাহসকে’! পুরুষসঙ্গীবিহীন হয়ে শুধু সন্তানকে নিয়ে কেন বেরলো সে! মেয়েটি পরেরবার আর কখনো এভাবে বেরোনোর সাহস করেছিল কি না জানা নেই। এই ঘটনা বুঝিয়ে দেয় একলা মা আজও কতটা প্রান্তিক! এই প্রান্তিকতা, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মনোভাব সমাজ গড়ে তুলেছে নিজের স্বার্থেই। এই দৃশ্যপটের পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব? আশার কথা ভাবতেই ভালো লাগে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? পরিবর্তনের শুরুটা হওয়া উচিত একেবারে মূল স্তর থেকে। মূলত দুটি জায়গা থেকে। পরিবার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে। যৌথ পরিবার, অণু পরিবারের যে কনসেপ্ট শিশুদের শেখানো হয়, সেই ছক ভাঙা প্রয়োজন। যেখানে পুরুষের উপস্থিতি নেই সেখানে মা-সন্তানের বৃত্তটিও একটি পরিবার। এই ভাবনা থাকা উচিত। একা সন্তান প্রতিপালন করছে মানেই মা সর্বশক্তিসম্পন্না, ভেঙে ফেলা দরকার এই ধারণাও। একাকী মা যতটুকু পারছে, ততটুকুই হোক তার একলা চলার নিশান। একলা মায়ের ক্লান্তির সুর পৌঁছে যাওয়া উচিত সন্তানের কানে এবং মনে। তার রুক্ষতা, অসহায়তা শুধুমাত্র যেন আলোচনার বিষয় না হয়ে ওঠে। বরং তাকে উপশমের পথ খুঁজে দিই আমরা। শুধু মা-সন্তানের বৃত্তটা কঠিন করে না দিয়ে সহযোগিতার কোমল হাত কি রাখা যায় না সেখানে?
____________
মতামত লেখকের নিজস্ব

