সুরমা ঘটকের ‘শিলং জেলের ডায়েরি’ : নারী আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দলিল

“সামান্য কাপড় চুরির কেসে ছ-মাসের জেল হয়েছে কিশোরী মেয়ে পেরিনার। চেরাপুঞ্জির কাছ থেকে দূর ওয়ার বস্তি বা গ্রাম থেকে ও এসেছে। ঘরে মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই আছে। …স্থানীয় কোনও এক বাড়িতে কাজ করত। সেই বাড়ির মালিকেরই কাপড় চুরি করে।…” – সুরমা ঘটকের লেখা দিনলিপি ‘শিলং জেলের ডায়েরি’-র অংশগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়ের কথা। যেখানে তথাকথিতভাবে অসংখ্য দাগী আসামি কী অবলীলায় ঘুরে বেড়াতে পারে প্রকাশ্য রাস্তায়। আর হাজার হাজার হতদরিদ্র, গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ সংশোধনাগারে রয়েছে বছরের পর বছর। তাদের হয়ে লড়ার কেউ নেই। কুড়ি বছর পঞ্চাশ বছর ধরে জেলে থাকতে থাকতে সেখানেই মারা যাচ্ছে শয়ে শয়ে বন্দি। রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বিশ্বাস উঠে যায়।

শিলং জেলের ডায়েরি, প্রকাশক- অনুষ্টুপ

বিংশ শতকের চল্লিশের শেষ, পঞ্চাশের একেবারে শুরু – দেশ তখন সদ্য স্বাধীনতার মুখ দেখেছে। এদিকে সুরমা ঘটক শিলং জেলে বসে লিখে চলেছেন তাঁর দিনলিপি। সে লেখায় খুলে যাচ্ছে আকাশের সুনীল ঢাকনা। ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হচ্ছে সমাজের নিচুতলার মানুষদের কথা। বিশেষত, মেয়েদের কথা। পশ্চিমী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে যখন সদ্যমুক্ত ভারতবর্ষ আধুনিক গণতন্ত্রে দীক্ষিত হওযার পথে পা বাড়িয়েছে, সমাজব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রয়াসে নানা কর্মকাণ্ড চলছে দেশ জুড়ে; তখনই আবার দেশের যুবসম্প্রদায়ের একাংশকে বাধ্যত যেতে হচ্ছে জেলে, নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য অস্বীকার করায়। কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে দেশের সর্বত্র। এই অন্ধকারময় ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার মন্ত্র খুঁজছেন সকলে, যে যার মতো করে। সুরমা ঘটক তাঁদেরই একজন। মহিলা রাজবন্দি। জেল থেকে আকাশ দেখা যায় না, উঠোনও নেই। সেই অস্থির জীবন থেকে সুরমা খুঁজে নিচ্ছেন নতুন নতুন মানুষের নতুন নতুন গল্প, তাঁর জেলখানায় বেঁচে থাকার রসদ। লিখছেন, “ছোট্ট ওয়ার্ডে দুটো ছোটো ছোটো ঘর হাজতি ও কয়েদি মেয়েদের থাকবার জন্য, পাশেই পাগলিদের জন্য দুটো সেল। উঠোন নেই বললেই চলে। আর তারই মাঝে খুবই ছোট্ট একটা যুদ্ধের সময় তৈরি A.R.P.-এর ঘরে হয়েছে রাজনৈতিক বন্দিদের থাকবার ব্যবস্থা। আলো-বাতাসহীন ঘরটায় সারাবছর একফোঁটা রোদ ঢোকে না। এই ঘরেই আমরা ঠাসাঠাসি করে ছিলাম পাঁচজন বন্দি।”

‘শিলং জেলের ডায়েরি’ যেন আশ্চর্য এক জেল-দলিল। বাস্তবের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে সাররিয়্যাল ওয়ার্ল্ড। যে সমান্তরাল বিশ্বের কথা সিনেমায় বলেছেন ঋত্বিক ঘটক। সুরমা ঘটকের লেখা পড়ে জানা যায়, অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে ‘সহবাস’-এর কথা।

‘শিলং জেলের ডায়েরি’ যেন আশ্চর্য এক জেল-দলিল। বাস্তবের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে সাররিয়্যাল ওয়ার্ল্ড। যে সমান্তরাল বিশ্বের কথা সিনেমায় বলেছেন ঋত্বিক ঘটক। সুরমা ঘটকের লেখা পড়ে জানা যায়, অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে ‘সহবাস’-এর কথা। প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে না পারলেও, সেই মানুষগুলোই যেন বন্ধু হয়ে উঠল। হয়ে উঠল দেশকে নতুন ভাবে চালিত করার সমবেত শক্তি। মেয়েদের কথা চালাচালি সেখানে যেন এক আশ্চর্য হাতিয়ার। পাগল, ভিখিরি, খুনি, বারবনিতাদের নিয়েই সেই বন্দি জীবন। তাদের যন্ত্রণার চিৎকার, হঠাৎ ককিয়ে কেঁদে ওঠা সুরমার রাতের ঘুম কেড়ে নিত। ডায়েরি লিখতে লিখতে সুরমার চোখ চলে যেত পাঁচিলের বাইরে। সেখান থেকে অতি অল্প আকাশের আলো দেখা যায়। মাঝে মাঝে পাখিদের কলতান কানে আসে। জেলের ভেতরের যন্ত্রণার কথা ভুলিয়ে দেয় বাইরের সুনীল আকাশ। শিলং – পাহাড়, নদীতে ঘেরা এক অপূর্ব শহর। বাইরে নাশপাতি, পীচ, প্লাম গাছে ফুল কবে শেষ হয়ে গেছে। সিজনফ্লাওয়ার, সুইটপী আর বেড়ার গায়ে সাদা মে ফ্লাওয়ার-এর দিনও শেষ হয়ে লতানো গাছে ফুটেছে থোকা থোকা লাল গোলাপ। ঝোপের মতো গাছে ফরগেটমি নট আর পাহাড়ে পাহাড়ে ক্রিসেনথিমাম ও রডোডেনড্রোন গুচ্ছ। সুরমা ঘটকের মনের ক্যানভাসে যেন আঁকা হচ্ছে অন্ধকার আর আলোর অদৃশ্য সেতু।

তৎকালীন শিলং জেল

পঁচিশে বৈশাখ এলে জেলের পাঁচিল যেন ভেঙে যায়। মন চলে যায় কোন সুদূর…। রবীন্দ্রনাথের মুক্ত চিন্তা হৃদয়ে জাঁকিয়ে বসে। জেলের পাহারাদারদের কোনোরকমে রাজি করিয়ে সুরমারা কয়েকজন মিলে বাগানে যান। পরনে হলদে-কমলা রঙের শাড়ি। “বাইরে বেরোবার জন্য মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। গান করি অনেকক্ষণ, কিন্তু কতক্ষণ বা বাগানে থাকতে দেয়? …বাগানে বসে দেখা যায় দূরে নীল পাহাড়, পাইনের সারিতে ঘন সবুজের সমারোহ, কাছেই স্কুলটাতে মেয়েদের কোলাহল। সোনালি রোদের আলোয় ঝলমল বাইরের পৃথিবী। সে পৃথিবী আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাগানে বসে বসে আমরা প্রকৃতির গান করি।”

ঠিক এখানেই সুরমা ঘটক একটি প্রশ্নের অবতারণ করেন। লেখেন, মেয়েদের মুক্তি সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ কোনো পথের ইঙ্গিত দেখিয়েছেন কিনা! পরে সে উত্তর তিনি পেয়েও যান। তখনও মে দিবসের ঐতিহ্য জনসমক্ষে আসেনি। মে দিবস ঘোষিত হল। সুরমারা চারজন মিলে লাল শাড়ি পরে দাঁড়ালেন লালঝান্ডার পাশে। গান, স্লোগান, বক্তৃতা হল। ঝান্ডাকে তাঁদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের লাল সেলাম জানিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হল। গোটা জেল স্মরণীয় করে রাখল প্রথম মে দিবসকে। স্মরণ করল লালঝান্ডাকে। সুরমা ঘটকের মতো হাজার হাজার মানুষ, শোষিত শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত যেন এগিয়ে চলেছে মুক্তি সংগ্রামের পথে। তাঁদের মনে হল সর্বহারা বিপ্লবের দিন সমাগত। পৃথিবীর মানচিত্রের রং যেন পাল্টাচ্ছে। সেদিন জেল ইয়ার্ডেই খাসিয়া ভাষায় গাওয়া হয়েছিল গণসংগীত। বাতাসে বাতাসে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের গানের সুরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এই সর্বহারার গান।

দেশভাগের পর উদ্বাস্তু মহিলারা

জেল খাটার অনেক বছর পরে সাঁইথিয়ার একটি স্কুলে চাকরি করতেন সুরমা ঘটক। ট্রেনে যেতে যেতে দেখতেন মেয়েদের তৎকালীন অবস্থা। সেখানে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করত যে ঝিয়ের মেয়েরা – কাজ করতে করতে তাঁদের বিয়ের দিনই ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পরে বিয়ে হতো। অল্প কিছুদিন পর সেই মেয়ে বাপেরবাড়ি ফিরে এসে বলত ‘বর নেয় না’।

সুরমা ঘটক – যাঁর লেখা প্রথম বই ‘ঋত্বিক’। এরপরেই প্রকাশিত হয় ‘শিলং জেলের ডায়েরি’। তার বেশ কয়েকবছর পর লিখেছিলেন ‘ঋত্বিক – পদ্মা থেকে তিতাস’। ১৯৯৫ সালে চেরাপুঞ্জির নকালিকাই ঝরনার ওপর দাঁড়িয়ে দূরে দেখেছিলেন সুরমা নদী ও সুরমা উপত্যকা, বারবার কুশায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। তাঁর জন্মভূমি সিলেট নিয়ে লিখেছেন ‘সুরমা নদীর দেশে’। তবে ‘শিলং জেলের ডায়েরি’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে কারণ, এ গ্রন্থে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। যে ধারাবিবরণী সুরমা দিয়েছেন, তাতে সময়কে বিশেষত ভারতের নারী আন্দোলন ও সংগ্রামের চালচিত্রকে পরিষ্কার বোঝা যায়।

‘শিলং জেলের ডায়েরি’-র ভূমিকায় সুরমা ঋণ স্বীকার করেছেন ঋত্বিক ঘটকের প্রতি। ঋত্বিকের শিল্প নির্মাণ, মতাদর্শ, দর্শন সবকিছুই সুরমাকে প্রভাবিত করেছিল, অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৫৪ সালের ২৪ নভেম্বর একটি চিঠিতে ঋত্বিক ঘটক তাঁর স্ত্রী সুরমাকে লিখেছেন, “তোমার অভিজ্ঞতার সাধারণতাই হচ্ছে তার আবেদনের প্রাণবস্তু। অত্যন্ত সাধারণের মধ্যে থেকে তুমি অসাধারণকে বারেবারে স্পর্শ করেছ, গভীরে নেমে যেতে পেরেছে।”

কলকাতার রাজপথে মহিলাদের মিছিল

জেল খাটার অনেক বছর পরে সাঁইথিয়ার একটি স্কুলে চাকরি করতেন সুরমা ঘটক। ট্রেনে যেতে যেতে দেখতেন মেয়েদের তৎকালীন অবস্থা। সেখানে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করত যে ঝিয়ের মেয়েরা – কাজ করতে করতে তাঁদের বিয়ের দিনই ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পরে বিয়ে হতো। অল্প কিছুদিন পর সেই মেয়ে বাপেরবাড়ি ফিরে এসে বলত ‘বর নেয় না’। অনেকের কোলে সন্তানও এসে যেত। ওই মেয়েরা জীবিকানির্বাহের জন্য বাড়ি বাড়ি কাজ করত। এটাই যেন বংশ পরম্পরা। সেসব দৃশ্য দেখতে দেখতে, লোকমুখে নানান কথা শুনতে শুনতে সুরমা ঘটকের মনে পড়ত শিলং জেলে দেখা সেই খাসিয়া-নেপালি মেয়েদের কথা – যারা জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছিল বিভিন্ন পথ।

আজ মহানগরের রাজপথে দেখা যায় অসংখ্য মেয়েদের মিছিল। যে মিছিল জীবনের। জীবনে বেঁচে থাকাটাই কি সবচেয়ে বড়ো আন্দোলন? সুরমা ঘটক পথ দেখিয়েছিলেন।

সেই তরুণী বয়সে যে সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন সুরমা, সে সমাজ হয়তো আজও ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। আজ মহানগরের রাজপথে দেখা যায় অসংখ্য মেয়েদের মিছিল। যে মিছিল জীবনের। জীবনে বেঁচে থাকাটাই কি সবচেয়ে বড়ো আন্দোলন? সুরমা ঘটক পথ দেখিয়েছিলেন। লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত দেশের নারী সমাজকে সুখ, সমৃদ্ধি ও উন্নতির পথে নিয়ে যাবার জয়যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “এই নারীসমাজ হবে নতুন সমাজ গড়ে তুলবার অন্যতম কারিগর ও স্রষ্টা।”

সুরমা ঘটকের সূক্ষ পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত মন্তব্যের গভীরতা যেন কালের ব্যবধান তুচ্ছ করে একালের চোখে আরও স্পষ্ট, আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। আজকের রাজনৈতিক-সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই ডায়েরিকে ফেলে, ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে একদল নিম্নবর্গীয় মেয়েদের লড়াই। প্রশ্ন জাগে হিংসা, ধর্ষণ, খুন, পাচার, ভ্রূণ হত্যা মোকাবিলায় আজকের সমাজ কতটা এগোল!

____________________

গ্রন্থঋণ : শিলং জেলের ডায়েরি/ সুরমা ঘটক/ অনুষ্টুপ

Written by