
একাধিক বার গদাইয়ের গাড়িতে সওয়ার হয়েছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী
সে অনেককাল আগের কথা। একবার সপরিবারে মোটর গাড়ির এক প্রদর্শনীতে গেছে গদাই। তখন সে খুবই ছোটো। গদাইদের মৃতবৎ মোটর গাড়িটা (অস্টিন) দেখে অকাল পক্ক একটা বাচ্চা বিটকেল প্রশ্নবাণে নাজেহাল করে তুলছিল গদাইয়ের বাবাকে; ‘মোটর গাড়ির মা আছে?’, ‘মোটর গাড়ির পেট কামড়ায়?’, ‘মোটর গাড়ি ইস্কুলে যায়?’ এই ছিল তার প্রশ্ন। গদাইয়ের বাবাও বেশ কায়দা করে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল, এমন সময়ে গম্ভীর মুখে বেচারা গদাই তার মায়ের আঁচল টেনে জানতে চায়, “আচ্ছা মা, মোটর গাড়ি যখন বুড়ো হয়ে যায়, যখন সে আর চলতে পারে না তখন তার কী হয় মা’? সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝিয়ে উঠে গদাইয়ের মা উত্তর দেয়, “তখন তারা সেটাকে তোমার বাবার কাছে বেচে দেয়। বুঝেচ?”
গিন্নির কথার ঝাঁঝে সেদিনই গদাইয়ের বাবা মনস্থির করে ফেলেছিলেন, ছেলেকে তিনি ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন।
শিবরামের ছোটো গল্প ‘গদাইয়ের গাড়ি’-র অংশ হলেও উল্লিখিত ঘটনাটি একেবারেই কাল্পনিক নয়, সত্যি। ঘটনার সাক্ষী শিবরাম নিজেই। এখনও কলকাতার রাস্তায় ঘোরাফেরা করে তাঁর লেখা ‘গদাইয়ের গাড়ি’র সেই গদাই ও তাঁর পুরোনো অস্টিন গাড়িটি। বাবার কথা মতো ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে গদাই চাঁদ দে ওরফে গদাই, থানার দারোগা হন। পড়াশোনা করেছেন ওকালতি নিয়ে। শীতকালে শহরের বিভিন্ন ভিন্টেজ গাড়ি প্রদর্শনীতে এখনও সশরীরে হাজির থাকেন গদাই ও তাঁর আদরের অস্টিন। চাকচিক্য দেখে বোঝার উপায় থাকবে না এককালে এ গাড়ি জরাগ্রস্ত ছিল। একাধিক ভিন্টেজ গাড়ি থাকলেও ‘অস্টিন ১০/৪ টুরার’-এর প্রতি তিনি যেন একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। হবে নাই বা কেন, শিবরামের ‘গদাইয়ের গাড়ি’ গল্পের নায়ক তো সেইই। এক সংবাদপত্রের বিবৃতিতে গদাইবাবু বলেছিলেন, "অন্য গাড়ি বেঁচে দিলেও অস্টিনটা থাকবে। এটায় যে শিবরাম চক্রবর্তী চড়েছিলেন!" শিবরামের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের দিনগুলি এখনও তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

গদাইয়ের অস্টিন গাড়ি
বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার ফার্ণ রোডের বাসিন্দা হলেও গদাইবাবুরা এক সময় উত্তরের বাসিন্দা ছিলেন। থাকতেন ঠনঠনে কালীতলায়। তাঁদের গাড়ি থাকত ১৩৪ মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বিখ্যাত মেসবাড়িটির একতলার গ্যারাজে। মানে ‘ক্ষেত্রকুঠি’-তে। শিবরাম চক্রবর্তী যে মেসবাড়ি সম্পর্কে বলেছিলেন, মুক্তারামে থেকে, তক্তারামে শুয়ে, শুক্তারাম খেয়েই তিনি শিবরাম হয়েছেন। সে যাই হোক, গদাইবাবু যখন তরুণ বয়সে চার চাকায় হাত পাকাতে শুরু করেছিলেন, সেই সময় থেকে প্রায়ই তাঁর গাড়ির সম্মুখীন হতেন শিবরাম। আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অল্প–বিস্তর’ কলাম লেখেন তখন। কখনও পাওনা টাকা আনতে, কখনও এমনিই চলার পথে সেই গাড়িতে চেপেছিলেন তিনি। আবার, কখনও কখনও এমনও ঘটেছে গদাইবাবু হয়তো লিফট্ দিতে চেয়েছেন, “না রে, আজ একটু তাড়া আছে” বলে শিব্রামীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে গেছেন।
‘গদাইয়ের গাড়ি’ থেকেই জানা যায়, ভবানীপুরে এক প্রকাশকের কাছে টাকা নিতে যাচ্ছেন শিবরাম। ঠিক সেই সময় পাশে এসে দাঁড়াল একটি গাড়ি। গাড়ির চালক অবশ্য তাঁর পূর্ব পরিচিত। গদাই। পুরোনো দিনের অস্টিন গাড়ি। প্রথমে গাড়িতে উঠতে ইতস্তত করলেও অবশেষে উঠেই পড়লেন। গদাই যাবেন তাঁদের দোকানের হালখাতার নিমন্তন্ন করতে। সঙ্গী শিবরাম। তবে গাড়ি কোথাও থামলেই যে মুশকিল! না ঠেললে সে তো চালু হতে চায় না। প্রথমে ওয়েলেসলির মোড়। তারপর আরও এক জায়গা। ঠেলতে ঠেলতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেদিন আর প্রকাশকের থেকে টাকা নেওয়া হল না। আর কোথাও না থেমে সটান ফিরে এলেন বাড়িতে। গদাইয়ের বাবা তাঁর ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছিলেন বলে কসরত করার জন্য এই গাড়ি কিনে দিয়েছেন, এই ঘটনার পরে এক সাক্ষাতে শিবরামবাবুকে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। আজও দক্ষিণ কলকাতার ফার্ন রোডে গেলে তাদের দেখা মিলবে সেই অস্টিনের। গদাই বাবুর আদর-যত্নে এখনও নিজে থেকেই স্টার্ট নেয়।

গদাই বাবুর পুরোনো গাড়ির প্রতি ভালোবাসা ঠিক কতখানি, তা বোঝাতে পরিশেষে একটি ঘটনা বলি। তখন তিনি ভবানীপুর থানার ওসি, একবার মাঝরাতে তাড়া করেছিলেন এক চোরকে। চোর দৌড়ে এক ভাঙা বাড়ির পাঁচিল টপকে ঢুকে যায়, পিছন পিছন তিনিও। বাড়ি ঘিরে জঙ্গল। এমন সময় ঝোপের মধ্যে দেখতে পেলেন মাটির মধ্যে এক হাত ডুবে থাকা একখানি ভিন্টেজ গাড়ি। শেষ পর্যন্ত চোর ধরা পড়েছিল কিনা জানা না গেলেও জানা যায়, মালিককে ভজিয়ে সেই গাড়ি ঘরে এনেছিলেন গদাই, তার ভোল দিয়েছিলেন বদলে। ভাঙাচোরা, জংধরা খাঁচা থেকে সেই গাড়ি এখন ঝকঝকে ‘স্ট্যান্ডার্ড লিটল নাইন’; গাড়ি প্রদর্শনীতে যার রূপের বাহারে মুগ্ধ হন সকলে, এমনকি বেশ কিছু মূল্যবান পুরস্কারও সে জিতে নিয়েছে। গদাইবাবু এবং তাঁর বাবার ‘অযান্ত্রিক’ ভালোবাসা কেন শিবরামকে ছুঁয়ে গেছিল, এরপরও তা আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি?
তথ্যসূত্রঃ ‘গদাইয়ের গাড়ি’ শিবরাম চক্রবর্তী, আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান
ছবিঃ Richeek Dey (The Calcutta Vintage & Classic Car Lovers Facebook Group)
The Statesman Vintage & Classic Car Rally 2020
