‘জীবাণুগুলো শান্ত হয়ে আছে, ওদের আর খেপিয়ে দিও না’

শিবরামের জীবনে ‘শিক্ষণীয়’ মজার ঘটনার ছড়াছড়ি

একবার এক সাক্ষাৎকারে শিবরামকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘লেখার জন্যে সামনে খোলা জানালা, মাঠ, ফুল, নীরবতা বা শোরগোল এর কোনটার কি আপনার প্রয়োজন হয়?’

শিবরাম জবাব দিয়েছিলেন―এর কোনটারই খুব একটা প্রয়োজন নয়, তবে শান্তির দরকার। সে তো সর্বদাই―কী লেখার সময়, কী ঘুমোনোর কালে। তাছাড়া কাগজ-কলমেরও দরকার বইকি। বিশেষ করে নীলাভ (নাকি, সবুজাভ?) কঙ্কোয়েস্ট্ কাগজ না হলে আমার চলে না―যেহেতু প্রথম বয়স থেকেই দেখে আসছি লেখা ছাপানো এক মারামারি ব্যাপার। সম্পাদককে সহজে কাবু করা যায় না। রীতিমত কঙ্কোয়েস্ট করতে হয়।

সাক্ষাৎকারে তিনি যে শান্তির কথা বলেছেন, তা তিনি সত্যিই খুঁজে বেড়াতেন বিভিন্ন কিছুর মধ্যে, এমনকি জীবানুর ভিতরও। তাঁর জীবনে মজার ঘটনার ছড়াছড়ি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা শিক্ষনীয়, গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন-

শিবরাম চক্রবর্তীকে একবার একজন বই উপহার দিতে এলে শিবরাম হাসতে হাসতে বলেছিলেন ‘আপনি আমাকে যে বই দেবেন তাতে কিন্তু নাম লিখে দেবেন না।’
 
সেই ভদ্রলোক অর্থ বুঝতে না পেরে বললেন ‘সে কি!’ সরল হাসি হেসে শিবরাম বলেছিলেন ‘আমায় তো লৌকিকতা করতে হয়! আমি এগুলো অন্যকে উপহার দেব। আমার দেওয়া বই নিয়ে আপনারাও তাই করবেন।’

শিবরাম চক্রবর্তী থাকতেন ১৩৪ নং মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটে। তিনি যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরে যেন জীবনে কোনো দিন ঝাঁট পড়েনি বলে মনে হত। কেউ যদি তাঁকে বলত ‘আপনার ঘরে বিস্তর ময়লা দেখছি, একটু সাফ করে দিই।’ শিবরাম তক্ষুনি বলতেন ‘না, না, জীবাণুগুলো শান্ত হয়ে আছে, ওদের আর খেপিয়ে দিও না।’ টেবিলে জড়ো করে রাখা বইপত্রের মধ্যে তিনি প্রায়ই নিজের বইপত্র বা দৈনিক পত্রিকা খুঁজে পেতেন না। কেউ যদি বলত ‘নিজের বইপত্রগুলো গুছিয়ে রাখেন না কেন?’
 
উত্তরে শিবরাম বলতেন ‘বইপত্তর থাকে নাকি! সব পড়তে নিয়ে যায় যে। ফেরত আর কেউ দেয় না। সত্যি বলতে কি, আমাকে এভাবেই সবাই ভারমুক্ত করে যায় রোজ।’ 

শিবরাম যে মেসে থাকতেন সেখানে তাঁর ঘরের এক কোণে ছিল একটা আধ ভাঙা আলমারি। সবাই মনে করত ঐ আলমারিতে বুঝি জামাকাপড় বা বইপত্র আছে। শিবরামকে যদি জিজ্ঞাসা করা হত ‘ঐ আলমারিতে কি আছে?’ শিবরাম জানাতেন ওই আলমারিতে কিছুই নেই। সব চুরি হয়ে গেছে। কিছু নেই, তবু মস্ত তালা লাগানো দেখে সবাই বলত ‘কিছুই যখন নেই, তখন খামোকা তালা লাগিয়ে রেখেছেন কেন?’
 
শিবরাম গর্বভরে বলতেন ‘চোরের ওপর বাটপাড়ী করার জন্য। যখন বাইরে বের হই তখন ঐ তালাটা দরজাতে লাগাই, আর ঘরে ফিরে ঐ তালাটাই আলমারিতে লাগাই।

শিবরাম চক্রবর্তী একদিন শুধু একটা গেঞ্জি গায়ে বাজারে এসেছেন। একজন পরিচিত লোক তাঁকে এরকম অবস্থায় দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ‘একি শিবরামবাবু, আপনি এই অবস্থায়?’ শিবরাম বললেন ‘ঘুম ভেঙে দেখি জামাকাপড় সব চুরি হয়ে গেছে।’ পরিচিত ভদ্রলোকটি জিজ্ঞাসা করলেন ‘সেকি, আপনার আর জামাকাপড় নেই?’

শিবরাম বললেন ‘আছে ভাই, কিন্তু সে তো লন্ড্রিতে আর লন্ড্রির রসিদও সেই জামার পকেটেই থেকে গিয়েছে।’

(শান্তা শ্রীমানী লিখিত ‘মণীষীদের রসিকতা’ বই থেকে)

 

Developed by DXDasia