ভারতের সংগীতজগতের প্রথম স্টিং অপারেশন

গ্রামোফোন রেকর্ডে ধরা পড়ল সঙ্গীত ও শিল্পরসিক অঘরবাবুর কণ্ঠ

কলকাতার চড়কডাঙায় যেখানে আজও ভঙ্গুর চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী টেগোর ক্যাসেল, সেখানেই হত মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের গুণীজন সমাগম। সঙ্গীত ও শিল্পরসিক এই মানুষটির দরবারে তখন সঙ্গীতরত্নদের সমাহার ও অবাধ যাতায়াত। সেই সভারই সভা গায়ক হলেন বাবু অঘোরনাথ চক্রবর্তী।

বাংলার প্রথিতযশা দমদার উস্তাদ গায়ক বাবু অঘোরনাথ চক্রবর্তী। ভারত বিখ্যাত সঙ্গীত গুণীদের কাছ থেকে তালিম পেয়েছেন সময়ে সময়ে। আলিবক্স খান, গোয়ালিয়র ঘরের মুরাদ আলি খান, আত্রৌলি ঘরের দৌলত খান ও প্রখ্যাত বাইজি শ্রীজান বাইয়ের কাছে গানের নানা দিক রপ্ত করেছিলেন বাবু অঘোরনাথ চক্রবর্তী। কাশীর গায়ক পণ্ডিত সমাজের ব্যক্তিত্বদের মতো বাবু অঘোরনাথ চক্রবর্তীও রেকর্ডে গান ও গলা দেওয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি জানাতেন। মনে করতেন এ হল অহংকারের চাবিকাঠি।

এ দিকে গ্রামোফোন কোম্পানির ১৯০৪-০৫ এর কলকাতার রেকর্ডিং ট্যুর শুরু হয়ে গিয়েছে। উইলিয়ম সিঙ্কলার ডারবি ও ম্যাক্স হামফ্রে একের পর এক গায়ক-গায়িকার কণ্ঠ বন্দি করছেন রেকর্ডে।  মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এই সুযোগকে হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি মনে করলেন অঘোর বাবুর মতো এত বড় উস্তাদের কণ্ঠ রেকর্ডে ধরা থাকবে না তা আবার হয় নাকি! কিন্তু তিনি জানতেন সরাসরি কথা বলে অঘোরবাবুর মতো একরোখা মানুষকে এমন কাজে রাজি করানো সম্ভব নয়। তাই শুরু হল অন্য ব্যবস্থা। যতীন্দ্রমোহনের নির্দেশে ও ইচ্ছায় বাড়ির বিভিন্ন কোণে গোপনে যন্ত্র বসালেন কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার’রা। আর তার পর মহারাজ যতীন্দ্রমোহন একটি বিশেষ দিকে ফিরে অঘোর বাবুকে গান গাইতে অনুরোধ করলেন সময় বুঝে। সেই মতো মহারাজের অনুরোধে খালি গলাতেই গান করতে লাগলেন বাবু অঘোরনাথ চক্রবর্তী। ওদিকে চূড়ান্ত গোপনে শুরু হয়ে গেল রেকর্ডিং।

কিন্তু তিনি জানতেও পারলেন না একে একে তাঁর গান রেকর্ডবন্দি হল। কালের নিয়মে একদিন তা প্রকাশিতও হল। লেবেলে লেখা হল (From the household of H.H. The Maharajah Sri Jotendra Mohon Tagore K.C.S.I)।

এই ঘটনার কদিন পর যখন অঘোরবাবু জানতে পারলেন সেকথা তখন সারাজীবন মহারাজকে গান শুনিয়েছেন ঠিকই কিন্তু সেই সব গানের আড়ালে ছিল গায়কের তীব্র অভিমানের বেদনা। কিন্তু রেকর্ডে ধরা রইল গান।

Developed by DXDasia