শৈল শিখর প্রাঙ্গণে

দেশলাইয়ের বাক্সে টোকায় তাল শুনে লিখে ফেললেন ‘ খোয়া খোয়া চাঁদ / খুলা আসমান।’তিনি শৈলেন্দ্র।তরুণ বাঙালি সংগীত বিশ্লেষকের পায়চারি ভিনটেজ বলিউডে

আইপিটিএ – তে একজন কবিতা পড়ছিলেন। তাঁর বয়েসী একটি ছেলে এসে তাঁকে বললেন, আমি রাজ, পৃথ্বীরাজ কাপুরের ছেলে। ‘আগ’ নামে একটা ছবি তৈরি করছি, ওখানে গান লিখবেন?”  বামপন্থী বিচার ধারায় বিশ্বাসী সেই ভদ্রলোক, ওঁকে প্রত্যাখান করলেন, পয়সা নিয়ে গান লিখবেন না বলে। অভাবের ফেরে তাঁকেই রাজ কাপুরের কাছে আসতে হয়, ৫০০ টাকা ধার করতে, পরে ফেরত দিতে গেলে রাজ কাপুর বললেন, ‘বরসাত’ এর দুটো গান বাকি আছে, ও দুটো লিখে দিতে। তিনি লিখলেন, বরসাত মে হমসে মিলে তুম। ভারতীয় সিনেমার প্রথম টাইটেল মিউজিক এই গানটা। শঙ্করদাস কেসরিলালের কথা বলছি, যিনি শৈলেন্দ্র নামে ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৬ অবধি সিনেমাতে রাজত্ব করে গেছেন।

ইচ্ছে করেই কতগুলো সিনেমার নাম করছি, আওয়ারা, জংলি, আনাড়ি, জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়, দিল অপনা অউর প্রীত পরায়া, শুধু সিনেমাতে গান লেখাই নয়, এই সমস্ত সিনেমার টাইটেল মিউজিক লেখা ওঁর। ১৯৪৯ থেকে রাজ কাপুরের টিমে জুড়ে গেলেন। সোজা ভাষায় লেখা কবিতা, ‘ হোঙ্গে রাজে রাজকুমার হম বিগড়ে দিল শেহজাদে/ হম সিংহাসন পড় যা ব্যঠে/ জব জব করে ইরাদে’ মতাদর্শ- দেশ শিল্প এক হয়ে যাচ্ছে গানটার শুরুতে দেখুন, ‘ মেরা জুতা হ্যায় জাপানী/ ইয়ে পতলুন ইংলিস্তানি/সর পে লাল টোপী রুশি/ফিরভি দিল হ্যাঁয় হিন্দুস্তানি।’ ওঁর সম্পর্কে গুলজার একটা সাক্ষাৎকারে অসামান্য উক্তি করেছিলেন, সমস্ত গীতিকারদের মধ্যে একমাত্র শৈলেন্দ্র, নৈপুণ্য আর সফলতার সঙ্গে সিনেমায় জুড়তে পেরেছিলেন । বাকিরা কবি থেকে গেলেন, যারা সিনেমার জন্যে গান লিখেছেন। সিনেমার চরিত্র যদি বিহারী হয়, ভোজপুরি ভাষায় গান পাবেন ওঁর লেখায়, চরিত্র যদি মধ্যবিত্ত হয়, সেই ভাষায় গান পাবেন, চরিত্র যদি স্পষ্ট উর্দু ভাষী বা হিন্দিভাষী হয়, সেই লেখাও পাবেন।

আর ডি বর্মন তখন বাবার সহকারী। শৈলেন্দ্র বললেন, দেশলাইয়ের বাক্সে তালটা দেখাতে। রাহুল লজ্জায় পড়লেন, শৈলেন্দ্র বললেন, লজ্জা পেতে হবে না, দেখাও। রাহুল তাই করলেন, উনি লিখলেন, ‘খোয়া খোয়া চাঁদ/খুলা আসমান/আখো মে সারি রাত জায়েগি।’

ওঁর লিরিক কখনও এত সরল, ধরুন, ‘অজি রুঠ কর অব কাহা জায়িয়েগা/ জাহা জায়িয়েগা হামে পায়িয়েগা’ আবার এই ভদ্রলোক লিখছেন, কাটো সে খিচ কে ইয়ে আঁচল/ তোড় কে বন্ধন বান্ধি পায়েল’ খেয়াল করুন, তোড় কে বন্ধন, বান্ধি পায়েল। লিখছেন ‘হ্যাঁয় সবসে মধুর ও গীত জিসে হম দর্দ কে সুর মে গাতে হ্যাঁয়’ ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.’- শেলীকে মনে পড়ে যায়।

শঙ্কর– জয়কিসেন, সহকারী দত্তারাম, শৈলেন্দ্র, একটা জায়গায় গান নিয়ে কথা বলছেন, শঙ্কর একটা সুর গাইলেন, ‘রামাইয়া বস্তাভইয়া’ মানে, রাম তুমি কি আসবে না? তেলেগু ভাষা, পরের লাইন তৈরি হয়ে গেল শৈলেন্দ্রের মাথায় ঐ সুরের মিটারে, ‘ম্যয়নে দিল তুঝকো দিয়া।’ এই প্রফেশনালিজম আজকে ওঁকে বড় করেছে কম স্প্যানের কেরিয়ারেও। ১৯৬০ সালে ফনীশ্বর নাথ রেনুর গল্প ‘মারে গ্যয়ে গুলফার্ম’ এর রূপান্তর করবেন সিনেমাতে, রাজ কাপুরের আপত্তি ছিল, সিনেমাটা চলবে না ভেবেছিলেন, সেই-ই হল, বাসু ভট্টাচার্য পরিচালক, প্রযোজনা করলেন শৈলেন্দ্র। প্রচুর টাকার দেনা মাথায় নিয়ে রোগে পড়লেন, প্রয়াত হলেণ বন্ধু রাজ কাপুরের জন্মদিনের দিনই, ১৪ ডিসেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়েসে।

Developed by DXDasia