মুর গান নতুন নয়, পুরোনোও নয়। এটা জঙ্গলের একটা প্রাচীন গাছের মত, যার শিকড় রয়েছে অতীতে কিন্তু তার ডালপালা বেড়েই চলে।

‘আমার লাতির বড় ছাতি/ দুয়ার বাঁধেছে হাতি/ লাগুক টাকা দিব গুনাগারি/ তবু না ছাড়িব জমিদারি। তবু না ছাড়িব জমিদারি।’ নাতিকে কোলে শুইয়ে দোল দেবার তালে তালে এই গান গাইতেন তার ঠাকুমা বা দিদিমা। সহজ কথা আর সুরে এসব গান মুখে মুখে তাদেরই বানানো। এই চার লাইনে নাতি বাগ মানলে ভাল, তা নাহলে গানকে আরও লম্বা করতে হত। দুষ্টু নাতিকে শান্ত করতে গানের কথায় কখনও তিনি ভগবানের শরণ নিতেন। কখনও আমদানি করতেন কোন দৈত্যদানো। এভাবেই বাংলার পশ্চিম প্রান্তের গ্রামীণ জীবনের নানা কাজকর্ম, দুঃখবেদনা থেকে তৈরি হত ঝুমুর গান। মানুষের রোজকার জীবন থেকে ঝুমুর গান কীভাবে তৈরি হয় তা বোঝাতে একথা বলেছিলেন বাংলা ঝুমুর গানের এক কিংবদন্তী শিল্পী সদ্যপ্রয়াত সলাবৎ মাহাতো।

একদিনকার হলুদ বাটা

‘ঝুমুর গান নতুন নয়, পুরোনোও নয়। এটা জঙ্গলের একটা প্রাচীন গাছের মত, যার শিকড় রয়েছে অতীতে কিন্তু তার ডালপালা বেড়েই চলে সেখানে আসে নতুন পাতা, নতুন ফুল।’ বলেছিলেন এক ঝুমুরিয়া। ঝুমুর গানের এত চমৎকার ব্যাখা আর কোথাও পাইনি। প্রান্তিক জনজীবন থেকে এর উদ্ভব। তাদের সুখ দুঃখ প্রেম ভালবাসা রীতিনীতি আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিয়ে এর পথ চলা। জীবনের পথ চলতে চলতেই মানুষের মুখে মুখে তৈরি হয়েছিল এই গান। গোড়ায় এর কোন লিখিত রূপ ছিল না। মানুষের শ্রুতিতেই রূপ বদলাতে বদলাতে ছিল তার বেঁচে থাকা। জীবনের অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতি ঝুমুরের ঝুলিতে তার বৈচিত্র এতটাই উজার করে দিয়েছে যে এ গান কোনদিন পুরোনো হয় না।

ঘুঙুরের সঙ্গে সম্পর্ক
ঝুমুর শব্দটা আছে বলে অনেকে ধরে নেন ঘুঙুরের সঙ্গে এই গানের সম্পর্ক রয়েছে। গানের সঙ্গে নাচ হয় বলে এই ধারণা জোরদার হয়েছে। কিন্তু গানটি যারা গায়, যেভাবে তৈরি হয় তা তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় কথাটা ঠিক নয়। বাংলার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানুষদের মধ্যে ঘুঙুর কোনদিনই খুব একটা প্রচলিত ছিল না। দরবারি ঝুমুর যেখানে নাচনীরা ঝুমুর পড়ে নাচেন তাও এসেছে অনেক পরে। ঝুমুর গান ও নাচের সঙ্গে বাজে ঢোল, ধামসা, মাদল, বাঁশি, সানাই, মন্দিরা, আড়ও পরবর্তীকালে এতে যুক্ত হয়েছে হারমোনিয়াম, তবলা।
 

হামরাই তো বাঘমারি

ঝুমুরের ভূগোল
বাংলার লোকগানকে আমরা চারটি অঞ্চলে ভাগ করতে পারি- উত্তরে ভাওয়াইয়া, পূর্বে ভাটিয়ালি, মধ্য ও দক্ষিণে বাউল এবং পশ্চিমাংশে ঝুমুর। একমাত্র বাউল ছাড়া বাংলার আর কোন সঙ্গীতধারা এত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে নেই। ঝুমুর গান হল বাংলার পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর ঝুমুর গান ও নাচের দেখা পাওয়া যায়। শুধু বাংলা নয় ঝুমুর ছড়িয়েছে বাংলার বাইরেও। বিহারের ধানবাদে ঝুমুর গান ও নাচ বেশ চালু। ঝুমুর শোনো যায় উত্তরবঙ্গ ও আসামে। বাংলার পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন ঝাড়খন্ডের সিংভূম, রাঁচি, হাজারিবাগ ও গিরিডি এবং ওড়িষার ময়ূরভঞ্জেও ঝুমুর গান জনপ্রিয়। বাংলা এবং ওরিষা ভাষা ছাড়াও কুরমালি, পাঁচপরগনিয়া এবং নাগপুরিয়া প্রভৃতি স্থানীয় উপভাষাতেও ঝুমুর গান হয়। এসব উপভাষাভাষী লোক যতদূর অবধি ছড়িয়েছেন ততদূর মুখে মুখেই ছড়িয়ে গেছে এই গান।

ঝুমুরের ইতিহাস
বাংলা মঙ্গলকাব্য, চৈতন্যদেবের আগেও ঝুমুর গানের দেখা পাওয়া যায়। মুখে মুখে বানানো বলেই এই পর্বের ঝুমুর গানে কোন ভনিতা বা লেখকের আত্মপরিচয় থাকতো না। একে বলা যায় ঝুমুর গানের আদি যুগ। চৈতন্য পরবর্তী কালের ঝুমুরের কথা ও সুরে ব্যাপক রদবদল ঘটে। এই কালপর্বকে বলা হয় ঝুমুর গানের মধ্যযুগ বা কাব্যযুগ। আর স্বাধীনতার পর শুরু হল ঝুমুর গানের আধুনিক যুগ। ঝুমুর গান ও নাচ যারা করেন তারা সবাই প্রান্তিক অর্থাৎ নিন্মবর্গের গরীব মানুষ। কূর্মি, মাহাতো, কুমোর, রাজওয়ার, ঘাটাল, হাড়ি, মুচি প্রভৃতি সম্পদায়ের লোক। এছাড়াও ঝুমুর গান করেন ভূমিজ ওঁরাও, মুন্ডা ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। আরও পরের পর্বে এসে ঝুমুর গান হয়ে উঠল বাঁকুড়া পুরুলিয়ার প্রায় সব স্তরের মানুষের গান।

একসময়ে এই গান রচয়িতাদের বেশিরভাগই ছিলেন বৈষ্ণব। ঝুমুর গানে তাই বৈষ্ণবদের ভক্তিগীতি, কীর্তনের ছায়া পড়েছে। অনেকেই ঝুমুরকে কীর্তনের অঙ্গ বলে মনে করেন। ঝুমুরের সঙ্গে কীর্তন মিলেই যাত্রার উদ্ভব। আবার কীর্তনে মিশেছে বাংলার লোকসঙ্গীতে সুর। রাধাকৃষ্ণের প্রেম ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। তবে ঝুমুর শুধু তাতেই আটকে থাকেনি। মানুষের সুখ দুঃখও এসেছে তাতে। তবে এটা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া ভাল কোন নির্দিষ্ট ধর্ম, প্রথা বা আচার থেকে ঝুমুর গানের উৎপত্তি হয়নি। ঝুমুর গানের চলন হল ধাপে ধাপে ওঠা। অর্থাৎ উঁচু থেকে শুরু হয়ে নিচু গ্রামে শেষ হয়। সলাবৎ মাহাতোর আক্ষেপ, ‘ঝুমুর গান উদারা মুদারা আর তারা এই তিনটি স্বরগ্রামে বিভক্ত, কিন্তু এখন এই গানে উদারা-মুদারাই বেশি থাকে, তারার কাজ কম।’

মানভূমি কেইসান সুন্দর

আদিবাসী ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে নাচ। আদিবাসীরা ঢোল, ধামসা, মাদল, সহযোগে এই গানের সঙ্গে নাচ করেন। মানুষের দুঃখ, আনন্দ, উচ্ছাস থেকে শুরু হলেও এই গানে আস্তে আস্তে মিশতে থাকে নানা জনগোষ্ঠীর আচার অনুষ্ঠানের রীতিনীতি। মাঠ থেকে ঝুমুর উঠে আসে বাড়িতে। ঝুমুর গান হয়ে ওঠে স্থানীয় লৌকিক দেবদেবীর পুজো আচ্চার একটা অঙ্গ। লোকউৎসব করম, ভাদু, টুসু, বাঁদনা এমনকি বিয়ের আসরেরও অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে ঝুমুর নাচ ও গান। ভাদু-টুসু-করম-বাঁদনা পরবে গাওয়া হলেও এতে বিরাট কিছু আধ্যাত্মিক ভাবনা নেই, বরং আছে আনন্দ, উচ্ছাস আর ভগবানের কাছে নালিশ। পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার সাঁওতালি, কুরমালি ইত্যাদি স্থানীয় উপভাষাতেই মুখে মুখেই এই গানগুলির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আসে লিখিত রূপ এবং একক গায়কের জায়গায় দল বেঁধে নাচ ও গান।

ঝুমুরের নানা ধরণ
ঝুমুরের সুর এসে মিশেছিল বাংলার ছাদ পেটাইয়ের গানে। কলকাতাতেও শোনা যেত, ‘তুমি আমার কালো সোনা/ হেই হেই কালো সোনা/ তুমি ছেড়ে গেলে আর আমি বাঁচব না/ মরি মরি বাঁচবো না।’ গ্রামের অশিক্ষিত গৃহনির্মাণ কর্মীরা মুখে মুখে এই গান রচনা করেছেন কাজ করতে করতেই- পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে শহরে আসা এই মজদুর নিজেদের অজান্তেই শহরে বহন করে এনেছিলেন বাংলা লোকগানের এই ধারাটিকে কঠোর মেহনতের সময় এই সুরই তাদের গলা থেকে ছাদ পেটানোর তালে তালে গান হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

পিনদারে পলাশের বন

আবার রাখালরা গরুর পাল নিয়ে যখন মাঠে যায় তখন তারা দু-চার লাইনে ছোট ছোট ঝুমুর গান গাইত। একে বলে টাঁড় ঝুমুর বা মেঠো ঝুমুর- ‘কাঁদিস না কানাই হেরি লো/ কাঁদলে কি শ্যামচাঁদে পাবি লো।’ বোঝাই যায় একেবারে মুখে মুখে তৈরি হয়েছে এসব গান। মুখে মুখে তৈরি হয়েছে বলেই এক মুখ থেকে আরেক মুখে পৌঁছতে পৌঁছতেই বদলে যায় কথা, সুরেও বদল আসে। বদলে যায় গায়কীর ঢঙ। মুখে মুখে তৈরি বলেই এই গানগুলি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত।

একেবারে গোড়ার দিকের ঝুমুর যা কি-না বিশদ্ধ লোকসঙ্গীত তা গাওয়া হত মূলত ভাদ্র মাসে। তাই তাকে বলা হত ভাদুরিয়া ঝুমুর। দরবারি ঝুমুর যে দরবারে (রাজা/জমিদার) গাওয়া হত তাতো আগেই বলেছি। ভাদুরিয়া ঝুমুরের আবার নানা উপবিভাগ আছে। যেমন ঝিঙাফুলিয়া, উদাসিয়া, রসরসিয়া, কামারিয়া, খেমটা ইত্যাদি। কামারিয়া ঝুমুর গায় কামা সম্প্রদায়ের মানুষরা। খেমটা ঝুমুরের সঙ্গে থাকে খেমটা নাচ। উদাসিয়া ঝুমুর উদাস বা বিমর্ষ চিত্তের গান। রসরসিয়া ঝুমুর হল শৃঙ্গার রস বা শারীরিক মিলনের উপর ভিত্তি করে। লৌকিক ঝুমুর গান পরিবেশিত হত দাঁড়শাল, বুলবুল, কাটি, ছৌ, নাচনী, নাটুয়া নাচের আসরে।

আগে আদিবাসী মানুষদের মধ্যে প্রচলিত ঝুমুর গানগুলি বেশি বড় হত না। দু-চার লাইনের গানই বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাওয়া হত। চাষ করতে করতে মুখে মুখেই তৈরি হয়ে যেত টাঁড় বা মাঠের ঝুমুর। এই গানের খানিকটা আদিরসেরো ছোঁয়া থাকতো। সহজ সরল কথা ও সুরে ধরা পড়ত তাদের রোজকার জীবনের সুখ দুঃখ। এছাড়াও ছিল হাক্কা ঝুমুর। এ গান গাইতেন মূলত মেয়েরা।

আবার গানের তাল ও নাচ অনুযায়ী অনুসরণে ঝুমুর গানের একটা নামকরণ করা হত। বাউল সুরে গাওয়া হলে তাকে বলা হত বাউল ছোঁয়া বা ঢুয়া। আবার কীর্তনের সুরে গাইলে তাকে বলা হত নাচনীশালিয়া। আবার দাঁড় নাচের আসরে গাইলে তাকে দাঁড়শালিয়া বলা হয়। অনেক সময় ঝুমুর গানের নাম হয় তালের নামে, যেমন খেমটি, বাড়হাইয়া। আবার আঙ্গিকের দিক থেকেও ঝুমুরকে দু-ভাগে ভাগ করা হয়। ছুট ঝুমুর ও পালা ঝুমুর। সাধারণ কবিতার আকারে যে ঝুমুর পরিবেশিত হয় তাকে বলে ছুট ঝুমুর। আর অনেকগুলো ছুট ঝুমুর নিয়ে হয় পালা ঝুমুর। ঝুমুর গানে নাট্যগীতি বলতে অভিনয় মূলক প্রদর্শনকে বোঝানো হয়। আগে একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মুখোমুখি/ প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গীতে এগুলি পরিবেশন করতে হত। বোঝাই যাচ্ছে এর কোন লিখিত টেক্সট ছিল না।

ছৌ নাচের গানেও ব্যবহৃত হয় ঝুমুর। ছৌ নাচের পালায় যেমন কোন লিখিত টেক্সট নেই তেমনি তার গানেও নেই। আবার এই ঝুমুর খুব একটা উঁচু মানের নয়। মূল ঝুমুর গানের সঙ্গে তার কোন তুলনাই হয় না। পালার প্রথমে গণেশ বন্দনার সময় নাচের দলের গায়েন গেয়ে ওঠেন- ‘প্রথমে বন্দনা করি গণেশ চরণ/ নমঃ নারায়ন গণেশ দেব হরগৌরীর নন্দন।’ দাঁড় নাচ মানে কোমর ধরাধরি করে তালে তালে আগুপিছু হয়ে নাচ আদিবাসী জনসমাজে বেশ পরিচিত। এই নাচের গানকে বলে দাঁড়শালি ঝুমুর গান- ‘তুমি তরু, আমি লতা, বেড়িয়ে রাখব হে/ যাও দেখি কোথা যাবে আমারে ছাড়িয়ে হে/ শিশিরে কি ধান ফলে বিনা বরষনে হে/ বচন কি মনে মিলে বিনা দরশনে হে।’

পরম্পরা সংরক্ষণের একটি প্রয়াস
একসময় বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় ঝুমুর গানের ধারাটি সজীব থাকলেও পরবর্তীকালে তা জনপ্রিয়তা হারায়। এই পরম্পরাটি সংরক্ষণের জন্য প্রথমে ইজেডসিসি ও পরবর্তীকেলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-র সহায়তায় এবং বাংলা নাটক ডট কম-র উদ্যোগি যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তাতে দেখা যায় পুরোনো গানগুলি সংরক্ষণের দুর্বলতা, সুর ও কথার বিকৃতি এবং উপযুক্ত গায়কের অভাব ঝুমুরের জনপ্রিয়তা হারানোর একটা বড় কারণ। আরেকটা সমস্যা হল উপযুক্ত ইতিহাস এবং গানগুলি হারিয়ে যাওয়াতে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ঝুমুর গান সম্পর্কে কিছুই জানে না। ‘ঝুমুর কথা’ নামে এক ঝুমুর গীতির সংকলনের মাধ্যমে গানের ইতিহাস ও বিখ্যাত শিল্পীদের জনপ্রিয় গানগুলি মানুষের পৌঁছে দেওয়ার ফলে এই বিকৃতিটা অনেকটাই আটকানো গেছে। এই কাজে একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন এই সময়ের এক বিশিষ্ট ঝুমুর গীতিকার, কবি ও সাংবাদিক সুনীল মাহাতো।

এই উদ্দ্যোগেরই অঙ্গ হিসেবে ঝুমুর গানের আদি পর্ব থেকে আধুনিক পর্ব অবধি সময়ের শিল্পীদের ১৬টি গান নিয়ে প্রকশিত হয়েছে ‘দরবারি ঝুমুর’ নামে একটি সিডি। এতে রয়েছে আদি পর্বের ভবপৃতানন্দ ওঝা, রামকৃষ্ণ গাঙ্গুলি, দ্বিজ টিমা থেকে শুরু করে এই সময়ের অমূল্য কুমার, সলাবৎ মাহাতো, মিহিরলাল সিংদেও প্রমুখের দরবারি ঝুমুর গান। পরম্পরা সংরক্ষণের এই কাজের অঙ্গ হিসেবেই তৈরি হয়েছে ‘জার্নি অফ ঝুমুর’ নামে একটি তথ্যচিত্র। এই সিডিতে ধরা হয়েছে ঝুমুর গানের বিবর্তনের ইতিহাস। একদা প্রায় হারিয়ে যেতে চলা এই ধারাটিতে এখন অনেক শিল্পী আসছেন। পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ঝুমুর শিল্পীদের অনুষ্ঠান বেড়েছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে নরেন হাঁসদা, সুনীলবরন পাল, স্বপন কালিন্দী, সাধুচরন দাস, অঞ্জনা মহাপাত্র প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলার পশ্চিম প্রান্ত থেক যাওয়া অনেক মানুষ বিশেষত আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই আসামের চা-বাগানে কাজ করেছেন। সেখানেও ঝুমুর গান ও নাচের ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে গেছেন তারা। ডিব্রুগড়ের চা-বাগানগুলিতে সাদরি মানে বাংলা ওড়িয়া এবং সাঁওতালি মিশ্রিত এক স্থানীয় উপভাষার ঝুমুর গান বেশ জনপ্রিয়। এই গানের সঙ্গে ঝুমুর নাচও হয়।

সবরনখা নদী

মুখ থেকে লেখায়
অনেকের মতে চন্ডীদাসের লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ঝুমুর গানের প্রাচীনতম নিদর্শন। কৃষ্ণকীর্তনের ভাষ বাঁকুড়া, মানভূম তথা ঝাড়খন্ড অঞ্চলের লৌকিক ভাষা। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ঝুমুর গানের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। আবার যে শিক্ষিত গীতাকার ও সুরকাররা এই গানে এলেন তাদের একটা বড় অংশ বৈষ্ণব ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে ঝুমুর গানে বৈষ্ণব ভাবধারা ও কীর্তনের সুর আরও বেশি করে প্রবেশ করতে থাকে। মানুষে প্রেমের সঙ্গে মিশে গেল রাধাকৃষ্ণের ধর্মীর প্রেরণা। রাজা-মহারাজা ও বিত্তশালীদের দরবারে গাওয়া উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রভাব যুক্ত দরবারি ঝুমুরে এই বৈষ্ণব ভাবধারার ছাপ স্পষ্ট। রাধাকৃষ্ণের প্রেম, মিলন ও বিচ্ছেদ বৈষ্ণব পদাবলী প্রভাবিত এই ঝুমুরের বিষয়। রামায়নের বেশ কিছু অংশও এই সময় ঝুমুর গানে ঢোকে।

এই সময় থেকেই ঝুমুর গানের নীতিকার ও সুরকারদের মধ্যে শিক্ষিত উচ্চবর্গের মানুষরা আসতে থাকেন। মৌখিক গানের জায়গায় আসে লিখিত গান। সুরের বৈচিত্র কথা ও উৎকর্ষে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি বা জাতপাতের মধ্যে আটকে না  থেকে ঝুমুর গান সাধারণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। আপন খেয়াল মাঠে ঘাটে, আনন্দেবিরহে গেয়ে ওঠা ঝুমুর গান ও নাচেও এল সুনির্দিষ্ট কাঠামো। বৈঠকী রীতির ঝুমুর গানের সঙ্গে আসর মাতিয়ে দিল নাচনীদের নাচ। মৌখিক এবং লিখিত ঝুমুর গানের তফাৎ এই পর্ব থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। জমিদার আর রাজাদের দরবার পেরিয়ে ঝুমুর হয়ে উঠতে লাগলো মানুষের গান।

Developed by DXDasia