বিলেতে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে প্রথম ডক্টরাল থিসিস জমা দিলেন সাহানা বাজপেয়ী

বিলেতের শিক্ষায়তনিক ইতিহাসে এহেন উদ্যোগ এই প্রথমবার

নিজের বিশেষত্ব নিয়েই তিনি গান ভালোবেসে গান। প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার পাওয়াকে জীবনের শেষ কথা মনে করেন না। সংসার-সন্তান সামলে, লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ে (SOAS University of London) বাংলা পড়ানোর দায়িত্ব সামলে, দেশ-বিদেশে গানের অনুষ্ঠান সামলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, যেকোনও পরিস্থিতিতে সাংগীতিক চর্চা সর্বোপরি গান গেয়ে চলাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। বাংলা গান বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। নিজস্ব শিকড় আঁকড়ে বরাবরই নিজের কাজে স্বতন্ত্রতা এবং মেধার পরিচয় দিয়েছেন তিনি, আবারও দিলেন। সম্প্রতি রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে বিলেত অর্থাৎ ইউকে-র শিক্ষায়তনিক ইতিহাসে প্রথম ডক্টরাল থিসিসটি জমা দিয়েছেন সংগীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়ী

লন্ডনের কিং’স কলেজে (King’s College London) এথনোমিউজিকোলোজি-তে পিএইচডি করছিলেন সাহানা, বিগত চার বছর ধরে থিসিসের কাজ করেন। বিষয় ছিল- রবীন্দ্রসংগীত : দ্য পলিটিক্স অফ পারফরম্যান্স।

১৮ ডিসেম্বর নিজের সামাজিক মাধ্যমে নিজেই এই খবর জানান তিনি। লন্ডনের কিং’স কলেজে (King’s College London) এথনোমিউজিকোলোজি-তে পিএইচডি করছিলেন সাহানা, বিগত চার বছর ধরে থিসিসের কাজ করেন। বিষয় ছিল- রবীন্দ্রসংগীত : দ্য পলিটিক্স অফ পারফরম্যান্স। থিসিস জমা দেওয়া সংক্রান্ত এই পোস্টে বাবা-মা’কে স্মরণ করার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি লেখেন, “রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে বিলেতের (UK) একাডিমিয়ার ইতিহাসে প্রথম ডক্টরাল থিসিসটি (আমার সুপারভাইসরের তথ্যানুসারে, আমি যাচাই করে দেখিনি) জমা পড়লো এই আশায় যে আরো অনেক গবেষক অনুপ্রাণিত হবেন।” অথচ এই পিএইচডি করা নিয়েই একসময় টিপ্পনি শুনতে হয়েছিল তাঁকে। এই পোস্টে তিনি লেখেন যে, তাঁর গবেষণার বিষয় শুনে একবার একজন অতিশিক্ষিত অধ্যাপিকা বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কিংস কলেজ লন্ডনে পিএইচডি করার মানে কী? সেটা তো পশ্চিমবাংলায় বসে বাংলা ভাষায় করা উচিত ছিল।” বুদ্ধিদীপ্ত সাহানা এ ব্যাপারে বলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে শুধু নিজেদের ভাষায় কুক্ষিগত করে রাখাতে কী মাহাত্ম্য আছে তাঁর জানা নেই। যে গানের ধারাকে তিনি এতকাল এতো ভালোবেসেছেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে গিয়ে গেয়েছেন, সেই গান সম্বন্ধে সংস্কৃতি ও ভাষা নির্বিশেষে সকলের জানা-শোনা জরুরি বলে মনে করছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “যখন ভারতীয় সংগীতের নিরিখে বিলিতি একাডেমিয়া ‘ট্যাগোর’ বলতে বেশ কিছুকাল যাবৎ সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরকেই বেশি চেনেন। আমাদের গানের প্রাণের ট্যাগোর কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন এখানে, শুধু কলোনিয়াল – পোস্টকলোনিয়াল ন্যাশনালিজম নিয়ে পাতার পর পাতা নেমেছে – গানের কথা কই?”

 

এই পোস্টে তিনি জানান, থিসিসের কাজ চলাকালীন অনেক মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘদিন পড়াশোনা-পেশাগত কারণে শান্তিনিকেতনের বাড়ি, চেনা পরিবেশ, বন্ধুবান্ধব ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকতে হয় বলে মনকেমন থাকেই। গত চার বছরে তিনি তাঁর মা’কে হারিয়েছেন, কাছের বন্ধুদের থেকে আঘাত পেয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনে দায়দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যেই চালিয়ে গিয়েছেন থিসিসের কাজ। ভেঙে না পড়ে জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। স্মরণ করেছেন, শেষ সময়ে হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে মায়ের জিজ্ঞাসা – “শেষ করতে পারবে তো, হটি?” 

সোশাল মিডিয়ায় সাহানা বাজপেয়ী-র পোস্ট

মায়ের জিজ্ঞাসার যথাযথা উত্তর দিতে পেরে খুশি সংগীতশিল্পী। জানিয়েছেন এবার তিনি ছুটি কাটাতে পারবেন। লন্ডনের কিং’স কলেজে নিজের ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়ানো একটি ছবির সঙ্গে থিসিস জমা দেওয়ার সংবাদটি জানিয়ে লেখেন, “আমার প্রিয় বাবা-মায়ের স্মৃতিতে, যাঁরা আমাকে রবীন্দ্রসংগীতের অন্তর্জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের অনুপস্থিতিতেও, আমি তাঁদের ভালোবাসা ও চির সমর্থনের উষ্ণতা অনুভব করি।” 

Developed by DXDasia