বুকের মাঝে গীতবিতান রেখে বুদ্ধদেবের জীবনে এসেছিলেন ঋতু গুহ

তাঁকে দেখতে সুপুরুষ। শরীরের গঠনে রাজকীয় ছাপ। তিনি তখন টেনিস খেলেন, রাইফেল শুটিং প্র্যাকটিস করেন এবং শিকারেও যান। ততদিনে লিখে ফেলেছেন ‘হলুদ বসন্ত’, ‘জঙ্গলমহল’। সিএ পরীক্ষা দিচ্ছেন, চাকরি করছেন। দক্ষিণীতে গানও শেখেন। এইরকম সুপুরুষ যুবক আদর্শ প্রেমিকের তালিকায় পড়ে। একদিকে সুপরিকল্পিত জীবন আবার অন্যদিকে রোমাঞ্চের তুমুল নেশা। যিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি পাঠককে কৈশোর ভেঙে যৌবনে প্রবেশ করিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে বাঙালি পাঠক জঙ্গলের বুনো গন্ধ গায়ে মেখেছে। সেই সুপুরুষের প্রেম প্রস্তাব কি কোনও মেয়ে উপেক্ষা করতে পারে?

ঋতু গুহ পেরেছিলেন। দক্ষিণী-র সূত্রে একে অন্যকে চেনেন। কিন্তু কোনও কথা হয়নি কোনওদিন। নাটকের রিহার্সালও করেছেন, তবুও দুজনে নীরব থেকেছেন (বুদ্ধদেব গুহ ঋতু গুহ)। তখন বুদ্ধদেব গুহ তাঁর ভাঙা যৌবনের প্রথম সিঁড়িতে। জীবনটা বোহেমিয়ান হতে পারত কিন্তু তাঁর জীবন চলেছে একেবারে ফর্মুলার ধাঁচে। পরিবারের কড়া শাসন আর যৌবনের পাগল করা প্রেম। যে বুদ্ধদেব ততদিনে শিকারির তকমা পেয়ে গিয়েছেন, তিনি এক মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে দিয়ে বহুবার হোঁচট খাচ্ছেন। কী উপায়ে প্রেমের প্রস্তাব দেবেন, সেটাই ভাবছিলেন দীর্ঘদিন। অবশেষে চিঠি লিখে প্রেম প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবেন। তবে চিঠি লিখতে গিয়ে খেয়াল করলেন সেই চিঠি এত দীর্ঘায়িত করে ফেলেছেন যা পড়তে অসহ্য লাগবে। শেষে সেই চিঠি কাটছাঁট করে ষোলো পাতায় আনলেন।

যে বুদ্ধদেব ততদিনে শিকারির তকমা পেয়ে গিয়েছেন, তিনি এক মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে দিয়ে বহুবার হোঁচট খাচ্ছেন। কী উপায়ে প্রেমের প্রস্তাব দেবেন, সেটাই ভাবছিলেন দীর্ঘদিন। অবশেষে চিঠি লিখে প্রেম প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবেন।

তখন মে মাসের বিরক্তকর গরম। ঘামে ভিজে গিয়েছে কলকাতা। কিন্তু কীভাবে সেই চিঠি ঋতু গুহকে দেবেন, সেটা আর ঠিক করতে পারছিলেন না তিনি। প্রতিবারই একটু একটু সাহস জুগিয়ে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন আবার পিছিয়ে আসছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে জীবনে অনেক শিকার করেছেন। একবারের জন্য বুক দুরুদুরু করেনি। কিন্তু ঋতু গুহকে চিঠি কীভাবে দেবেন তা নিয়ে দোটানায় ছিলেন বুদ্ধদেব। এই চিন্তা করতে করতে অনেক দিন অতিবাহিত হল। বুক পকেটে রাখা সে চিঠি ঘামে ভিজে গেল। অনেক লেখায় উবে গেল। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে তিনি আবার চিঠি লিখলেন। ঠিক করলেন সেইদিনই ঋতু গুহকে চিঠি দিয়েই বাড়ি ফিরবেন। মনে অদম্য জেদ। ঋতু গুহ দক্ষিণীর ক্লাস থেকে বেরিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। বুদ্ধদেব গুহ আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলেন ঋতু গুহের দিকে। চিঠিটা হাতে ধরিয়ে গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘তিন দিনের মধ্যে উত্তর চাই!’ ঋতু গুহ ভয়ে চুপ করে মাথা নিচু করে রইলেন।

বুদ্ধদেব গুহ, ঋতু গুহ, মালিনী ও সোহিনী (১৯৮০)

প্রেম প্রস্তাব দেওয়ার পড়ে উত্তরের অপেক্ষাটা আরও জটিল। কিন্তু বুদ্ধদেব তখনও বুদ্ধ হয়ে ওঠেনি। অশান্ত মনে ঝড়ের আগমন হয়েছিল বারবার। সেই অস্থিরতা তাঁকে পাগল করে তুলেছিল। তবে সে চিঠির উত্তর আসেনি। তিন দিন থেকে সাতদিন কেটেছে। বুদ্ধদেব অস্থির হয়েছেন টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে। সে টেলিফোন বাজেনি। তখন বর্ষা সবেমাত্র এসেছে শহরে। কিন্তু মনের ভিতরে ঝড় উঠেছিল আগেই। সে ঝড় তখনও শান্ত হয়নি। উত্তর আসেনি ভালোবাসার। তরুণ বুদ্ধদেবের মাথায় তখন আগুন। সেই সময়ে ঋতু গুহর ৪৮ আরপিএম-এর রেকর্ড বেরিয়েছে। গড়ের মাঠে গিয়ে লাথি মেরে সেই রেকর্ড চুরচুর করে ভেঙে ফেললেন বুদ্ধদেব। তবুও মাথা থেকে রাগ কমল না। মগ্ন রইলেন নিজের কাজে। টেনিস, রাইফেল, লেখা, আর গানে।

প্রায় মাস খানেক বাদে ফোনটা বেজে উঠল। তখন বর্ষা দখল করে নিয়েছে কলকাতা। বৃষ্টির বিষণ্ণতার মধ্যে একটা মাদকতা আছে। উন্মাদনা আছে। ফোনটা ধরলেন বুদ্ধদেব। ফোনের ওপারে এক নারীর কণ্ঠস্বর। ঋতু গুহ নন। তাঁর এক আত্মীয়। তিনি জানালেন, ‘আগামীকাল ঋতুদির আকাশবাণীতে অনুষ্ঠান আছে। সেই অনুষ্ঠানের শেষে আপনার চিঠির জবাব পাবেন।’ বুদ্ধদেব আজীবন ভালোবাসার জন্য কাঙাল ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার ভারী ইচ্ছে করে আমার কোনও ভীষণ সুখের মুহূর্তে এমন সুন্দর কোনও পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনোদিন আমি জাস্ট ফেড-আউট করে যাব।’ মনের ভিতরে তখন একরাশ প্রশ্ন। কী বলবেন ঋতু গুহ! সেই রাতে ঘুমোতে পারেননি তিনি। সুন্দর মুহূর্তে প্রবেশের আগে ফেড-আউট হয়ে যাওয়ার মতন তাঁর অবস্থা।

তিনি পৌঁছালেন আকাশবাণী। ওদিকে ঋতু গুহের লাইভ অনুষ্ঠান চলছে। প্রথম গান গাইলেন, ‘…কাঙাল আমারে কাঙাল করেছে’। দ্বিতীয় গান গাইলেন ‘রূপে তোমায় ভোলাব না’। তারপরে মাথা নিচু করে ঋতু এলেন। বুকের মাঝে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরা গীতবিতান। ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমি এসেছি।’ বর্ষা তখন আনন্দে ভিজিয়েছিল সারা শহরকে। সে এক অনাবিল আনন্দ। একই ছাতার তলায় ভিজতে ভিজতে হেঁটে যাওয়ার মজাটাই আলাদা। সে প্রেম সারা শরীরে শিহরণ তৈরি করে। মজলিশী মেজাজে আনে আদুরে ছোঁয়া।

মাথা নিচু করে ঋতু এলেন। বুকের মাঝে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরা গীতবিতান। ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমি এসেছি।’ বর্ষা তখন আনন্দে ভিজিয়েছিল সারা শহরকে। সে এক অনাবিল আনন্দ। একই ছাতার তলায় ভিজতে ভিজতে হেঁটে যাওয়ার মজাটাই আলাদা।

তাঁর প্রতিটা উপন্যাসই আদতে জীবনের গল্প। ‘খেলা যখন’ উপন্যাসে তাঁর এবং ঋতু গুহের কাহিনি নিয়েই গল্প এগিয়েছে। বুদ্ধদেব গুহ ভালোবাসার মতো পবিত্র মোহকে ভালোবাসা দিয়েই গ্রহণ করতে শিখিয়েছেন। অরণ্যের মতো আদিম যৌনতাকে ট্যাবু করে রাখেননি। মুক্ত করে দিয়েছেন সবার মধ্যে। তাই তো বয়সন্ধিক্ষণে বাঙালি পাঠকরা লুকিয়ে বুদ্ধদেব গুহ পড়েছে। ‘মাধুকরী’ উপন্যাসে পৃথু ঘোষ আর রুষা তো বাঙালির কাছের হয়ে উঠেছে। লুকিয়ে ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ পড়তে পড়তে বাঙালি কিশোর বুকের ভিতরে যৌবনের প্রথম আলোড়ন টের পেত। কিশোরী নিজের অজান্তেই কখন যেন যুবতী হয়ে উঠত। তিনি বাঙালির বেড়া ভেঙেছেন। প্রেমের মাহাত্ম্য বুঝিয়েছেন। টপ্পা শুনিয়েছেন। বুনো মাংস রান্না করতে শিখিয়েছেন। সারাজীবন প্রেমের পাশাপাশি হাঁটতে বলে গিয়েছেন। ঋতু গুহ কোয়েলের কাছে ছাড়া বুদ্ধদেবের আর কোনও বই পড়েননি। এ কথা বহুবার স্বীকার করেছেন খোদ লেখক। কিন্তু বুদ্ধদেব গুহ বারবার ঋতু গুহের গানের প্রেমে পড়েছেন। তিনি একবার লিখেছিলেন, ‘ঋতুর গান আমার হৃদয়ের এমন জায়গা স্পর্শ করেছিল যে সেখানে সম্ভবত ঈশ্বরের আঙুল ছাড়া অন্যের আঙুল পৌঁছায় না।’ একটা সময়ের পরেও একই বাড়িতে থেকে ঋতু গুহকে চিঠি লিখতেন বুদ্ধদেব গুহ। তিনি মজা করে একবার লিখেছেন, ‘ঋতু আমাকে দেখা মাত্রই মুখটা পেঁচার মতো করে ফেলত।’ তবুও তিনি বারবার ঋতু গুহের প্রেমে পড়েছেন। তাঁর সঙ্গে ঋতু গুহের প্রথম দেখা ১৯৫৪ সালের চৈত্র মাসে। তারপর আলাপ ১৯৬১ সালের মে মাসের পর। মাঝে সাত বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। এই সাত বছর শুধুমাত্র একে অন্যকে চুপচাপ দেখে যাওয়া। এটাই হয়তো প্রেমের স্থবিরতা। ঋতু গুহ বুদ্ধদেবকে বারবার সঠিক খাদ্যভাসের মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন। ডায়েট মেনে চলতে বলতেন গুহ মশাইকে।

তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখ — অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখ, হে সূর্য, হে সুপুরুষতম সুপুরুষ, হে আনন্দের আনন্দ। আমাকে আরও অনেক দিন, অনেক দিন তোমার আলোয় ভরা পৃথিবীতে, তোমার পাখিডাকা বনে বনে একটি মুগ্ধ ভক্ত অনাবিল মন নিয়ে সুন্দরের খোঁজে খোঁজে ফেরাও।…’ তিনি কখনও আক্ষেপ করেননি। বারবার বলতেন, ঋতু গুহ না থাকলে তিনি হয়তো সারাজীবন জংলি থেকে যেতেন। সিএ পরীক্ষায় পাশ করার পড়ে বিয়ে করেছেন। একসঙ্গে পার করেছেন অনেকগুলো বসন্ত। জঙ্গলে গিয়েছেন। জঙ্গলের আভিজাত্যে খুঁজে পেয়েছেন ‘বন জ্যোৎস্নার সবুজ অন্ধকার’। তিনি বারবার বলতেন, ‘এই ফ্ল্যাটটা ঋতু নিজে হাতে সাজিয়েছে।’ যে ফ্ল্যাটে তাঁরা কাটিয়েছেন বহু ‘হলুদ বসন্ত’। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ঋতু যখন মারা গিয়েছে তখন ওর সঙ্গে শেষ যাত্রায় যেতে পারেনি। সাহস হয়নি। ওর মৃতদেহের সামনে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, কখনও কোনও ভুল হলে ক্ষমা করে দিও।’ তাঁর চলে যাওয়ার পড়ে বর্ষা এসেছে বহুবার। কত যুগল আবার দৌড়ে গিয়েছে অরণ্যে। শুধু অরণ্যদেব নেই। তবুও তাঁর মখমলে আদর আজও বেঁচে আছে। বেঁচে আছে পৃথু, রুষা এবং আরও অনেকে। ‘…তারপর আমাকে কেউ ডাকলেও আমি ফিরব না — আমি নিজে — ডাকলেও আমি আর সাড়া দেব না। অথচ আমি আমার চারপাশের অন্ধকারেই ছড়িয়ে থাকব — ঝিঁঝির ডাক হয়ে থাকব, জোনাকি হয়ে থাকব…’ এই বর্ষায় বারবার মনে পড়ে লালাসাহেবকে। তাঁর প্রেমের পঞ্চরাগকে।

______________________
তথ্য: বুদ্ধদেব গুহের ব্যক্তিগত বৃত্তে থাকা স্নেহভাজন গুণীজন, বেশকিছু উপন্যাস এবং সাক্ষাৎকার। ছবি ইন্টারনেট এবং ইউটিউব সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া।

Written by