
স্বশিক্ষিতা এক নারীর আশ্চর্য আখ্যান
খিড়কির ঘাটে বারো বছরের মেয়েটি শুনল, তার মা তাকে ‘অন্যের বাড়ি’-তে পাঠানোর তোড়জোড় করছেন। তার বিশ্বাস হয় না। এদিকে বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু হল। বিয়ে শেষও হল। বর ফিরে যাওয়ার দিন ছোট্ট মেয়েটি ভাবল, যারা এসেছে তারাই বুঝে ফিরে যাচ্ছে। এই ভেবে আহ্লাদে মেয়েটি মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুল ভাঙে। সে বুঝতে পারে, তাকে সত্যি-সত্যিই অন্যের বাড়ি পাঠানো হচ্ছে। মাকে জাপ্টে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে থাকে, “মা তুমি আমাকে দিও না।” মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ভয় নেই, পরমেশ্বর তো আছেন। মেয়েটি ভয়ে-যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে, “মা! পরমেশ্বর কি আমার সঙ্গে যাবেন?”
এই পরমেশ্বরই এরপর থেকে আজীবন ঘিরে থাকবেন রাসসুন্দরী দাসীকে। তাঁর সমস্ত ভয়ে, সুখে-দুঃখে, পুত্রশোখে, অভিমানে… এমনকি এই সরল, ভিতু, বিশ্বাসপ্রবণ মহিলাটির লেখাপড়া শেখার গল্পেও জুড়ে যাবেন তাঁর ‘পরমেশ্বর’। আর, সেই পড়তে ও লিখতে শেখার ফসল হিসেবেই জন্ম নেবে ‘আমার জীবন’। বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মজীবনী।
‘আমার জীবন’ প্রথম প্রকাশ পাচ্ছে ১৮৭৬ সালে। তখন রাসসুন্দরীর বয়স ৬৭। একুশ বছর পরে ফের এই আত্মজীবনীর ‘দ্বিতীয় ভাগ’ রচনায় হাত দিলেন রাসসুন্দরী। সহজ পাটিগণিতেই পাঠক বুঝতে পারছেন, তখন তাঁর বয়স অষ্টআশি। পাবনা জেলার পোতাজিয়ায় ১৮০৯ সালে রাসসুন্দরীর জন্ম। তখন বিদ্যাসাগরের জন্ম হয়নি, রামমোহনের হাত ধরে আধুনিকতার দিকে গড়াতে শুরু করেনি বঙ্গসমাজও। সেই রাসসুন্দরীই আবার যখন আত্মজীবনীর ‘দ্বিতীয় ভাগ’ লিখছেন, তখন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ঘটে গেছে। বিশ শতক কড়া নাড়ছে দোরগোড়ায়। মাঝের সময়টা খুব দ্রুত বদলেছে। আর একজন সহজ গৃহবধূ সেই সময়ের মধ্যে শিকড় গেঁথেই বড়ো আটপৌরে ভাষায় লিখে গেছেন নিজের আত্মকথা।
সেই ছোট্টবেলায় বাড়ির বড়োরা তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামের পাঠশালায়। পড়তে নয়, মূলত সময় কাটাতে। সেখানে মেমসাহেব শিক্ষিকার পাশে বসে-বসেই মেয়েটি মনে-মনে শিখে নিয়েছিল অ-আ-ক-খ, এমনকি খানিকটা ফার্সিও। কিন্তু, সেইসব শিক্ষা গোপন রাখতে হয়। মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে তো ঘোর অমঙ্গল! সেই লুকিয়ে শেখাও একদিন বন্ধ হয়ে যায় স্কুল আগুনে পুড়ে যাওয়ায়। এরপর বিয়ে। শাশুড়ি অবশ্য তাঁকে বুকে টেনে নিলেন পরম স্নেহে। মা-কে ছেড়ে আসার ক্ষত শুকোতে লাগল। রাসসুন্দরী লিখেছেন, “এ কি অপূর্ব ঘটনা। কোন্ গাছের বাকল কোন্ গাছে লাগিল। তাহাদের কাছে সকল দিন থাকিতে থাকিতে আমি তাহাদের পোষা পাখী হইয়া তাহাদের শরণাগত হইলাম…”
এই ভাষ্যে পিতৃতান্ত্রিক আনুগত্যের গন্ধ ভুরভুর করছে। স্বাভাবিক, রাসসুন্দরী বিদ্রোহিনী নারী নন। তাঁর লেখায়-কথায় কোনও বিদ্রোহ নেই। কিন্তু তারপরেও তিনি অনন্যা। শুধুমাত্র, মাতৃভাষায় প্রথম আত্মজীবনীর রচয়িতা বলেই নন। একগণ্ডা সন্তান, সংসারের দায়িত্ব, লোকলজ্জার ভয়, হাজারো সংস্কারের মধ্যেও তাঁর স্বয়ংশিক্ষিতা হয়ে ওঠার আখ্যান আসলে একটি লড়াই। পুঁথি পড়া, লিখতে শেখা আসলে তাঁর স্বাধীনতা পাওয়ার গল্প। সেই গল্প শুনতে শুনতে সেদিনের সেই সাধারণ, ঘোরতর ঈশ্বরবিশ্বাসী গৃহবধূটির প্রতি মুগ্ধতাই ঘন হয়।
শৈশবে পড়াশোনার অপমৃত্যু ঘটেছিল। তাকে ফের বাঁচিয়ে তুলেছিলেন রাসসুন্দরী নিজেই। পুঁথি পড়ার অগাধ ইচ্ছে তাঁর। মা তাঁকে শিখিয়েছিলেন, সঙ্কটের সময় পরমেশ্বর দয়ামাধবকে ডাকতে হয়। রাসসুন্দরীও শরণ নিলেন পরমেশ্বরের—“পরমেশ্বর! তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও।” একদিন অভাবিত সুযোগও চলে এল। তাঁর স্বামী চৈতন্যভাগবতের একটি পুঁথি নিয়ে এলেন বাড়িতে। রাসসুন্দরী গোপনে সেই পুঁথির একটি পাতা খুলে লুকিয়ে রাখলেন রান্নাঘরে। একইসঙ্গে লুকিয়ে রাখলেন আট বছরের বড়ো ছেলের লেখা তালপাতাও। রান্নার কাজের ফাঁকে লুকিয়ে সেই তালপাতা ও পুঁথি মিলিয়ে চলতে লাগল অক্ষর চেনার সাধনা। ক্রমে রাসসুন্দরীর নিষ্ঠার কাছে ধরা দিল বাংলা অক্ষর, শব্দ, বাক্যবন্ধ, ব্যাকরণ। প্রায় দুশো বছর পর রাসসুন্দরীর এই গল্প শুনে অলীক লাগে। মনে হয় এইসব ঘটেইনি কখনো, ঘটতেই পারে না।
অথচ, এভাবেই পড়তে ও পরে লিখতেও শিখেছিলেন রাসসুন্দরী। অবিশ্বাস্যভাবে, তাঁর পড়াশোনা শেখার লড়াইতে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ননদরা। ছেলেরা কলকাতা থেকে এনে দিত কাগজ-কলম, বায়না জুড়ত চিঠি লেখার জন্য। এভাবেই ছেলে কিশোরীলালকে চিঠি লিখতে লিখতেই লেখার দরজাটিও খুলে ফেললেন রাসসুন্দরী। ভাগ্যিস খুললেন। নাহলে তৎকালীন বঙ্গনারীর অন্তর-মহলের অনেক কথাই অজানা থেকে যেত আমাদের।
কী আছে রাসসুন্দরীর লেখায়? অসামান্য সাহিত্য গুণ? নাহ, আধুনিক পাঠক তাঁর গদ্য পড়তে গিয়ে হতাশও হতে পারেন। আবার বিস্মিত হতে পারেন রাসসুন্দরীর বিস্ময়বোধ দেখে, ভাষার সারল্য দেখে। ভয়, বিশ্বাস, মাতৃত্ব, অতি সহজ আটপৌরে অনুভূতি জড়াজড়ি করে আছে তাঁর লেখায়। স্বামীর ঘোড়ার সামনে দাঁড়াতে তিনি লজ্জা পান। “কর্তার ঘোড়ার সম্মুখে আমি কেমন করে যাই, ঘোড়া যদি আমাকে দেখে তবে বড়ই লজ্জার কথা।” স্বামীর ঘোড়া স্বামীর মতোই সম্মানীয় বটে।
রাসসুন্দরীর এই মনোজগতের কাছে এসে থমকে দাঁড়াতে হয়। অবাক হয়ে দেখতে হয়, পরমেশ্বরের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতা। সরলাবালা সরকারের আত্মকথা থেকে জানতে পারি, রাসসুন্দরী নাকি মদনগোপালের সঙ্গে ঝগড়া করতেন, অভিমান করতেন ঠাকুরের ওপর। নব্বই ছুঁইছুঁই বয়সে পা ভাঙলেন পড়ে গিয়ে। তারপরেও গোঁসা করলেন মদনগোপালের ওপর। যিনি আজীবন স্বাবলম্বী, এই বয়সেও নিজের হাতে রান্না করেন, তাঁকেই কিনা শয্যাশায়ী করে দিল মদনগোপাল। প্রতিবাদে অনশন শুরু করলেন রাসসুন্দরী। তারপর নাকি ছদ্মবেশে তাঁকে দেখা দিলেন মদনগোপাল। রাসসুন্দরীর বিশ্বাস তৈরি হল, তাঁর পা ঠিক হয়ে যাবে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে, সত্যিই তিনি হাঁটতে শুরু করলেন ক’দিন পর থেকেই।
আধুনিক মানুষ হয়ে এইসব ঘটনা বিশ্বাস করতে সাধ হয় না, কিন্তু রাসসুন্দরীর নিজস্ব বিশ্বাসটিকে দেখে বিস্ময় জাগে। আঠেরো থেকে তেতাল্লিশ বছরের মধ্যে বারোবার গর্ভধারণ করেছেন তিনি। সন্তানদের মৃত্যু দেখেছেন। সেই মৃত্যশোকের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে তাঁর ঈশ্বরবিশ্বাস ও সমর্পণ। এই বিশ্বাস ঠিক ধর্মান্ধতা নয়, তাঁর ঈশ্বর বরং তাঁর জীবনদেবতা। যার কাছে সব উপুড় করা যায়, যাকে ঘিরে বাঁচা যায় কোনো এক নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে। এই দেবতার মতো আত্মীয় আর কেউ নেই।
এইসব অবলুপ্ত আত্মীয়তার খোঁজ আমাদের দেন রাসসুন্দরী। আর যা-যা দেন, তা বুঝতে হলে তাঁর লেখা বইটির পাতা না উলটে উপায় থাকে না।
তথ্যঋণ: আমার জীবন, রাসসুন্দরী দাসী, বারিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত।
