
বস্তি এলাকার মহিলাদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন
ভোট উৎসবে মেতে উঠেছে বাংলা। মিডিয়া উত্তপ্ত। রাজনৈতিক দল, ভোটপ্রার্থীদের মধ্যেও উদ্দীপনা বাড়ছে। ভোটের বাজারে রোজগার হয় অনেকেরই। শিলিগুড়ি বিধান মার্কেটে এমনই এক ব্যবসায়ী রামহরি পাল। ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ফ্ল্যাগ, ভোট প্রচারের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করেন। কিন্তু অতীতের পরিস্থিতি আর আজকের অবস্থার মধ্যে অনেক ফারাক। ত্রিশ চল্লিশ বছর আগে তাঁকে ভোটের আগে অল্প দু’চারটে জিনিস তৈরি করতে হত। কিন্তু আজ চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মহিলা হস্তশিল্পীদের কাছে অর্ডার দিয়ে ভোট প্রচারের সামগ্রী তৈরি করেন। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা তাঁর কাছে এসে কিনে নিয়ে যান।
মহিলা হস্তশিল্পীদের কাছে অর্ডার দিয়ে ভোট প্রচারের সামগ্রী তৈরি করেন
আজকাল ফ্ল্যাগ তৈরির চাপ কমেছে। সেসব বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। অতিরিক্ত ফ্ল্যাগের চাহিদা পূরন করার মতো শক্তি নেই। তাছাড়া কলকাতা, দিল্লি, গুজরাটে আজকাল বড়ো বড়ো মেশিনে লক্ষ লক্ষ ফ্ল্যাগ তৈরি হয় একসঙ্গে। তবে রোড শো ফ্ল্যাগ, হোস্টিং ফ্ল্যাগ রামপালবাবুরা শিলিগুড়িতেই তৈরি করেন। এর বাইরে ভলান্টিয়ার ব্যাজ, দলীয় প্রতীকের ব্যাজ, চিফ গেস্ট ব্যাজ, মাথার টুপি, মাফলার, বাইক ফ্ল্যাগ, গলার উত্তরীয় প্রভৃতি তাঁরাই তৈরি করেন। সম্প্রতি শিলিগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রোড শো-র জন্য অনেক ফ্ল্যাগ তাঁরা সরবরাহ করেছেন।
৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পেশায় যুক্ত রামহরিবাবু
জোড়া ফুল থেকে শুরু করে পদ্ম ফুল, কাস্তে হাতুড়ি তারা, হাত চিহ্ন প্রভৃতি বিভিন্ন দলের প্রতীক সম্বলিত ভোট প্রচার সামগ্রী তৈরি নিয়ে তিনি এখন ব্যস্ত। দু’শো টাকা থেকে দু’হাজার, পাঁচ হাজার, দশ হাজার টাকা দামের সামগ্রী রয়েছে তাদের কাছে। এবারে ভোট ঘোষিত হতেই কিছু কিছু দলের লোক এসে নমুনা সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। রামহরিবাবু বলেন, “মনোনয়নপত্র দাখিল হওয়ার পর থেকে প্রার্থীদের মধ্যে আগ্রহ আরও বেড়ে যাবে। অন্যবার এমন হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির জেরে তাদের ভোট সামগ্রী তৈরির খরচ বেড়েছে। কিন্তু এখনও মূল্যবৃদ্ধি ঘটাননি। আবার বিভিন্ন নির্দল প্রার্থীও এসে অর্ডার দিয়ে নিজেদের প্রতীক ব্যাজ তৈরির অর্ডার দিয়ে যান।”
শুধু শিলিগুড়ি বা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভোট প্রচার সামগ্রী তিনি বিলি করেন না, প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমেও তিনি ভোট সামগ্রী তৈরি করে সরবরাহ করেন। সম্প্রতি সিকিম ক্রান্তিকারী মোর্চার ব্যাজ তৈরি করে সেখানে পাঠান। মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবসে অর্ডার আসে। তার সঙ্গে করোনা সচেতনতার কিছু লিফলেটও পাহাড়ে তৈরি করে পাঠান। ভোটের মনোনয়নপত্র দাখিলের পর কার্যত নাওয়াখাওয়া ভুলে যান রামহরিবাবু। তিনি বলেন, “ওইসময় ভিড় বেড়ে যায়। একের পর এক প্রতীক ব্যাজ, টুপি, ফ্ল্যাগ, মাফলার প্রতীকের ব্যাজের অর্ডার আসতে থাকে। ফলে সেসব তৈরির জন্য ঘুম ছুটে যায়।”
শিলিগুড়ি বিধান মার্কেটে তাঁর দোকান
কিছু স্টক এখন দোকানে রয়েছে। কিছু তাঁরা কলকাতায় অর্ডার দেওয়া শুরু করেছেন। বাকি তৈরি করা হয় গ্রাম বস্তি এলাকার মহিলাদের। মহিলারাও দুটো বাড়তি পয়সা রোজগারের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে এসব তৈরি করেন বাড়িতে বসেই। সেই অর্থে ভোট তাদের অনেকেরই অভাবের সংসারে একটু হাসি ফোটায়। তাঁরাও তাই নিয়মিত ভোটের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখেন। কোথায় কোন দলের সভা হচ্ছে, ভিআইপি কেউ আসছেন কিনা, কোন কেন্দ্রে কতজন প্রার্থী, নির্দল প্রার্থী কতজন সবই তাঁদের খোঁজ-খবরের মধ্যে রাখতে হয়। কারণ, এ ভোট যে তাদের পেটের ভাতও দেবে। এবার করোনা পরিস্থিতিতে চারদিকে ব্যবসাবাণিজ্য মন্দা থাকায় অর্থ সঙ্কট তীব্র হওয়াতে তাই একটু বাড়তি রোজগারের আশায় বুক বেঁধেছেন রামহরিবাবু-সহ অন্য আরও অনেকে।

