সাহেবদের টেক্কা দিতেই আকাশে উড়লেন ভারতের ‘প্রথম নভশ্চর’ বাঙালি রামবাবু

বাঙালির আকাশে ওড়ার আড়ালেও লুকিয়ে স্বাদেশিকতার বোধ

‘বেলুন চড়ে চল চলে যাই রূপকথারই রাজ্যে…’!

হ্যাঁ, সে যাওয়া যেতেই পারে। হ্যাঁ, সে যাওয়া যেতেই পারে। ‘দ্য রেড বেলুন’ সিনেমাটার মতো সত্যিই যদি রাশি রাশি বেলুনে চড়ে ঘর-মাঠ-সমুদ্র ডিঙিয়ে কোথাও চলে যাওয়া যেত… তবে, সবাই না পারলেও কেউ কেউ এই স্বাদ নিতে পেরেছেন বৈ কি। উনিশ শতকে কলকাতার আকাশে বেলুনারোহীদের বেশ ভালোই দেখা মিলত। প্রথম যুগে তারা সব সাহেব হলেও, এই শহরের ‘নেটিভ’ মানুষও পরে নাম লেখায় এই খেলায়। যেন ভেল্কিবাজি। হুউস করে এ-বাড়ির ছাদ, ও বাড়ির চূড়া পেরিয়ে, নদনদী-খালবিল এড়িয়ে বেলুন চড়া। আর নয়তো দিনে-দুপুরে টুপ করে আকাশ থেকে মাঝরাস্তায় বা বাড়ির চালে খসে পড়া। তারকা নয়। আস্ত মানুষ, বেলুনসহ। আর তাদের সে কেরামতি দেখতে হাজার হাজার লোক মাঠে ময়দানে সটান দাঁড়ানো। ভিড়ে ভিড়াক্কার।

কলকাতার আকাশে প্রথম নাকি বেলুন উড়েছিল ১৭৮৫ সালের ২৯ জুলাই। রাত্রিবেলা ৬ ফুট ব্যাসের একটি বেলুন উড়িয়েছিলেন উইনটল সাহেব। তবে হয়তো নিজে বেলুনে চড়েননি। ফলে জোটেনি ‘নভশ্চর’-এর তকমাও। কলকাতার প্রথম নভশ্চর ডি রবার্টসন। ১৮৩৬ সালের ১৬ মার্চ মুচিখোলার মাঠ থেকে বেলুনে চড়েছিলেন সাহেব। আর তা দেখতে কাশীপুর থেকে গার্ডেনরিচ অঞ্চলে উপচে-পড়া জনসমাগম। শুধু স্থলে নয়, জলেও নৌকার ঠেসাঠেসি। টিকিট কেটে লোকে দাঁড়িয়ে পড়েছে আশ্চর্য বেলুনভ্রমণ দেখতে। 

সে ঘটনার পর থেকেই অনেক সাহেবই বেলুনে তাক লাগাচ্ছিলেন এই শহরকে। টিকিটের পয়সায় লাভ কম হত না। কেউ কেউ আবার টিকিটের পয়সা নিয়েও বেলুনে চড়েননি ঠিকঠাক। হয় বেলুন ফোলেনি, নয় বেলুনে উঠেই নেমে পড়তে হয়েছে। সবমিলিয়েই কলকাতায় কিন্তু তখন বেলুন নিয়ে সোরগোল একটা চলছে। সমালোচনাও কম হত না এই ‘অভিযান’-এর। যেমন রাজকৃষ্ণ রায় তাঁর ‘বেলুনে বাঙালি বিবি’ প্রহসনে গান লিখেছিলেন- “হাজার হাজার কাতার কাতার / লোক চলেছে ভাই। / ছেলে বুড়ো কানা খোঁড়া / কেউ তো বাকি নাই / বেলুনবাজ সাহেব ভায়া / বেলুনে তুলবে কায়া / উড়বে খুব লাগিয়ে হাওয়া / লুটবে টাকা তাই…”

সে যাইহোক, এই গানটি যাকে নিয়ে, সেই পার্সিভাল স্পেন্সর সাহেবের সঙ্গে বাঙালির বেলুনে চড়ার এক গভীর যোগাযোগ। প্রথম বাঙালি বেলুনারোহী বা ভালোকথায় নভশ্চর রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম আরোহণটি ছিল এই সাহেবের সঙ্গেই। পরে একক আরোহণ। রামবাবু থাকতেন সিমুলিয়া অঞ্চলের কাঁসারিপাড়ায়। তা কেন রামবাবু হঠাৎ করে বেলুনে চড়তে ব্যস্ত হলেন…? এর একটা ইতিহাস তো রয়েইছে।

এমনিতে সময়টা তখন স্বদেশি যুগের। আকাশ-বাতাস জুড়ে স্বদেশির হাওয়া উঠছে। হিন্দুমেলার সূচনা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আর কথায় কথায় লাগছে তক্ক— ‘ওরা পারে, আর আমরা পারব না?’ এই প্রশ্ন সদাসর্বদা জাগিয়ে রাখতেন নবগোপাল মিত্তির। তেমনটাই লিখে গিয়েছেন অবন ঠাকুর ‘ঘরোয়া’-তে। তা সেই নবগোপালবাবু যখন বৃদ্ধপ্রায়, খেয়াল হল সার্কাস খুলবেন। দেশি সার্কাস। কেন? ‘ওরা পারে, আর আমরা পারব না…?’ তা এই মানুষটারই ধ্যানধারণা নিয়ে এলেন রামবাবু। ওদের থেকে আমরা কম নই। কম নই তা প্রমাণের জন্য ওরা যা করে, তাই-ই করা। তবে রামবাবু বাস্তবিকই সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। 

প্রথমে ১৮৮৯ সালের ১০ এপ্রিল স্পেন্সার সাহেবের সঙ্গে ‘ভাইসরয়’ বেলুনে চাপলেন রামবাবু। তাতেই ধন্য ধন্য পড়ে গেল। বাঙালি তার কমনীয়তা নমনীয়তা ঝেড়ে ফেলে রীতিমতো সাহসী এখন। সে বছরই ৪ঠা মে এককভাবে আকাশে উড়লেন রামবাবু। ভারতের প্রথম নভশ্চর। বিকেল পাঁচটা দশে বেলুন মাটি ছেড়েছিল। আর তা নাকি উঠেছিল প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায়। আর অনেক ঝক্কিঝামেলা পেরিয়ে সোদপুর স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে নাটাগড়ে নিরাপদে  অবরোহণ। অবশ্য সাহায্য করেছিলেন গ্রামবাসীরাও। তারপর ট্রেনে করে রাত নটায় কলকাতা ফেরা। কলকাতা তো বটেই ভারতবর্ষের ইতিহাসেও স্মরণীয় ঘটনা এটি। তারপর রামবাবু অবশ্য বহুবার বেলুনে চড়েছেন। এমনকি কলকাতার বাইরেও। বহু মানুষের সম্মান শ্রদ্ধা পেয়েছেন তিনি তৎকালীন যুগে। শুধু এটাই নয়, বেলুনে চড়ে, আকাশ ছুঁয়ে আবার প্যারাসুটে করে নেমেও এসেছেন মাটিতে। অবনীন্দ্রনাথ সাক্ষী ছিলেন, সেই আকাশচারণার। তবে খানিক স্মৃতির ভুলে তিনি সেটাকেই রামবাবুর প্রথম আকাশভ্রমণ লিখেছেন। সেই ভ্রমণে নিজেই প্যারাসুট বানানোর ভার নিয়েছিলেন নাকি। রাশিকৃত তসর কাপড়ে তা তৈরি হয়েছিল। অবশ্যই সফল অবতরণ হয়েছিল সেবারও।

অচিরেই বাঙালির হৃদয় দখল করেছিলেন রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সাহেবদের মতো সখের বেলুনবাজ তিনি ছিলেন না। সাহসের সঙ্গে, প্রাণের ঝকি নিয়ে বারবার এই আকাশছোঁয়ার পিছনে ভীষণভাবে জুড়েছিল, স্বদেশ প্রতি আবেগ। তাই সংবাদপত্রগুলিও প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। বাঙালির প্রথম সার্কাস ‘ন্যাশনাল সার্কাস’-এ ফ্লাইং ট্রাপিজের খেলা তিনিই দেখাতেন। পরবর্তীকালে নিজেই খুলেছিলেন, ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস কোম্পানি’। নর্মাল স্কুলে ব্যায়ামও শেখাতেন তিনি। বাঙালি জীবনে এইভাবে রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রামবাবু। তাঁকে দেখে পরবর্তীকালে অনেকেই বেলুন চড়েন। কালীঘাটের পটচিত্রেও ধরা হতে থাকে বাঙালির বেলুন চড়ার ইতিহাস। 

আজ এই উন্নত প্রযুক্তির যুগে, যখন আকাশে ওড়াটা কোনো ব্যাপারই নয়- তখন সেইসব প্রাচীন ওড়াউড়িগুলো অবাক করে দেয় বৈকি। সামান্য বেলুনে ভর করে মেঘের রাজ্যে ঘুরে আসা…. রূপকথার মতোই শোনায়। 

প্রচ্ছদের ছবিগুলি সিদ্ধার্থ ঘোষের লেখা 'কলের শহর কলকাতা' থেকে নেওয়া।

Post Tags
Developed by DXDasia