
গোবিন্দ রায়ের কাছে সুফি মতে দীক্ষা নেন
‘যত মত তত পথ’ – এই কথা বলেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, জগতের সব ক’টি ধর্মমতই সত্য। এগুলির মধ্য যে কোনো পথ অবলম্বন করেই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনো যায়। গভীর উপলব্ধি থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাব প্রবল হয়ে উঠেছিল। প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর আগ্রহ ছিল না। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল তাঁর। রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণের কাহিনি এবং ভক্তিমূলক নানা গান সহজেই কণ্ঠস্থ করে ফেলতেন। দেবদেবীর মূর্তি গড়তে ভালোবাসতেন। রানি রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে দেবী ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করলে রামকৃষ্ণ অর্থাৎ গদাধরের বড়ো দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় সেখানে প্রধান পুরোহিত নিযুক্ত হন। ১৮৫৬ সালে রামকুমারের মৃত্যু হলে সেই দায়িত্ব অর্পিত হয় গদাধরের ওপর। এই মন্দিরেই তিনি কালীর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। এরপর তিনি একে একে তন্ত্র, বৈষ্ণব, বেদান্তের পথে সাধনায় অগ্রসর হন এবং সিদ্ধি অর্জন করেন। সুফি ইসলাম এবং খ্রিস্টীয় মতেও তিনি সাধনা করেছিলেন।
গোবিন্দ রায় নামের এক সুফি সাধক দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন। রামকৃষ্ণের ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়ের মতে, গোবিন্দ ছিলেন জাতিতে ক্ষত্রিয়। অক্ষয়কুমার সেনের ‘শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পুঁথি’ অনুযায়ী তিনি কৈবর্ত্য, থাকতেন দমদমের কাছে। আরবি-ফারসি ভাষায় প্রগাঢ় জ্ঞান ছিল তাঁর। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বহু মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে নানান সম্প্রদায়ের সঙ্গে মেলামেশা করে তিনি ইসলামের উদারতার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং দীক্ষা গ্রহণ করেন। গোবিন্দ রায় মুসলমানদের সামাজিক নিয়ম কতটা মেনে চলতেন, তা জানা যায় না। তবে ইসলামে দীক্ষা নেওয়ার পর তিনি নিয়মিত কোরান পাঠ করতেন এবং সাধনার ব্যাপারেও ছিলেন নিষ্ঠাবান। ইসলামের সুফি ধারাই ছিল তাঁর পথ। রানি রাসমণির নির্দেশে দক্ষিণেশ্বরে সব ধর্মেরই সাধুসন্তদের সাদরে আপ্যায়ন করা হত। মুসলমান ফকির দরবেশরাও সমাদৃত হতেন। গোবিন্দ রায় এখানে পঞ্চবটী উদ্যানে কিছুদিন ছিলেন। ওই সময়ে তাঁকে অন্য কোথাও ভিক্ষা করতে হত না। মনের আনন্দে তিনি ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন থাকতেন।
সেটা ১৮৬৬ সাল। রামকৃষ্ণ পরমহংস মুগ্ধ হন গোবিন্দ রায়ের সরল বিশ্বাস এবং ঈশ্বরপ্রেমে। গোবিন্দের কাছে দীক্ষা নিয়ে ইসলাম সাধনা করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তিনি। গোবিন্দ সম্মতি জানালে শুরু হয় সুফি মতে সাধনা। রামকৃষ্ণ ওই সময়ে ‘আল্লাহ্’ মন্ত্র জপ করতেন, মুসলমানদের মতো কাছা খুলে কাপড় পরতেন, ত্রিসন্ধ্যা নামাজ পড়তেন। মুসলমানদের প্রিয় খাবারগুলি তিনি খেতে চাইতেন। গোমাংস খাওয়ার ইচ্ছেও তাঁর হয়েছিল। তবে মথুরামোহন বিশ্বাসের অনুরোধে সেটি আর খাননি। মথুরামোহন এক মুসলমান পাচককে আনিয়েছিলেন। সেই পাচকের নির্দেশ অনুযায়ী এক ব্রাহ্মণ মুসলমানদের প্রণালী অনুযায়ী রান্না করতেন। রামকৃষ্ণ ওই খাবারই খেতেন। হিন্দু দেবদেবীদের প্রণাম তো দূরে থাকুক, দর্শন পর্যন্ত করতেন না। কালীবাড়ির ভিতরেও যেতেন না তখন। থাকতেন বাইরে মথুরের কুঠিতে। দীপিকা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ভবতারিণী মন্দিরের মূল ফটকের পাশে ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস রোডের মসজিদে গিয়ে রামকৃষ্ণ নামাজ পড়তেন।
তিনদিন কঠোর সাধনা করার পর দীর্ঘশ্মশ্রুবিশিষ্ট, সুগম্ভীর, জ্যোতির্ময় পুরুষপ্রবরের দিব্যদর্শন লাভ করেছিলেন তিনি। ভক্তরা বলেন, এই পুরুষই হজরত মহম্মদ। তারপর রামকৃষ্ণের সগুণ বিরাট ব্রহ্মের উপলব্ধি হয় এবং তুরীয় নির্গুণ ব্রহ্মে তাঁর মন লীন হয়ে যায়। অদ্বৈত বেদান্তের সাধনা করে তাঁর যে অনুভূতি ঘটেছিল, একই উপলব্ধি হল সুফি সাধনায়। তিনি ইসলাম সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেন। যে কোনো ধর্মমত অনুসরণ করে ঈশ্বরের কাছে যাওয়া যাক না কেন, শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় পৌঁছতে হয় – রামকৃষ্ণ হাতেকলমে তারই প্রয়োগ করে দেখালেন।
আজ যখন স্বার্থান্বেষী নরপশুরা চারদিকে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তখন রামকৃষ্ণ পরমহংসের এই সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শই হোক আমাদের পাথেয়।
তথ্যসূত্র-
১) শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ, স্বামী সারদানন্দ।
২) শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পুঁথি, অক্ষয়কুমার সেন।
৩) দক্ষিণেশ্বরের চরম অবহেলিত সেই মসজিদ এবং শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের ইসলাম সাধনার দেড়শো বছর, দীপিকা ভট্টাচার্য, দৈনিক পুবের কলম।

