ইসলাম, বৈষ্ণব ও রবীন্দ্রনাথ

সুফিবাদ আর বৈষ্ণবধর্মের মধ্যে একটা নাড়ির সম্পর্ক আছে

ইসলামধর্মের সঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের বহু মিল আছে। জগতের সকল ধর্মের সঙ্গে অন্যান্য সকল ধর্মের মূলে মৌলিক মিল আছে। তবে বিরোধ দেখাটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক এই অনুসন্ধানই করেছিলেন –

'দারা শিকোহ তুমি ইতিহাসে উপেক্ষিত
মরমি মনের মর্মস্থলে চির প্রতিষ্ঠিত
তোমার পুণ্যনাম।'
অথবা,
'রামমোহন তোমার নামের স্বর্ণ পরশে
আবার জাগ্রত হোক ঐ জাতির শুভ্র আত্মা'

বৈষ্ণবের সঙ্গে ইসলামের প্রকৃতিগত মিল তো আছেই, উপরন্তু প্রবৃত্তিগত মিল আছে। এর কারণ সম্পর্কে শ্রীযুক্ত প্রমথ চৌধুরী বলেন – 'ভারতবর্ষের মধ্যযুগের এই নববৈষ্ণব ধর্ম অর্থাৎ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম  সনাতন হিন্দুধর্মের একটি নব শাখা মাত্র, তবে এই নবত্বের কারণ মুসলমান ধর্মের প্রভাব।’

সুফিবাদের সঙ্গে বৈষ্ণবদের আভ্যন্তরীণ মিল তো আছেই, বাহ্যিক মিলও আছে বহু। যেমন বৈষ্ণবদের বৈরাগ্য সুফি বৈরাগ্যে কোনো পার্থক্য রাখে না। বৈষ্ণবদের কর্ম ও জ্ঞানযোগ ব্যতীত যে ভক্তিযোগ, তা বিতর্কহীনভাবে একে বিলীনতা। আপন অস্তিত্বের অস্বীকার, ইহা সুফিগণের মধ্যেও লক্ষণীয়। আবার বৈষ্ণবরা সাধনার জন্য যে নারীভাবকেই সমধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, সুফিরাও মিলনের অনুকূল চিন্তা করায় সাধনার পথে নারীত্বকেই বেশি গ্রহণযোগ্য করেছেন। এর থেকে আমরা বুঝতে পারছি, সুফিবাদ আর বৈষ্ণবধর্মের মধ্যে একটা নাড়ির সম্পর্ক আছে। সেটাকে মিলনের সম্পর্কে বলি আর মিশ্রণের সম্পর্কে বলি। একটি নিশ্চিত সম্পর্ক। এই বৈষ্ণবদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কী বা কতটা?

যদি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই সম্পর্ক সহজাত হয় তাহলে বৈষ্ণবধর্মী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইসলামের একটা সম্পর্ক থাকতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব উক্তি – 'বৈষ্ণব সাহিত্য এবং উপনিষদ বিমিশ্রিত হইয়া আমার মনের হাওয়া তৈরি করিয়াছে। নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন যেমন মিশে তেমনি করিয়া তাহারা মিশিয়াছে, আমার রচনায়সীমা ও অসীমের দ্বন্দ্ব নাই, মিল আছে, তাহার কারণটি কেবলমাত্র আমার ব্যক্তিগত প্রকৃতিতে নাই, আমার চারিদিকে, ব্যাপ্ত হইয়াছে সাম্প্রদায়িক বুদ্ধির বেড়ার ভেতর দিয়া ইহা বুঝা যায় না। আমার পিতার হৃদয়ে হাফিজ ও উপনিষদের এই সঙ্গম ঘটিয়াছিল। সৃষ্টি পক্ষের এইরূপ দুই বিষয়ের মিলনের প্রয়োজন আছে। সৃষ্টিকর্তার চিত্তের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই আছেন। নইলে একভাবে সৃষ্টি হইতেই পারে না।

ছেলেবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথের একটা বাতিক ছিল, প্রাচীন কবিদের কাব্য সংগ্রহ করা ও তা পড়া । তিনি বলেছেন, 'গাছের বীজের মধ্যে যে অঙ্কুর প্রচ্ছন্ন ও মাটির নীচে যে রহস্য অনাবিষ্কৃত, তাহার প্রতি যেমন একটি একান্ত কৌতূহল বোধ করতাম, প্রাচীন পদকর্তাদের রচনা সম্বন্ধে আমার ঠিক সেই ভাবটা ছিল।

'আমার খুবই সৌভাগ্য যে, আমার অল্প বয়সে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কবিদের রচিত প্রাচীন গীতি-কবিতার একটি সংগ্রহ আমার হাতে পড়ে। বাহির হইতে যেগুলো প্রেমের কবিতা বলে মনে হয়,তার ভেতরে যে একটি গভীর ভাব লুকিয়ে আছে, তা আমি জানতে পারলাম। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম যে, এই কবি সেই পরম প্রেমিকের কথা বলছেন, যাঁর স্পর্শ আমরা অনুভব করি আমাদের সকল প্রেমের সম্বন্ধের মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি প্রেম, পশুর প্রতি, শিশুর প্রতি, দয়িতের প্রেমের ভেতর দিয়ে যে প্রেম আমাদের বাস্তবের চেতনাকে আলোকিত করে। তাঁরা এমন এক প্রেমের কথা গেয়েছেন যে প্রেম অসংখ্য বাধাকে অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়েছে মানুষ ও মানুষের স্বর্গীয় সত্তার ভেতরে।”

বঙ্গের ক্ষণজন্মা পুরুষ শ্রী শ্রী চৈতন্যদেব সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ধ্যান ও ধারণা – "আমাদের বাঙালির মধ্য হইতেই তো চৈতন্য জন্মেছিলেন, তিনি তো বিঘা কাঠার মধ্যেই বাস করতেন না, তিনি তো সমস্ত মানবকে আপনার করিয়াছিলেন, তিনি বিস্তৃত মানবপ্রেমে বঙ্গভূমিকে জ্যোর্তিময়ী করিয়া তুলিয়াছিলেন। তখন তো বাংলা পৃথিবীর একপ্রান্তে ছিল, তখন তো সাম্য ভ্রাতৃভাব প্রভৃতি কথাগুলির সৃষ্টি হয় নাই।"

কীভাবে চৈতন্যদেব পথে নামার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে প্রেমের জোয়ার এসে গেল, এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – “চৈতন্য যখন পথে বাহির হইলেন তখন বাংলাদেশে গানের সুর পর্যন্ত ফিরিয়া গেল।তখন এক কন্ঠ বিহারী বৈঠক সুরগুলো কোথায় ভাসিয়া গেল। তখন সহস্র হৃদয়ের তরঙ্গ-হিল্লোলে সহস্র কণ্ঠউচ্ছ্বসিত করিয়া নূতন সুরে আকাশে ব্যাপ্ত হইতে লাগিল। তখন রাগরাগিনী ঘর ছাড়িয়া পথে বাহির হইল, একজনকে ছাড়িয়া সহস্রজনকে বরণ করিল। বিশ্বকে পাগল করিবার জন্য কীর্তন বলিয়া এক নূতন কীর্তন উঠিল। যেমন ভাব তেমনি তাঁর কন্ঠস্বর-অশ্রুজলে ভাসাইয়া সমস্ত। একাকার করিবার জন্য ক্রন্দনধ্বনি।”

বৈষ্ণবধর্মের প্রেম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “বৈষ্ণবধর্মের শক্তি বলরূপিনী নহে, সে শক্তি প্রেমরূপিনী। তাহাতে ভগবানের সহিত জগতের যে দ্বৈত বিভাগ স্বীকার করে, তাহা প্রেম বিভাগ, আনন্দের বিভাগ। তিনি বল ও ঐশ্বর্যের বিস্তার করিবার জন্য শক্তি প্রয়োগ করেন নাই। তাঁহার শক্তি সৃষ্টির মধ্যে নিজেতে নিজে আনন্দিত হইতেছে, এই বিভাগের মধ্যে তাঁহার আনন্দ নিয়ত মিলনরূপে প্রতিষ্ঠিত।” এই আল্লাহ বা ঈশ্বর সাধনায় ইসলামের যে ব্যাখ্যা ও রবীন্দ্রনাথের যে অভিমত। দুটোই বৈরাগ্য বিরোধী এবং সংসারধর্মী। 

বৈষ্ণবের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আরো একটা মিল আছে। সেখানে শুধু মানুষই ভগবানকে চাইছে না, ভগবানও মানুষকে চাইছেন। এ প্রসঙ্গে ইসলামের ব্যাখ্যা তাই।

আল্লাহ বলছেন, “যখন আমার সেবকবৃন্দ আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে আমি তো নিকটেই থাকি। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই, সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক।" রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “প্রাণের নীরব রবে ডাকে যে নিদান তার ডাকে সাড়া দিই নাহি মোর কান।"

বৈষ্ণব ভাব রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কতখানি ভাবের আসন পেয়েছিল, এটি তার একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

Developed by DXDasia