
উদ্যোগে সম্পর্ক পাবলিশিং হাউস
১৯৪০ সাল, জুন মাস। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। ইউরোপের একের পর এক দেশ নাৎসি বাহিনীর দখলে চলে যাচ্ছে। প্যারি রেডিও স্টেশন থেকে সম্প্রচারিত হল প্রখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে জিদের অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর, দ্য পোস্ট অফিস’। তার পরদিন, ১৪ জুন ভোর ৫টায় হিটলারের নৃশংস নাৎসি বাহিনী দখল নিল প্যারিসের।
২০২৬ সাল, মে মাসের ৭ তারিখ, ইংরেজি মতে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের সন্ধ্যায় পার্ক স্ট্রিটের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্যু বেঙ্গল-এ সম্পর্ক পাবলিশিং হাউস-এর উদ্যোগে প্রকাশিত হল ডাকঘর নাটকের ফরাসি অনুবাদ, সঙ্গে আরও এক জোড়া বই। অমলের কাহিনির অনুবাদ করেছেন ফরাসি সাহিত্যিক ও গবেষক ফাবিয়াঁ শার্তিয়ে। তাঁকে এ কাজে সাহায্য করেছে বিশ্বভারতীর ভাষা ভবন।
ফাবিয়াঁ ত্রিশ বছর যাবৎ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা করছেন। রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন নিবিড়ভাবে, আজও তাঁর রবীন্দ্রনাথ পাঠ জারি রয়েছে। তাঁর পিএইচডি-র বিষয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত হয়েছে তিনটি বই। বাংলা ভাষায় ডাকঘর-এর প্রথম চিত্রায়িত সংস্করণ, ফাবিয়াঁ শার্তিয়ে অনুদিত ডাকঘরের ফরাসি অনুবাদ নাম অমল এবং ‘অমল, দ্য রিসেপশন অফ রবীন্দ্রনাথ টেগরস প্লে ইন ফ্রান্স’। তৃতীয় বইটির লেখকও ফাবিয়াঁ। ফরাসিভূমে কীভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছে অমল, সেই সফরকে এ বইতে ধরেছেন ফাবিয়াঁ। সম্পর্ক প্রকাশনার তরফে তিনটি বইয়েরই প্রকাশক সুনন্দন রায়চৌধুরী।

রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে সূচনা হয় বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানের। তারপরই বই তিনটির মোড়ক উন্মোচন হয় একে একে। অনুবাদক, প্রকাশক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কলকাতার ফ্রেঞ্চ কনস্যুলেট জেনারেল থিয়েরি মোরেল, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্যু বেঙ্গল-এর ডিরেক্টর মার্ক বওডিন। সদ্য প্রকাশিত বই থেকে নির্বাচিত অংশ পাঠ করা হয়। বই নিয়ে আলোচনা করেন লেখক-অনুবাদক এবং প্রকাশক।
প্রকাশক সুনন্দন রায়চৌধুরী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, ‘‘আমরা সম্পর্ক প্রকাশনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকমের বই ছাপছি, যেখানে অনুবাদ একটা বড়ো অংশ। আমরা আস্তে আস্তে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বই ছাপছি। প্রথমে রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর ছেপেছিলাম আমরা। তারপর ‘মুখের কথা লেখার ভাষায়’ বের করেছি, রবীন্দ্রনাথ যত বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেগুলো প্রবন্ধ আকারে পরে ছাপা হয়। তারই সংকলন। ধারাবাহিকভাবে আমরা রবীন্দ্রনাথের চর্চা করতে চাইছি। ডাকঘর নাটকটা তো আমরা সকলেই জানি, অমল আর দইওয়ালা। পুজো মণ্ডপের পাশে অভিনীত হয়েছে, বাচ্চারা স্কুলে অভিনয় করেছে। এটার কোনও চিত্রায়িত সংস্করণ আগে হয়নি। একজন গুণী শিল্পী, সুব্রত ঘোষ এটার ছবি এঁকেছেন। বাংলায় চিত্রায়িত ডাকঘর প্রকাশ পেল। সেটার ফরাসি সংস্করণ ‘ইলুস্ত্রে অমল’ প্রকাশিত হল। আর একটা বই যেটা বেরোলো, ডাকঘর নাটকটি বহুকাল আগে ফরাসি দেশে অঁদ্রে জিদ অনুবাদ করেছিলেন, তখন নাম ছিল ‘আমল এ লেত্রে দে রুয়াঁ’। মানে অমল ও রাজার চিঠি। সেটা বহু ফরাসি হাসপাতালে অভিনীত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘রিসেপশন অফ অমল ইন ফ্রান্স’ প্রকাশিত হল, সেটাও অনুবাদকেরই লেখা। তিনটি বই প্রকাশিত হল।’’
তাঁর কথায়, “নাটকটার মধ্যে আলাদা রকমের আবেদন রয়েছে। একটা ছেলে যে অসুস্থ, সে কী করে স্বপ্ন দেখছে মুক্ত বিহঙ্গ হওয়ার। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আর যা যা কাজ করেছি, সবই বাংলায়। এটাই প্রথম ফরাসি ভাষায় কাজ। এটার একটা ইংরেজি সংস্করণও বের করবো। ইচ্ছা আছে, হিন্দি এবং ভারতের অন্যান্য ভাষাতেও বের করবো। ডাকঘরের একটা সুবিধা আছে প্রকাশনা এবং অনুবাদের দিক থেকে। এটা কলেবরে ছোটো একটা লেখা। আমি নিজেই এটার ইংরেজি অনুবাদ করছি।”
অনুবাদ করার জন্য ডাকঘর-কে বেছে নেওয়ার কারণ হিসাবে ফাবিয়াঁ শার্তিয়ে জানালেন, ‘‘এটা (ডাকঘর) পশ্চিমি দুনিয়ায় খুবই জনপ্রিয় একটি নাটক। ডাকঘর বার বার মঞ্চস্থ করা যায়। বার বার পড়া যায়। আমার মূল উদ্দেশ্য কেবল অনুবাদ নয়, বরং ফ্রান্স ও ভারতে ফরাসি ভাষায় নাটকটা মঞ্চস্থ করার তাগিদ অনেকটাই বেশি।’’

বাংলা ভাষায় মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই ‘ডাকঘর’ ইংরাজি ভাষায় অভিনীত হয়েছিল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেবব্রত মুখোপাধ্যায় ইংরেজি ভাষায় নাটকটির অনুবাদ করেন। যার মুখবন্ধ লেখেন বিখ্যাত কবি ইয়েটস্। ডাবলিনের বিখ্যাত অ্যাবি থিয়েটারে ১৯১৩ সালের ১৭ মে-তে তা মঞ্চস্থ হয়।
ফাবিয়াঁ বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, তাঁর ডাকঘর অনুবাদের সফর অত্যন্ত ভালো, সুখকর। তিনি বলেন, “আমি শান্তিনিকেতনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। পড়ুয়ারা খুব আন্তরিকভাবে আমাকে স্বাগত জানিয়েছে। এক কথায়, অনুবাদের অভিজ্ঞতা খুব আবেগঘন এবং খুবই ‘প্রফেশনাল’। অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক।” উল্লেখ্য, ফাবিয়াঁ ত্রিশ বছর যাবৎ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণা করছেন। রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন নিবিড়ভাবে, আজও তাঁর রবীন্দ্রনাথ পাঠ জারি রয়েছে। তাঁর পিএইচডি-র বিষয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া ডাকঘর নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির শৈশব। অমল আর দইওয়ালার কাহিনি জানেন না, এমন বঙ্গ সন্তান পাওয়া দায়। হয় কেউ নাটকটি পড়েছেন, নয়তো অভিনয় করেছেন, কোনও না কোনও ভাবে ৫৩২ সংলাপের নাটকটির সঙ্গে যেন বাঙালির আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। আবিষ্কারের আগ্রহে মৃত্যুপথযাত্রী অমল অবলীলায় নিশ্চিত ভবিষ্যতকে গ্রহণ করেছে। রাজার চিঠির অপেক্ষায় সে। শারীরিক অবক্ষয় ও অদূর ভবিষ্যতে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্যুর মাঝে মুক্তি খোঁজা এক প্রাণোচ্ছল জীবনের নাম অমল। পৃথিবীর নানা প্রান্ত ছুঁতে চায় সে। বুকে দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন বুনছিল অমল। প্রার্থনা ছিল, তাকে যেন ডাকহরকরা করে দেওয়া হয়। সে বলেছে, ‘ফকির, আমায় তোমার ডাকহরকরা করে দাও, আমি অমনি লণ্ঠন হাতে ঘরে ঘরে তোমার চিঠি বিলি করে বেড়াব…।’
প্রসঙ্গত, শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন ১৯১১ সালে রবি ঠাকুর ‘ডাকঘর’ নাটকটি লেখেন। নাটকটি প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালের ১৬ জানুয়ারি। বাংলা ভাষায় মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই ‘ডাকঘর’ ইংরাজি ভাষায় অভিনীত হয়েছিল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেবব্রত মুখোপাধ্যায় ইংরেজি ভাষায় নাটকটির অনুবাদ করেন। যার মুখবন্ধ লেখেন বিখ্যাত কবি ইয়েটস্। ডাবলিনের বিখ্যাত অ্যাবি থিয়েটারে ১৯১৩ সালের ১৭ মে-তে তা মঞ্চস্থ হয়।
১৯১৭ সালের ১০ অক্টোবরে খোদ রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায় জোড়াসাঁকোয় ‘ডাকঘর’ মঞ্চস্থ হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মঞ্চে নেমেছিলেন অবন ঠাকুর, রথী ঠাকুররাও। তার আগে সে’বছর জুলাইয়ের তিন তারিখ সমাজপাড়া বাল্যসমাজের আয়োজনে মেরী কারপেন্টার হলে মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটকটি। ১৯১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটকের পরবর্তী অভিনয় দেখতে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন মধ্যগগনে, নাৎসি বাহিনীর দখলে পোল্যান্ড। ইহুদি ডাক্তার জানুস করজ্যাকের উদ্যোগে রাজধানী ওয়ারশ-র বন্দি শিবিরে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। নাটকের নাম ছিল ‘পোচতা’। পোলিশ ভাষায় যার অর্থ ‘ডাকঘর’। অভিনয় করল অনাথ আশ্রমের শিশুরা। দিনটা ১৯৪২-র ১৮ জুলাই। ‘ডাকঘর’ মঞ্চস্থ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাডল্ফ হিটলারের পরোয়ানা চলে আসে বন্দি শিবিরে। ওই বছর আগস্টে ‘গ্যাস চেম্বার’-এ দমবন্ধ করে মারা হয় তাদের, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তাদের মুখে ভয়ের ছাপ ছিল না। হয়তো অমল ও দইওয়ালার গল্পই তাদের নির্ভীক হওয়ার পাঠ দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে ‘ডাকঘর’ বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ-সহ একাধিক ভাষায় নাটকটির অনুবাদ হয়। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে মঞ্চস্থও হয়। জার্মানিতে জার্মান ভাষায় অভিনীত ‘ডাকঘর’ দেখেন রবি ঠাকুর।
‘ডাকঘর’ জীবনের গল্প। যা জন্ম দেয় মৃত্যুঞ্জয়ীদের। রাজনীতি নেই, বিদ্রোহ নেই, যুদ্ধ নেই, মৃত্যু নেই, মৃত্যু ভয় নেই, আছে স্বপ্ন, আছে শান্তি, আছে মুক্তমন, আছে বিশ্বব্যাপী প্রভাব। ২০২৬ সালের পৃথিবীতে এগুলোর ভারী অভাব! হয়তো সে অপ্রতুলতা খানিকটা হলেও মিটিয়ে দেবে ফাবিয়াঁর অনুবাদ। আবার নতুন করে লক্ষ লক্ষ অমলদের মনের শান্তি, প্রাণের আরাম হয়ে উঠবে অমলের কাহিনি। স্বপ্ন বুনতে শেখাবে।
