রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে টেলিগ্রামের ইতিহাস

নোবেল পাওয়ার খবরটা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে যে আবেগের ঝড় উঠেছে তা হতাশাজনক

টেলিগ্রাম, দোয়াত-কালি, গ্রামোফোন –হারিয়ে গিয়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দশক আগে পর্যন্ত এই তিনটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকাটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না, তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক ছিল বেশ ‘গভীর’। কীভাবে? বেশিরভাগ সময়েই রবীন্দ্রনাথ যোগাযোগ-মাধ্যম হিসেবে পছন্দ করতেন টেলিগ্রাম। একটা মুহূর্তের প্রতিবিম্বই বুঝিয়ে দিতে পারে ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে লেখা হয়েছিল কতশত টেলিগ্রাম। স্মৃতি অনুসরণ করলে আমরা আবার ফিরে যেতে পারি সেইসব ইতিহাস – অনুভূতির কাছে:

FATHER SERIOUS STOP COME SHARP STOP
JOB OFFERED STOP JOIN IMMEDIATELY STOP
WIFE DELIVERED MALE ISSUE STOP MOTHER- CHILD FINE STOP

 
১৯৩১-এর গ্রীষ্মে, রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে টেলিগ্রাম করেন তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথকেঃ
‘বৌমা এখন ভালই আছে। তবে এখনই তাকে অন্যত্র পাঠানো ঠিক হবে না। অন্তত ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাকে এখানেই থাকতে হবে। পরিকল্পনা বদলাতে হলে অনঙ্গকে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ো যাতে সে সময়মতো কলকাতায় পৌঁছে যেতে পারে।’

পরে আবার: 

‘রথী – অ্যান্ড্রুজের টেলিগ্রাম থেকে জানতে পারলাম যে নীতুর অবস্থার অবনতি হয়েছে। …অমিয় জানিয়েছে যে সে আসছে – সেটাই আমাকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।’
 
রবিজীবনীর ষষ্ঠ খণ্ড থেকে জানা যায় যে, সুইডিশ একাডেমি কবির ঠিকানা সম্পর্কে অবগত ছিল না। সম্ভবত সেকারণেই তারা ১৪ নভেম্বর লন্ডন থেকে ম্যাকমিলানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন।

RABINDRANATH TAGORE 6DN TAGORE LANE JORASANKO CALCUTTA SWEDISH ACADEMY AWARDED YOU NOBEL PRIZE IN LITERATURE.
PLEASE WIRE ACCEPTATION SWEDISH MINISTER CALCUTTA/ 15 NO 13/ GPO.

খবরটা পাওয়ার পর ১৬ নভেম্বর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গুরুদেবকে টেলিগ্রাম করে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।

FOLLOWING CABLE RECEIVED MIDNIGHT STOP
SWEDISH ACADEMY AWARDS YOU NOBEL PRIZE IN LITERATURE STOP
PLEASE WIRE ACCEPTATION STOP
SWEDISH MINISTER STOP NAGEN

খবরটা ছড়িয়ে পড়লে অগণিত অনুগামী এবং বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে টেলিগ্রাম আসতে থাকে কবির কাছে, তার মধ্যে প্রথম টেলিগ্রাম ছিলঃ
 
HANDED IN AT CALCUTTA 14 AT 16:10 RECD HERE AT 16:43 STOP RABINDRANATH TAGORE STOP SANTINIKETAN STOP BOLPUR STOP NOBEL PRIZE CONFERRED IN YOU STOP OUR CONGRATULATIONS STOP MANILAL SATYENDRA CHARU. 

এখানে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা থেকে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কারের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন, যেটা ৪টে ১০-এ বোলপুর পোস্টঅফিসে পোঁছেছিলো। অন্যদিকে, রথেনস্টেইন-এর অভিনন্দনমূলক টেলিগ্রামের উত্তরে ১৮ নভেম্বর কবি লিখেছিলেনঃ
 
‘আমাকে নোবেল পুরস্কারের মতো সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, খবরটা পাওয়া মাত্রই তোমার প্রতি ভালোবাসায় আর কৃতজ্ঞতায় আমার হৃদয় ভরে উঠেছিল। আমি নিশ্চিত যে, আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব কেউই এই খবরে তোমার চেয়ে বেশি খুশি হবে না।  তবে, সব মিলিয়ে, এটা আমার জন্য একটা দুর্দান্ত পরীক্ষা। নোবেল পাওয়ার খবরটা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে যে আবেগের ঝড় উঠেছে তা হতাশাজনক। এটা অনেকটা কুকুরের লেজে টিনের বাক্স বেঁধে ভিড়ের মধ্যে তার স্বতঃস্ফূর্ত চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করার মতো। আমি গত কয়েকদিন ধরে টেলিগ্রাম আর চিঠির মাধ্যমে বিষয়টা নিরাময়ের চেষ্টা করছি এবং লক্ষ্য করছি যারা আমার লেখা কখনও এক লাইন পড়েনি আনন্দ জাহির করতে, তারাই সবচেয়ে বেশি সরব।'
 
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

Developed by DXDasia