
পরমাণু নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু
বিজ্ঞানীরা বলেন, আলো দু'রকমের বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলে – কণা আর তরঙ্গ। আলোর কণাকে বলা হয় ফোটন। যা বোসন নামের মৌলিক কণিকার একটা ধরন। বোসনের নামকরণ হয়েছে কিংবদন্তি বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। গত দশকে হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণা আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা। পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে তা এক যুগান্ত। একালের 'ঈশ্বর কণা' মতবাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিজ্ঞানচিন্তার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
'বিশ্বপরিচয়'-তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "আকাশে আলোর এই চলাচলের খবর বেয়ে বিজ্ঞানে একটা প্রশ্ন উঠল, তার চলার ভঙ্গিটা কী রকম। সেও এক আশ্চর্য কথা। উত্তর পাওয়া গেছে তার চলা অতি সূক্ষ্ম ঢেউয়ের মতো। কীসের ঢেউ সে কথা ভেবে পাওয়া যায় না; কেবল আলোর ব্যবহার থেকে এটা মোটামুটি জানা গেছে ওটা ঢেউ বটে। কিন্তু মানুষের মনকে হয়রান করবার জন্যে সঙ্গে সঙ্গেই একটা জুড়িখবর তার সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে হাজির হল, জানিয়ে দিলে আলো অসংখ্য জ্যোতিষ্কণা নিয়ে; অতি খুদে ছিটেগুলির মতো ক্রমাগত তার বর্ষণ। এই দুটো উলটো খবরের মিলন হল কোন্খানে তা ভেবে পাওয়া যায় না। এর চেয়েও আশ্চর্য একটা পরস্পর উলটো কথা আছে, সে হচ্ছে এই যে বাইরে যেটা ঘটছে সেটা একটা-কিছু ঢেউ আর বর্ষণ, আর ভিতরে আমরা যা পাচ্ছি তা, না এটা, না ওটা, তাকে আমরা বলি আলো; এর মানে কী, কোনো পণ্ডিত তা বলতে পারলেন না।"
ইলেকট্রন আর প্রোটন আবিষ্কার হলে পরমাণু জগতের নতুন দরজা খুলে যায় মানুষের সামনে। বিজ্ঞানী পল ডিরাক বলেছিলেন ধনাত্মক ইলেকট্রনের কথা। অবশেষে তা খুঁজে পাওয়া গেল। নাম রাখা হল পজিট্রন। যা কিনা ইলেকট্রনের প্রতিকণা। ভর ইলেকট্রনেরই সমান। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালের বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। অবশ্য একালের জেনেভা শহরে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের পরীক্ষানিরীক্ষা তিনি দেখে যেতে পারেননি।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞানের আঙিনায় রবীন্দ্রনাথ
পরমাণু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন –
"এইবার হাইড্রজেন গ্যাসের পরমাণু মহলে দৃষ্টি দেওয়া যাক।
এর চেয়ে হালকা গ্যাস আর নেই। এর পরমাণুর কেন্দ্রে বিরাজ করছে একটিমাত্র বৈদ্যুতকণা যাকে বলে প্রোটন, আর তার টানে বাঁধা পড়ে চার দিকে ঘুরছে অন্য একটিমাত্র কণিকা যার নাম ইলেকট্রন। প্রোটন-কণায় যে বৈদ্যুতের প্রভাব সে পজিটিভধর্মী, আর ইলেকট্রন-কণা যে বৈদ্যুতের বাহন সে নেগেটিভধর্মী। নেগেটিভ ইলেকট্রন চটুল চঞ্চল, পজিটিভ প্রোটন রাশভারী। ইলেকট্রনের ওজনটা গণ্যের মধ্যেই নয়, পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভার কেন্দ্রবস্তুতে হয়েছে জমা।
মোটের উপরে সব ইলেকট্রনই না-ধর্মী বটে, কিন্তু এমন একজাতের ইলেকট্রন ধরা পড়েছে যারা হাঁ-ধর্মী, অথচ ওজনে ইলেকট্রনেরই সমান। এদের নাম দেওয়া হয়েছে পজিট্রন।"
রবীন্দ্রনাথের উদয়ন
পরমাণু জগৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সময়ে বিশ্ব জুড়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে যে চর্চা চলছিল, সেগুলিরই সফল পরিণতি জেনেভা শহরে CERN-এর গবেষণা। পদার্থবিদরা বুঝতে চাইছিলেন, প্রোটন আর অ্যান্টিপ্রোটনের খুব জোরে সংঘর্ষ ঘটালে কী পরিণতি ঘটতে পারে। কোয়ার্কদের একসঙ্গে জুড়ে রাখে কে? অন্যান্য কণার জন্য ভর তৈরি করে এক ধরনের বোসন। তাকেই বলা হল হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণা।
রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে বলা যায়, কোয়ার্ক অনেকটা রামায়ণের দুই ভাই লব এবং কুশের মতো। যদিও কোয়ার্কদের রঙে চেনা যায়, লব আর কুশ দেখতে কিন্তু একই রকম। এদের কীভাব আলাদা করা সম্ভব? তার জন্য ঋষি বাল্মীকি লবকে দান করলেন কানের দুল। লবের ভর গেল বেড়ে। এবার দু'জনকে সহজেই আলাদা করা যায়। উইঢিবিতে লুকিয়ে থাকা বাল্মীকির মতোই হিগস বোসন কণা। যার সন্ধান মিলল লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের মাধ্যমে।
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)

