
দলবদলের একটা মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছে
এ রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দলবদলের একটা মাতাল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন যত এগিয়ে আসছে, হিড়িকটা ততই থিতিয়ে আসছে। সেই প্রবণতা প্রধানত তৃণমূল থেকে বিজেপি দলে যোগ দেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আসলে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি আচমকা আঠারোটি আসন জিতে যাবার পর ওই দলটিকে ঘিরে একটা রাজনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হতে থাকে। শুধু তাই নয়, তার ফলে ক্ষমতায়নের একপ্রকার দড় কষাকষিও শুরু হয়। বিজেপি এখন সেই তাসই খেলছে। রাজ্যভিত্তিক দলীয় নেতৃত্ব গড়ে না তুলে তারা এখন অন্য দলের ধার করা লোকজন নিয়ে ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছে। নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারার দ্বিতীয় উদাহরণ হল ভোটে দাঁড়াতে ইচ্ছুক লোকজনের আবেদন আহ্বান করা। তবে এই কাজ করতে গিয়ে যাদের তারা দোসর করেছে, তাদের কলঙ্কের ইতিহাস খুব ছোটো নয়।
প্রথমেই ধরা যাক, মুকুল রায়ের কথা। অতুল্য ঘোষের পর একমাত্র তাঁর নামের সঙ্গেই মিডিয়া "বঙ্গেশ্বর" বিশেষণটি জুড়তে শুরু করে। যখন তিনি ছিলেন তৃণমূল দলের দু-নম্বর নেতা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারদা কাণ্ডের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে সিবিআই যখন খাতা খুলল, তখনই তিনি নৌকো বদল করলেন।
পরবর্তী দৃষ্টান্তগুলিও একই পথে হাঁটছে। শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারে একজন মন্ত্রী, একজন বিধায়ক এবং দুইজন সাংসদ আছেন। প্রাপ্তির অঙ্কে সেটা এই বাংলায় একটা রেকর্ড। কিন্তু তারপরেও তিনি অসন্তুষ্ট। সেটা না হয় মেনে নেওয়া গেল। তবে তার জন্য তিনি মমতার মতোই একটা নতুন দল খুলে আসরে নামতে পারতেন, যেটা ষাটের দশকে তাঁর জেলার আরেক নেতা অজয় মুখার্জি করেছিলেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বিজেপির তৈরি মাচা বেশি পছন্দ করলেন।
এখন দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নাম না থাকার জন্য অনেক নেতা-নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁরাই যখন দেখছেন, বিজেপির তালিকাতেও তাঁদের নাম নেই বা পছন্দমতো কেন্দ্র তাঁরা পাননি, তখনই তাঁরা আবার বিজেপি ছাড়তে শুরু করেছেন। সেই তালিকায় এখন শোভন-বৈশাখীর নামও শোভা পাচ্ছে। তাঁদের অনেকে আবার বিজেপি দলীয় দপ্তরে গিয়ে নেতাদের উপরেই ইঁটবৃষ্টি করছেন। এখন বোধহয় বিজেপির প্রার্থীপদ প্রত্যাশীর সংখ্যা ভোটদাতার চেয়েও বেশি। হয়তো সেই কারণেই অনুগামীরা এখন মোদি-অমিতের সভা ভরানোর ফুরসতও পাচ্ছেন না। আর যাই হোক, এইসব দৃষ্টান্ত কোনো মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য চিহ্নিত করে না।
এই বেলা একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার যে, আমাদের দেশে একটি পাকাপোক্ত দলত্যাগ বিরোধী আইন আছে। ১৯৮৫ সালে সেই আইন সংবিধানের দশম তপশিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই আইনটি কেবলমাত্র নির্বাচিত সাংসদ এবং বিধায়কদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাঁরা সংসদের উভয় সভায় বা বিধানসভায় দলীয় নির্দেশের বিরোধিতা করলে পদচ্যুত হবেন।
আইনটি পাশ হবার পর ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে৷ কিন্তু সংসদীয় বা পরিষদীয় রাজনীতিতে দলবদল বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি পদুচেরিতে বিজেপির ইন্ধনে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করে কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটিয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে বিগত বিধানসভায় বিরোধী পক্ষের বিধায়করা দলবদল করে মন্ত্রীও বনে গেছেন। কারণ অধ্যক্ষ তাঁদের দলত্যাগ বিরোধী সাজা দেননি। অর্থাৎ এই আইনে এমন ধারা রয়েছে যাতে চূড়ান্ত সাজা দেবার ক্ষমতা শাসকদলের দ্বারা মনোনীত অধ্যক্ষের হাতেই থাকে।
সম্প্রতি কর্ণাটক এবং মধ্যপ্রদেশে দলবদলু বিধায়করা নির্বাচনে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি উত্তর পূর্বাঞ্চলের একের পর এক রাজ্যে দলবদলের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের শাসন কায়েম করেছে।
তার ফলে দেখা যাচ্ছে, দেশে আইন থাকলেও দলবদল বন্ধ হবার নয়। যাঁরা দলত্যাগী তাঁদের চূড়ান্ত সাজা দিতে পারেন ভোটদাতারা। কিন্তু সেখানেও প্রভাবশালী দলে যোগ দিলে তাঁদের হারানো সহজ নয়। আর ভোটে জিতে ফিরলে তাঁদের তো সাত খুন মাফ।
তবে তার পাল্টা দৃষ্টান্ত এই বাংলাতেই আছে। বিধান রায়ের মন্ত্রী সভার অন্যতম সদস্য ছিলেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়। মতান্তরের কারণে তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে একইসঙ্গে বিধায়ক পদ এবং কংগ্রেস দল ছাড়েন। নতুন করে নির্দল প্রার্থী হিসেবে একই কেন্দ্রে ভোটে দাঁড়িয়ে আবার জিতেও আসেন। নীতিহীন দলত্যাগ আর নীতিনিষ্ঠ প্রতিবাদ যে এক কথা নয়, তা সিদ্ধার্থ রায় দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু যে দলত্যাগকে সংবিধান আটকাতে পারে না, জনাদেশ রুখে দিতে পারে না, তাকেই বাধা দিতে পারে সামাজিক বয়কটের আন্দোলন। সেই দৃষ্টান্তও পশ্চিমবঙ্গেই আছে। ১৯৬৭ সালে রাজ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। নয় মাসের মাথায় প্রফুল্ল ঘোষের নেতৃত্বে ১৭ জন বিধায়ক দলত্যাগ করে কংগ্রেসের সমর্থনে নতুন সরকার গঠন করে। রাজ্যপাল ধর্মবীরের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন বিধানসভার তৎকালীন অধ্যক্ষ বিজয় বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে সেই ১৭ জনের বিরুদ্ধে শুরু হয় সামাজিক বিক্ষোভ এবং জনরোষ। মাসখানেকের মাথায় প্রফুল্ল ঘোষের সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়।
