‘পাগল’ শব্দটা ব্যবহার করবেন না প্লিজ— লাইভ অনুষ্ঠানে অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ

অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাচনভঙ্গি, বক্তব্য পেশ, নিয়ন্ত্রণ, মেধা ছিল চমৎকার

তখন নব্বইয়ের দশক। বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন ছিল না এত। থাকলেও সাদা-কালো আবছা। তাতে রং বোঝা যেত না। তারপর সমাজটার ‘আধুনিকীকরণ’ হল। ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশন এল। চ্যানেল বাড়ল। প্রোগ্রাম বাড়ল। তারওপর আধঘণ্টার সীমা ছাড়িয়ে রাতভর নিউজ চ্যানেল এল। ততদিনে গুটি গুটি পায়ে আসতে থেকেছে বিনোদনমূলক চ্যানেল। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার অনর্গল খবর? কনসেপ্ট কাজে লাগানো হল। এবং সাকসেসফুল। এই ‘সাকসেসফুল’ শব্দটি সবার সঙ্গে যায় না। তখন বালক বয়েস। দেখতাম কোট-টাই পরে একজন অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি একা নন। অনেকে। বাংলা সাংবাদিকতার দুনিয়ায় মোড় পাল্টাল। পাল্টাল দেখার চোখও। ওই বালক বয়েসে৷

দেখলাম ভদ্র, স্বল্পমেজাজি, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এক সাংবাদিককে। খবরও নিতে পারে সিরিয়ালের টক্কর৷ খবর তৈরি করা একটা আর্ট। তিনি বোঝাচ্ছেন। আমাদের বালক বয়েসে ডানা গজাচ্ছে। আর কেমন বড়ো হয়ে গিয়েছি ভাব। জানতে পারলাম ভদ্রলোকের নাম অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

তারপর বছর পেরলো। বছর পেরলো। অঞ্জনবাবু এক রয়ে গেলেন। আমরা বড়ো হলাম। টেলিভিশন আরও রঙিন হল। আমরা ততদিনে দেখে নিয়েছি সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম। স্কুলে পালন করেছি রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষ। তারপর আরও বছর পেরলো। ডিমনিটাইজেশনে মধ্যরাতে লাইন দিলাম এটিএমে। লকডাউনে ঘরে থাকলাম। দিনের পর দিন পরিযায়ী শ্রমিকরা হেঁটে গেলেন। দেখলাম, বামশূন্য বিধানসভা। অনেক সাংবাদিকদের ভিড়। প্রচুর কন্টেন্ট। কিন্তু ওই একজন প্রাইম টাইমে তাঁর উপস্থিতি বারবার নজর কাড়লেন। বাংলা বদলায়। আন্দোলনের তালিকা বাড়ে। কিন্তু অঞ্জনবাবুর উপস্থিতি এক থেকে যায়।

খুব সম্প্রতি অঞ্জনবাবু একের পর এক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করে গেছেন। আলোচনার বিষয় চমৎকার। বাঙালি অস্মিতায় টানাটানি। নেতাজি কি ভোট ব্র‍্যান্ডিংয়ের তাস? একুশের ভোটে সোশ্যাল মিডিয়া। কুকথার রাজনীতি। বাংলার মানুষ কি ভিখারি হয়ে থাকবে? বামের মুখে রাম নাম। বাংলা কি জং ধরা? প্রশ্ন ছুঁড়েছেন একের পর এক।

বাংলা ভাষার ছাত্র অঞ্জন জানতেন সঞ্চালকের এক এবং একমাত্র দায়িত্ব ঠিক কী। তাঁর মুখে শোভা পায় বাংলা ভাষার আদর। যথোপযুক্ত শব্দ প্রয়োগ। এ যেন সাংবাদিকতার নয়া ভাষ্য৷ তিনি শিখিয়েছেন। আমাদের মতো বাংলা ভাষার ছাত্রদের। বিখ্যাত জনপ্রতিনিধি যখন আরেক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে তর্ক করেন আর বলেন, “পাগল কোথাকার”। অঞ্জনবাবু প্রতিবাদ করেন। ক্যামেরা বন্ধ হয় না। তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে সেই প্রতিবাদের স্বর৷ তিনি বলেন, “পাগল শব্দটি ব্যবহার করবেন না প্লিজ। মানসিকভাবে যাঁরা অসুস্থ ওদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। পাগল বলে নিজেকে ছোটো করবেন না।”তিনি শিক্ষক। আমরা ছাত্ররা শিখি। শিখি তাঁর অকুতোভয়। বাচনভঙ্গি। বক্তব্য পেশ। নিয়ন্ত্রণ। মেধা। এত গুণ, এত জেদ। হারিয়ে গেল। এত সহজে কি হারিয়ে যায়? স্বচ্ছ সাংবাদিকতার পরিসরগুলো তাহলে যাবে কোথায়? “ডান বাম কোনো পক্ষ নয়, আমরা শুধুমাত্র আপনার পক্ষে” তখন হাওয়ায় কোরাস হয়। আমরা যারা মফসসল থেকে পড়াশোনা আর চাকরির খোঁজে বড়ো শহরে গিয়ে মিলেছি, এই আমাদের ভিতর ভিতর প্রশ্ন জন্মায়। অবাধ প্রশ্ন করার স্বাধীনতা জন্মায়। অঞ্জনবাবু শিখিয়েছিলেন।

ফিরে যাই ছোটোবেলায়। নব্বইয়ের দশক। সাদা-কালো আবছা টেলিভিশনের আলো৷ নতুন শতকে নয়া ভাবনার রসদ নিয়ে যাঁরা হাজির হবেন, তাঁদের তখন প্রস্তুতি পর্ব৷ সেসব দেখে সেই বালক ক্রমশ বড়োর দিকে এগোয়। অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের যাত্রাপথের দূরতম সঙ্গীরা কোরাসে গান গেয়ে ওঠে। অধ্যায় শেষের গান।

(অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় নামটার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই নব্বইয়ের দশকে। তাই এই লেখায় বারবার নব্বইয়ের প্রসঙ্গ।)

 

Developed by DXDasia