সুমনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখলেন সিগার, উপহার দিলেন ‘গুরু’-র থেকে পাওয়া গিটার

কলামন্দিরে এক ঐতিহাসিক সন্ধেয় সিগার ও সুমনের যুগলবন্দির সাক্ষী থেকেছিল কলকাতা

“বাংলা গান গাওয়া যায় একটা? একটা বাংলা গান শিখিয়ে দেবে আমায়? এই যে এত বছর পরে আবার কলকাতায় এলাম, একটা বাংলা গান গাইতে পারলে ভালো হতো।”

গ্র্যান্ড হোটেলে প্রাতঃরাশ সারতে সারতে কবীর সুমনকে বাংলা গান শিখিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন পিট সিগার। ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাস। হেমন্তের চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে মহানগরী তিলোত্তমা। ভারত সরকারের আইসিসিআর সংস্থার উদ্যোগে পিট সিগার এসেছেন কলকাতায়। সুমনের কাছে যখন এহেন অনুরোধ রাখছেন তিনি, সেদিন সন্ধেতেই তাঁর একক সঙ্গীতানুষ্ঠান নজরুল মঞ্চে। আর অনুষ্ঠানের দিন সকালে কিংবদন্তি সিগার বাংলা গান শিখতে চাইছেন সুমনের কাছে!

যে সম্পর্কের জোরে এমন আশ্চর্য অনুরোধ করা যায়, তার সুতো বোনা শুরু হয়েছিল আরো তেরো-চোদ্দ বছর আগে। কর্মসূত্রে সুমন তখন আমেরিকায়। ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগে চাকরি করছেন। সেই সময়ে নোয়াম চমস্কি, জর্জ ওয়াল্ড, মায়া এঞ্জেলু, পল সুইজি, আমিরি বারাকার মতো ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সেই তালিকায় অন্যতম নাম পিট সিগার। সাক্ষাৎকারের গণ্ডি ছাপিয়ে পরিচয় বাঁক নেয় বন্ধুত্বে। সিগারের সূত্র ধরেই সুমন পরিচিত হয়েছিলেন নিকারাগুয়ার ধর্মযাজক, কবি ও মুক্তিসংগ্রামী আর্নেস্টো কার্ডেনালের সঙ্গে। কার্ডেনালের আমন্ত্রণেই এরপর নিকারাগুয়ায় গেছিলেন সুমন। সে অবশ্য অন্য গল্প, অন্য ইতিহাস। 

সিগার আর সুমন– দুটি ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সময়ের মানুষের মধ্যে কথারা ঘন হতে থাকে। মাঝে সেতুবন্ধের কাজ করে গান আর সুর। কথায়-কথায় সিগার জানতে পেরেছিলেন, সুমন ‘গানবাজনা’ করেন, এমনকি নিজে গান বাঁধেনও। একদিন সে-গান শোনাও হল। তারপর সুমনকে বললেন, “গিটার বাজিয়ে গাও।” গিটার তখনো সুমনের প্রেমের রাজধানী হয়ে ওঠেনি। বাজাতেও জানেন না। অতঃপর নির্দেশ, “শিখে নাও।” এবং গিটার শেখার প্রমাণ দিতে পারলেই নাকি মিলবে একটা অবিশ্বাস্য পুরস্কার!

কী সেই পুরস্কার? “সুমন, তুমি যদি প্রমাণ দিতে পার যে, গিটার শিখেছ এবং দর্শকের সামনে গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছ, আমি তোমাকে একটি বিশেষ উপহার দেব। উডি গাথরি অসুস্থ হওয়ার আগে আমাকে তাঁর নিজের ব্যবহার করা একটি বারো তারের গিটার দিয়ে গিয়েছিলেন; সেটা আমি তোমাকে দেব।”

কিংবদন্তি লোকগায়ক উডি গাথরির দুই বিখ্যাত উত্তরসূরির একজন পিট নিজে। অপরজনের নাম বব ডিলান। সিগারকে নাকি সুমন জানিয়েছিলেন, তিনি ডিলানেরও সাক্ষাৎকার নিতে চান। বিরক্ত সিগার বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, “ও (ডিলান) আমাদের সিভিল রাইটস মুভমেন্ট-এর সুবিধা নিয়ে ঢেউয়ের ওপর উঠে পড়েছিল, তারপর যখন দেখেছে বেগতিক, তখন পালিয়ে গেছে।” এককালের সহযোদ্ধা ও বন্ধুর প্রতি অভিমান ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল সেই কথায়। অথচ, গুরু গাথরির প্রতি শ্রদ্ধায় তিনি আজীবন অটল। প্রতিবাদের ভাষা তিনি শিখেছেন গাথরির থেকেই। সেই গানের বা ভাষার কোনো কপিরাইট থাকুক, চাইতেন না সিগার। সুমনকেও বলেছিলেন, “তুমি একদিন দেখবে তোমার গানের কথা এদিক-ওদিক হচ্ছে; এবং তুমি হয়তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছ, বড়োজোর গিটারটা বা তোমার যন্ত্রটা বাজাচ্ছ, তুমি আর গাইছ না, অন্যলোকে গাইছে। এইভাবে ফোক সং-এর জন্ম হয়।”

আর, ‘গুরু’-র উপহার দেওয়া গিটারই তিনি ফের উপহার দিতে চেয়েছিলেন সন্তানপ্রতিম বন্ধু, পাক্কা তিরিশ বছরের ছোটো সেই সুরস্নিগ্ধ ভারতীয়কে। ক’দিনেরই বা সম্পর্ক তখন সিগার আর সুমনের? তার মধ্যেই বোনা হয়ে গেল অনুভূতির এমন স্বরলিপি! সুমন অবশ্য সিগারের কথার খেলাপ করেননি। এরপর নব্বই-এর দশক জুড়ে মঞ্চে নীল ডেনিম শার্ট আর গিটারেই তাঁকে বিভোর হয়ে দেখবে কলকাতাবাসী, গান শুনে বিস্মিত হবে। গিটার যে সত্যিই শিখেছেন, তার প্রমাণ হিসেবে ‘তোমাকে চাই’-এর ক্যাসেট সিগারের কাছে পাঠিয়েছিলেন সুমন। সিগারও কথা রেখেছিলেন। নিউ ইয়র্কের কার্নেগি হলে শেষবার সেই গিটার নিয়েই উডি গাথরির ছেলে আর্লো গাথরির সঙ্গে অনুষ্ঠান করলেন সিগার। তারপর, বারো তারের সেই গিটার পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায়। 

এমন সম্পর্ক যাঁর সঙ্গে, তাঁর কাছেই তো বাংলা গান শেখার অনুরোধ জানানো যায়। সুমন সেদিন তাঁকে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গানটি। একটা বড়ো কাগজে মোটা ফেল্ট পেন দিয়ে গানের প্রথম স্তবক লিখে নিয়েছিলেন সিগার। মহড়া দিয়েছিলেন কয়েকবার। তারপর সেই সন্ধ্যায় বাঙালি শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলেন সিগারের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত। মঞ্চে সুমনকেও ডেকে নিয়েছিলেন সিগার। সেই সন্ধে অবশ্য ছিল আরেকটি ঐতিহাসিক সন্ধের গৌরচন্দ্রিকা। কলামন্দিরের পরের সেই অনুষ্ঠানে একইসঙ্গে গাইলেন সিগার ও সুমন। এক মায়াবিভ্রমে দুটি দেশ, দুটি ভাষা, দুটি শিল্পী একাকার হয়ে গেলেন। মাঝে বিছিয়ে রইল গানের মানচিত্র।    

সেই সন্ধেয় এক-একটি বিষয় ধরে ধরে নিজের গান গাইলেন সুমন, তারপরে সিগার গাইলেন নিজের গান। গানের ভিতর দিয়েই যেন কথা বলল দুটি ভিন্ন সময়, ভাষ্য, স্থান… সিগার নাকি পরে বলেছিলেন, এমন অভিজ্ঞতা তাঁর আর কোনোদিন হয়নি। অথচ, অডিও বা ভিডিও কোনো রেকর্ডিং-ই হয়নি কলামন্দিরের এই ঐতিহাসিক যুগলবন্দির। এর কিছুদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রভারতী কর্তৃপক্ষ আরেকটি একক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানান সিগারকে। সেই অনুষ্ঠানের অবশ্য রেকর্ডিং হয়েছিল। শুধু, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাদ পড়ে গেল সিগার-সুমনের সেই ঐতিহাসিক সন্ধে। 

বেঁচে থাকলে পিট একশো বছরের থুত্থুড়ে বুড়ো হতেন এখন। আর সুমন এখন সত্তর। গত তেইশ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়েছে, একাধিক হিমবাহ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কলকাতার দূষণ বেড়েছেন কয়েক গুণ, গোটা পৃথিবী জুড়ে অতি দক্ষিণের দামালপনা বেড়েছে। সিগার চিরতরে নিশ্চুপ হয়েছেন পাঁচ বছর আগে। সুমন নিজের খেয়ালে আছেন, বিতর্কেও। তাঁর কাছে বাংলা গান, একটা নতুন সময়ের ভাষারা বড়ো বেশি ঋণী। আর সিগারের কাছে ঋণী গোটা বিশ্ব। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র, বলেছেন, ভয় না পেতে। সময়টা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে বারবার। প্রকৃতি জুড়ে ক্ষয়। তারইমধ্যে সিগার আজো স্বপ্ন দেখতে বলছেন, সুমনের কণ্ঠ এখনো থেমে যায়নি। শুধু আমাদের মতো অভাগা প্রজন্মের মানুষরা সেদিনের মতো একটা ঐতিহাসিক যুগলবন্দির সন্ধে হাতড়ে যাচ্ছি। কোথাও তো নিশ্চয়ই আছে, কোনো অলেখা স্মৃতিতে অন্তত…

ঋণ: ‘দ্বিতীয়বার পিতৃহীন হলাম’, কবীর সুমন; ‘ডিসকভারিং দ্য আদার আমেরিকা: র‍্যাডিকাল ভয়েসেস ফ্রম দ্য নাইন্টিন এইটি’জ’, কবীর সুমন; ‘পিট সিগার বললেন, ডিলান-ফিলানের ইন্টারভিউ নিও না’, কবীর সুমন, আলাপচারিতায় নীলাঞ্জন হাজরা, এইসময়; ‘আমি নাগরিক পল্লীগীতিকার- কবীর সুমন’, সুকল্প চট্টোপাধ্যায়, বঙ্গদর্শন। 
 
 

Developed by DXDasia