বাংলাদেশে পদ্মমাধবের পালা

বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন নামে এই পূজা হয়ে চলেছে আজও

চম্পকনগরের সওদাগর চাঁদ। শিবভক্ত চাঁদের ছেলে লখিন্দর। লখিন্দরের বিয়ে ঠিক হয় উজাননগরের কন্যা বেহুলার সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের রাতেই সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় লখিন্দরের। মরা স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে কলার ভেলায় বেহুলাও পাড়ি দেয়। তার পর মনসার বরে ফিরে পায় ছয় ভাসুর ও স্বামী লখিন্দরকে। সপ্ততরী ভেসে উঠে মনসার বরে। সাতঘাটের মাগন শেষে রসুল মিঞা পদ্মমাধবের ঢালা ভাসান দেয় যমুনার পানিতে। চিড়ে মুখে দিয়ে সারাদিনের উপাস ভাঙে রসুল মিঞা। সাতঘাটের মাগন, বেহুলার ভাসান, শাওনের ঢালা, ব্রতকথা, পাঁচালি, মনসা মঙ্গলকাব্য, ভাসানযাত্রা যে নামেই ডাকি না কেন এসব আসলে সর্পদেবী মনসার আরাধনা।

নদীভরা দেশ বাংলাদেশ। ছোটবড় হাজারো নদী তাদের জলরাশি নিয়ে এগিয়ে চলেছে সংগমের দিকে। আর এই সংগমের দেশেই মিলে মিশে এক হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্ম। টাঙ্গাইলের বাসাইল, অর্জুনা ও জামালপুরসহ অঞ্চলে জলা-জঙ্গলের কারণে সাপের কামড়ে অনেক লোক মারা যায়। তাই সর্পদেবীর প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা করেন সর্পদেবী মনসার। হিন্দুরা পূজা করেন মনসা নামে আর মুসলিম ঘরে পূজা হয় পদ্মমাধব নামে। ভাদ্র সংক্রান্তির খুব ভোরে শুরু হয় এই পালা। কারণ যত সকালে যমুনার জলে ঢালার তরী ভাসবে ততই শুভ।

“ওকি আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।
আসিলে বসিতে গো দিব এই আসরের মাঝে।
আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।
প্রথমে বন্দনা করি আল্লাহ নিরাঞ্জনরে,
আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।
তার পরে রাসুলের চরণে,
আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।
তার পরে বন্দনা করি আলীর চরণে
আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।
……

তার পরে বন্দনা করি হিমালয় পর্বত রে,
আইস পদ্ম মাদব আ-আ-আয়-সরে।

রসুলমিঞার দলের ছেলেরাই বেহুলা, লখিন্দর ও সখি সেজে নৌকার উপর পালা করতে শুরু করে। তার সঙ্গে চলে পাঁচালির সুরে পদ্মমাধবের গান। এই পালায় মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের অংশটুকুই করা হয়। বেহুলা যেমন সাপে কাটা স্বামীর দেহ নিয়ে সাত-সমুদ্র পার হয়ে স্বর্গে পৌছায় ঠিক তেমনি রসুলমিঞাদের নৌকাও যমুনার তীরে থাকা সাতটি ঘাট নেমে গান-নাচের মধ্য দিয়ে পদ্মমাধবের নামে মাগন সংগ্রহ করে। নৌকায় পালাদলের একজন ওস্তাদ থাকেন। ঘাটে নেমে মাগন সংগ্রহ করার আগে নৌকায় বসে থাকা ওস্তাদজী, বয়স্ক পাঁচালি গায়কের কাছ থেকে পা-ছুঁয়ে বিদায় নেওয়ার রীতি আছে। ওস্তাদের সম্মতি নিয়ে কৈলাস তুষ্ট গান গেয়ে মাগনের ঢালা নিয়ে পা বাড়ায় দলপ্রতি। ঢালা তৈরি হয় বাঁশ দিয়ে তাতে দুধ, কলা, চিড়া দেওয়া হয়। এইভাবে যমুনার সাতঘাটে বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী নাট্য শুনিয়ে মাগন তোলা হয়। তার পর মাগন পদ্মমাধবের নামে ভাসিয়ে দেওয়া হয় যমুনার জলে। পালা চলাকালীন মানুষ চাল ডাল তরিতরকারি দান করে। ঢালা ভাসানের পর সেইসব প্রাপ্ত সামগ্রী দিয়ে ভোগ দেওয়া হয় পদ্মমাধবের উদ্দেশ্যে সঙ্গে সারা রাত ধরে চলে পাঁচালি পাঠ। এভাবে শেষ হয় পদ্মমাধব বা সর্পদেবীকে তুষ্ট করা পালা। মানত করা হয় সর্পদেবী যেন সারাবছর তাঁর বাহনদের হাত থেকে রক্ষা করেন। কেউ আবার মানত করে বেহুলার মত সৌভাগ্যবতী হওয়ার।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন নামে এই পূজা হয়। রংপুর অঞ্চলে বিষহরির গান, রাজশাহী-নাটোর অঞ্চলে পদ্মাপুরাণ গান, কুষ্টিয়ায় পদ্মার নাচন, টাঙ্গাইল জেলায় বেহুলার নাচারি, দিনাজপুর অঞ্চলে কান্দনী বিষহরির গান, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে মনসার টপযাত্রা, বরিশাল অঞ্চলের রয়ানী গান নামে পরিবেশিত হয়।

তথ্য সূত্র: বাংলার মেলা বাংলার পার্বণ। লেখ- ইমরান উজ-জামান

Developed by DXDasia