
বিস্মৃতপ্রায় লেখক কল্যাণকুমার বসু
বাংলা সাহিত্যে জীবনীগ্রন্থ বা বায়োগ্রাফি (হ্যাজিওগ্রাফি বলাই যুক্তিযুক্ত) রচনার ইতিহাস শ্রীচৈতন্য পরবর্তী আমল থেকেই চলে আসছে। সেই ধারায় যেমন প্রাথমিকভাবে কাব্য পাওয়া যায়, তেমনই পাওয়া যায় কবিকর্ণপূর রচিত ‘শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয়’ নাটকও। সুতরাং জীবনীর ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষা বাঙালির বহুদিনের অভ্যাস। আধুনিক যুগে পৌঁছে পৃথিবীর অন্যান্য বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের মতো বাংলাতেও লেখা হয়ে চলেছে জীবনী-উপন্যাস। তেমনই দুটি জীবনী উপন্যাস ও তার বিস্মৃতপ্রায় লেখককে নিয়ে কিছু কথা এ-লেখার আলোচ্য বিষয়।

জীবনানন্দের জীবন নিয়ে ‘নীল হাওয়ার সমুদ্র’, ‘সোনালী ডানার চিল’, ‘একজন কমলালেবু’ প্রভৃতি আরও অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, তবে এই প্রচেষ্টায় প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত করা যায় ‘বিকেলের নক্ষত্রের কাছে’কে। জীবনানন্দ-গবেষক গৌতম মিত্র এই বইটিকে ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক বা বেসিক রিসার্চ ওয়ার্ক’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
বিস্মৃতপ্রায় লেখক কল্যাণকুমার বসু। জন্ম ১৯৩২ সালে। ১৯৫৬ সালে গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে একজন চিত্রশিল্পী হিসাবে পড়ালেখা শেষ করেন। তিনি প্রাথমিকভাবে পরিচিত ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী হিসাবেই, কাজ করেছেন বহুদিন, শিখিয়েছেন বহু ছাত্রছাত্রীকে। তবে এটি কল্যাণবাবুর একমাত্র পরিচয় ছিল না, তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ গবেষক এবং ঔপন্যাসিক।
কল্যাণকুমার বসু রচিত প্রথম যে বইটি নিয়ে কথা বলতে হয়, সেটি হল ‘আমারে এ আঁধারে’। এই বইটি অতুলপ্রসাদ সেনের জীবনী-উপন্যাস। প্রথম প্রকাশ জুলাই, ১৯৬৯ সালে। কেবলমাত্র গীতিকার অতুলপ্রসাদ নন, তাঁর সমগ্র জীবনচিত্রই ধরা আছে এই বইতে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অতুলপ্রসাদের গভীর প্রীতি ও শ্রদ্ধার নানা অন্তরঙ্গ মুহূর্তও এই উপন্যাসের একটি বৈশিষ্ট্য। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘আমারে এ আঁধারে’ বইটি সম্পর্কে লেখা হয় – ‘তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে লেখক যদি আন্তরিক না হতেন, যদি নিজে কিছু নতুন তথ্য সংগ্রহ না করে শুধুমাত্র প্রচলিত মাল-মশলাগুলোকে নিয়েই তৃপ্ত থাকতেন, তবে এই জীবন-প্রতিষ্ঠা সম্ভব হত না কোনো মতেই।’ এক দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ২০০০ সালে আবার এই বই পুনঃপ্রকাশ হয়, যদিও ততদিনে কল্যাণবাবু প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই দ্বিতীয় সংস্করণের পরেও অতিক্রান্ত হয়েছে ২৫ বছর, এখন এই সংস্করণও বই-বাজারে পাওয়া যায় না।

কল্যাণকুমার বসু প্রাথমিকভাবে একজন চিত্রশিল্পী হওয়ার পরেও বাংলার জীবনীসাহিত্যের ধারায় যে গবেষণার কাজ করেছেন, তার জন্য তাঁর এক ব্যাপক স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল।
এবার যে বইটি নিয়ে কথা বলতে হয়, সেটির নাম ‘বিকেলের নক্ষত্রের কাছে’। এই বইটি জীবনানন্দ দাশের জীবনী-উপন্যাস। প্রকাশিত হয় নভেম্বর, ১৯৯৮ সালে। যদিও এই কাজটি কল্যাণবাবু শুরু করেন বহু আগে। এই লেখাটির জন্য কল্যাণবাবু তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন ১৯৬২ সাল নাগাদ, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয় ১৯৭০/৭১ সালে। ১৯৭৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘অমৃত’ পত্রিকাতেই এই লেখার বেশ কিছু অংশ প্রকাশিতও হয়। তারপর বিভিন্ন কারণে সেটি দীর্ঘদিন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ পায়নি, শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে তা প্রকাশিত হয়। এই বইটি কেন ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ? এর তিনটি কারণ বলা যায়। প্রথমত, এই বইটির একটি বড়ো অংশ লেখা হয়েছে সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে। যে ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, সেই নামগুলি হল অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, গৌরকিশোর ঘোষ, বিষ্ণু দে, অরুণ সরকার, তারাপদ রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, অন্যদিকে লাবণ্য দাশ, অশোকানন্দ দাশ, সমরানন্দ দাশ, মঞ্জুশ্রী দাশ প্রমুখ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, একটি দীর্ঘ তথ্যসমৃদ্ধ বই এটি। দ্বিতীয়ত, গবেষক ক্লিনটন বি সিলি এই কাজটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কল্যাণকুমার বসু ও ক্লিনটন বি সিলি মোটামুটি একই সময় কাজ শুরু করেন। সিলি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে জীবনানন্দ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন কল্যাণবাবুকে, যেগুলি স্থান পেয়েছে এই উপন্যাসে। তৃতীয়ত, জীবনানন্দের জীবন নিয়ে ‘নীল হাওয়ার সমুদ্র’, ‘সোনালী ডানার চিল’, ‘একজন কমলালেবু’ প্রভৃতি আরও অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে, তবে এই প্রচেষ্টায় প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত করা যায় ‘বিকেলের নক্ষত্রের কাছে’কে। জীবনানন্দ-গবেষক গৌতম মিত্র এই বইটিকে ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক বা বেসিক রিসার্চ ওয়ার্ক’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও এখন এই বইটিকেও বলা যায় ‘আউট অফ প্রিন্ট’।

কল্যাণবাবু এছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখার কাজ করে গেছ্ন, এ-প্রসঙ্গে ওঁর আরও দুটি বইয়ের কথা বলতে হয়। প্রথমটি হল দমকল কর্মীদের জীবনের অভিজ্ঞতার কাহিনি নিয়ে রচিত বই ‘যারা আগুন নেভায়’ এবং অন্যটি হল প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ অতুলপ্রসাদ জীবনানন্দ এবং একজন প্রবাসী বাঙালী’। দ্বিতীয় বইটিতে যেমন ধরা আছে বাঙালির চিরকালীন নক্ষত্রদের কথা, তেমনই ধরা আছে কল্যাণবাবুর নিজের পূর্বপুরুষের কথাও। আরও একটি বইয়ের কাজ কল্যাণবাবু করেছিলেন, পাশ্চাত্য শিল্পীদের জীবনচিত্র নিয়ে ‘সৃষ্টির নেপথ্যে’ নামে। এই লেখাগুলিও অবিন্যস্তভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যদিও দুঃখের বিষয় ২০০০ সালে কল্যাণবাবুর প্রয়াণের পর এই বিশেষ পাণ্ডুলিপিটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত এখনও কোনো পুরোনো প্রকাশকের অফিসে ধুলোয় ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে পাণ্ডুলিপিটি। সময়ের গর্ভে চলে যায় জীবনানন্দ সম্পর্কিত প্রায় সব নথিপত্রের প্রাথমিক সূত্রের প্রতিলিপিগুলিও।
কল্যাণকুমার বসু প্রাথমিকভাবে একজন চিত্রশিল্পী হওয়ার পরেও বাংলার জীবনীসাহিত্যের ধারায় যে গবেষণার কাজ করেছেন, তার জন্য তাঁর এক ব্যাপক স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল, কিন্তু বাঙালির সাধারণ বৈশিষ্ট্য কৃতি মানুষকে স্বীকৃতি না দেওয়া, সেটি যেমন জীবনানন্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনই জীবনীকার কল্যাণবাবুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ২০২৫ সাল কল্যাণবাবুর ২৫তম প্রয়াণবার্ষিকী। এই বছরটি মাথায় রেখে কল্যাণবাবুর পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাঁর মূল্যবান উপন্যাসগুলি এবং লেখাগুলি যাতে আবারও পাঠকের দরবারে হাজির করা যায়। এই কাজ যদি সম্ভব হয়, তাহলেই হয়তো কল্যাণবাবুকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু জানানো যাবে।