নবনীতা দেবসেনের ‘সই’ : সৃষ্টিশীল মেয়েদের খোলা বারান্দা

নবনীতার পাতানো সই যেন স্বাক্ষর, সখী, সহ্য করি

ভালো-বাসা বাড়িতে সইয়ের আড্ডায়

বনীতা দেবসেন। শুধু একটি নাম নয়। যেন বটবৃক্ষ এক, শাখায় শাখায় বিস্তৃত। তিনি তো শুধু তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টি নিয়ে, শিক্ষকতা নিয়ে, তাঁর রিসার্চ-ওয়ার্ক নিয়ে থাকেননি। তার বাইরেও অনেক কাজ তাঁর। তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হল ‘সই’। তাঁর নিজের ভাষায় পশ্চিমবঙ্গ লেখিকা সঙ্ঘ।

অস্মিতা উইমেন্স ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনায় সেই যে ১৯৯৯-এর নভেম্বরে নৈনানে ক্রিয়েটিভ রাইটার্স ওয়ার্কশপ হয়েছিল, সেইখান থেকেই সেই কর্মশালার ক্ষেত্র থেকেই একটি ভাবনা এবং সেই ভাবনা থেকেই সই-এর জন্ম সেই বছরেরই ৩০ নভেম্বর, প্রতিষ্ঠাতা নবনীতা দেবসেন। আমি অবশ্য সেই জন্মলগ্নে উপস্থিত ছিলাম না। প্রায় মাস ছয়েক পরে যুক্ত হয়েছি নবনীতাদির ডাকে।

২০১৭-র বইমেলায়

সই অর্থাৎ স্বাক্ষর, সখী, সহ্য করি। সই সৃষ্টিশীল মহিলাদের বিচরণভূমি। সদস্যদের নিয়মিত উপস্থিতিতে ভালো-বাসা লেখা এবং যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবনা-বিনিময়ের এবং তারই সঙ্গে নিছক আড্ডারও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি জায়গা হয়ে উঠল। বলা ভালো ‘সই’ সৃষ্টিশীল মহিলাদের খোলা বারান্দা। সেই বারান্দা নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন নবনীতা দেবসেন।

যদিও ‘সই’ নবনীতাদির মস্তিষ্কপ্রসূতই ছিল, কিন্তু আমাদের মাথার ওপর প্রতিভা বসু এবং মহাশ্বেতাদেবীও ছিলেন। প্রতিভা বসু আমাদের ‘হেড সই’ ছিলেন। তাঁর নব্বই বছরের জন্মদিনে কবিতাভবনে আমরা সবাই উপস্থিত হয়েছিলাম, ‘সই’ থেকে তাঁকে একটি রূপোর গ্লাসে ‘হেডসই নব্বই’ লিখে দিয়ে এসেছিলাম। মহাশ্বেতাদেবীর আশি বছরের জন্মদিনও মহাসমারোহে পালন করা হয়েছিল। আবার সই-এর অন্য সদস্যদের জন্মদিন করতেও নবনীতাদি ভুলতেন না। এই যে পূর্বসূরী এবং উত্তরসূরীকে নিয়ে একই সঙ্গে পদক্ষেপ তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। কে না ছিল তখন সইয়ে! বিজয়া মুখোপাধ্যায়, বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, এষা দে, কণা বসু মিশ্র, কৃষ্ণা বসু, জয়া মিত্র, নন্দিতা বাগচি, অনিতা অগ্নিহোত্রী, সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্দার মুখোপাধ্যায়, অঞ্জলি দাশ, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, চিত্রা লাহিড়ী প্রমুখ। পুরো রমরমা ছিল তখন ‘সই’।

অসম লেখিকা সমিতির ডাকে ২০০৬-এ গৌহাটি

সই-এর আসর যেন নিছক আড্ডা না হয়, যেন সৃষ্টিক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে সেদিকে ছিল তাঁর কড়া নজর। তবে ‘সই’ যেমন শুধুমাত্র পাণ্ডিত্য ফলানোর জায়গা ছিল না, আবার শুধুমাত্র মুড়ি-তেলেভাজা খাওয়ার জায়গাও ছিল না। সব কিছুর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখেই ‘সই’ ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। আলোচনা, সেমিনার, কবিতাপাঠ, নাটক, গল্পপাঠ, সংগীত, নৃত্য সব মিলিয়ে ‘সই’ মেয়েদের খোলা বারান্দা হয়ে উঠল।

২০০২ সালে কলকাতা বইমেলা-তে ইউবিআই মঞ্চে প্রথম সইমেলা, পনেরোজন মহিলা কবি-লেখকদের উপস্থিতি কেমন সাড়া ফেলে দিল, প্রথমবারের সেই উপচে পড়া ভিড় আর সময় পেরিয়ে যাওয়া সেই অনুষ্ঠানের সাক্ষী ছিলেন যাঁরা তাঁরা জানেন। আমাদের সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন সুইডেনের কবি শ্রীমতী অ্যানিটা গোল্ডম্যান। সেখানে কবিতা অনুগল্প শ্রুতিনাটক পঠিত হয়েছিল, আর শেষে লেখক-পাঠকের প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল।

আবার দ্বিতীয় সইমেলা ২০০৩-এ আমাদের পনেরো জনের কবিতাপাঠ। বিশেষ অতিথি ছিলেন আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয় লেখিকা শ্রীমতী চিত্রা দিবাকরুনী। এইবারেও লেখক-পাঠকের প্রশ্নোত্তর পর্ব খুবই জমজমাট হলো। তার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত এবং আরও অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তির সক্রিয় উপস্থিতিতে সভাটি আরও আকর্ষণীয় হয়েছিল।

যদিও ‘সই’ নবনীতাদির মস্তিষ্কপ্রসূতই ছিল, কিন্তু আমাদের মাথার ওপর প্রতিভা বসু এবং মহাশ্বেতাদেবীও ছিলেন। প্রতিভা বসু আমাদের ‘হেড সই’ ছিলেন। তাঁর নব্বই বছরের জন্মদিনে কবিতাভবনে আমরা সবাই উপস্থিত হয়েছিলাম, ‘সই’ থেকে তাঁকে একটি রূপোর গ্লাসে ‘হেডসই নব্বই’ লিখে দিয়ে এসেছিলাম।

‘সই’-এর অনেক কাজকর্ম, অনেকই ক্রিয়াকলাপ। ২০০৫ সালে ‘সই’ থেকে আমরা একটি পত্রিকা প্রকাশ করলাম, সই-সাবুদ নামে। পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় কখনও নিয়মিত, কখনও অনিয়মিত, কখনও বিষয়ভিত্তিক, কখনও সাধারণসংখ্যা। ‘সই’-এর প্রকাশনাও যথেষ্ট হৈ-হৈ করে শুরু হয়েছিল। প্রথমবছর অনেকগুলি কবিতা ও গদ্যের বই ছাপা হয়েছিল, উদবোধন অনুষ্ঠানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে এসেছিলেন, এছাড়া নবনীতা দেবসেন তো সর্বদাই মঞ্চ আলো করে থাকতেন।

বইমেলাতে সইমেলা ২০০৩

পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল আমাদের সইমেলা-বইমেলা। মহিলাদের বই নিয়ে বইমেলা, ২০০৫ সালেই মে মাসে রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হল ভারতের প্রথম মহিলাদের বই নিয়ে মেলা। উদ্বোধন করলেন তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রী গোপালকৃষ্ণ গান্ধী। প্রধান অতিথি ছিলেন নৃত্যশিল্পী শ্রীমতি অমলাশঙ্কর এবং প্রখ্যাত অসমিয়া লেখিকা শ্রীমতি ইন্দিরা গোস্বামী। বলা বাহুল্য নবনীতা দেবসেনের তত্ত্বাবধানে এবং বিজয়া মুখোপাধ্যায়, বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, এষা দে-র সহায়তায় আর সকল সই-এর পরিশ্রমে এই প্রয়াস প্রবলভাবে সার্থক হয়ে উঠল। মেয়েদের বইমেলার প্রয়োজন কেন সেই বিষয়ে বললেন যশোধরা বাগচী। চারদিন ধরে সাড়া জাগানো সইমেলা-বইমেলা বলে দিল এই মেলার গুরুত্ব। এরই মাঝে সই ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উদ্যোগে শান্তি ও সম্প্রীতির সন্ধ্যা উদযাপিত হলো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ঐতিহাসিক হলে ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’ সান্ধ্য উৎসবের মাধ্যমে। বইমেলা-সইমেলাতে পুরুষ কবি-গল্পকাররাও কবিতা-গল্প পড়েছিলেন, উল্লেখযোগ্য নাট্যকাররা আলোচনা করেছিলেন মঞ্চে। ‘অনামিকা-সন্ধ্যা’ হয়েছিল, সেখানে যে মেয়েরা পরিচিতি পাননি, তাঁরা কবিতা পড়েছিলেন।

সেই থেকেই বারংবার সইমেলা-বইমেলা। ২০০৬-এ যোগ দিয়েছিলেন দিল্লীর মহিলা প্রকাশক এবং সম্পাদকরা। শোভা সেন, অপর্ণা সেনের মতন ব্যক্তিত্বরা এসে শ্রোতাদের মুখোমুখি বসে মেলাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন আমেরিকান ফিলোজফার মার্থা নুসবাম। ২০১৩ নভেম্বরে আইসিসিয়ার-এ বইমেলা-সইমেলা অনুষ্ঠানে অমলাশঙ্কর, মহাশ্বেতাদেবী, মমতা সাগরের মতন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা এসেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে দুজন সর্বভারতীয় লেখিকা শশী দেশপান্ডে ও ঊর্মিলা পাওয়ারকে পুরস্কৃত করে ‘সই’ সম্মানিত হলো। ২০১৫-তে আইসিসিআর-এ চারদিন ধরে সইমেলা-বইমেলা। প্রতিভা বসুর জন্ম-শতবর্ষে সইমেলার অনুষ্ঠান-মঞ্চটি তাঁর নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল এবং তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়েছিল। বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে বিখ্যাত লেখিকা সেলিনা হোসেন। ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে ইসমত চুঘতাইয়ের জন্মশতবর্ষ পালিত হলো দুদিন ধরে সইমেলাতে, শঙ্খ ঘোষ উদ্বোধন করেন, ঊষা গাঙ্গুলি চুঘতাইয়ের নাটক থেকে পাঠ করেন, ইত্যাদি প্রভৃতি। ২০১৭-তে সইমেলার থিম ছিল ‘ভূমিকন্যা’, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সাহিত্য। ৬-৭ জানুয়ারি ২০১৮-তে সইমেলা শিশিরমঞ্চ ও গগনেন্দ্র শিল্পপ্রদর্শশালায়, থিম ছিল ‘হিংসার বিরুদ্ধে সৃজনশীল নারী’। উপস্থিত হয়েছিলেন কবি কমলা ভাসিন, সমাজকর্মী ইরম চানু শর্মিলা ও লেখক মৃণাল পাণ্ডে।

অসম লেখিকা সমিতির ডাকে ২০০৬-এ আমরা সবাই মিলে গৌহাটি গেলাম যখন কী আনন্দ নবনীতাদির! দুদিন অনুষ্ঠান তো হলই, ব্রহ্মপুত্রে বেড়ানোও খুব আকর্ষণীয় ছিল, বিশেষত নবনীতাদির জমাটি আড্ডা। আমাদের অনেক ইচ্ছে, অনেক নতুন নতুন ইচ্ছে। এই সকল অভিনব ইচ্ছে-ভাবনাই নবনীতাদির মস্তিষ্ক-প্রসূত ছিল। এরকমই একটি ইচ্ছে থেকেই সই-এর লেখিকাদের গল্প নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হলো ‘সই’ নামে। এই বইয়ে কবিদের গল্পও সংকলিত হয়েছিল। ‘পুষ্প’ থেকে প্রকাশিত এই বইটি ক্রমশ বেস্টসেলারও হয়ে গেল। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণও হয়েছিলো।

অসম লেখিকা সমিতির ডাকে ২০০৬-এ গৌহাটি

নবনীতাদির অনেক ইচ্ছের অন্যতম ইচ্ছে বারোয়ারি উপন্যাস রচনা। বিভিন্ন কলম একত্রিত করে একটিই কাহিনির সৃষ্টি। ‘সই’-দের মধ্যে নবনীতা দেব সেন, বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, এষা দে, কণা বসু মিশ্র, জয়া মিত্র, অনিতা অগ্নিহোত্রীর মতন লেখিকারা যেমন আছেন, সেরকমই আবার সেভাবে গদ্য লেখেন না এমন অনেকেও আছেন। তাই শুরুতে দ্বিধা, সেই দ্বিধা অবশ্য নবনীতাদির চেষ্টায় ভেঙে গেল। প্রথম উপন্যাসটি ‘চিরহরিৎ’ লেখা হল মেয়েদের দৃষ্টিকোণ থেকে। লিখলেন নবনীতা দেব সেন, বাণী বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, এষা দে, কণা বসু মিশ্র। জয়া মিত্র এবং অনিতা অগ্নিহোত্রীরও লেখার কথা ছিল। দ্বিতীয় উপন্যাসটি ‘গাথা বিংশতি’, আমরা কুড়িজন মিলে লিখলাম, একটি বনেদি যৌথ পরিবারের একটি বিয়েবাড়িকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন চরিত্র প্রতিষ্ঠা করে সেই পরিবারের যাপনচিত্র, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন কাহিনি। আরেকটি কবিতার সংকলন। এই তিনটি বই একত্রে ইলিনা বণিকের প্রচ্ছদে একত্রে সই বারোয়ারি নামে প্রকাশিত হলো লালমাটি প্রকাশনা থেকে।

সইমেলা-বইমেলা অথবা সই বারোয়ারির সঙ্গে সই-এর কার্যকলাপ শেষ হল এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, নবনীতাদি কখনওই তা হতে দেননি। তাঁর তত্ত্বাবধানে সই-এর বিরাট বিরাট অভিনব সব ক্রিয়াকলাপ ও সৃষ্টি ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। সইয়ের ওয়েবসাইট তৈরি হলো ২০১৬-তে, শঙ্খ ঘোষ, ভারতী রায় এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৭-তে আমাদের ব্লগ, ‘ব্লগব্লগম’-এর অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল ‘সইসাবুদ’ আন্তর্জালে। মেয়েদের লেখা আধুনিক লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ থেকে শুরু করে কবিতাপাঠ নাটক গান নাচ সবই ছিল সই-এর আকর্ষণ। ২০১৯-এ ৩০ নভেম্বর সই-এর একুশে পা নিয়েও নবনীতাদির অনেক চিন্তা-ভাবনা ছিল…

_____________________________
ছবি সৌজন্যে: ঈশিতা ভাদুড়ী

Developed by DXDasia