নবনীতার পাতানো ‘সই’ শিখিয়েছে স্বাক্ষর, সখী আর সহ্য করার মন্ত্র

যদিও নবনীতা বলেছেন, শুধু ‘সহ্য করা’টার সঙ্গে সই পাতাব না

পৌষের দুপুরে ধুলো ওড়া ময়দান। চারদিকেই বই বই গন্ধ। মেলার প্রায় শেষ লগ্নে মফস্‌সল থেকে ভিড় ঠেলে বাড়ির বড়োদের সঙ্গে গিয়েছি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। নানা বই দেখছি, সঙ্গে কত লোক। তারই মধ্যে কাউকে কাউকে চিনিয়ে দিচ্ছেন বড়োরা। হঠাৎ দেখি বড়ো গোল টিপ, গোল চশমা, পাটভাঙা শাড়ি, টুকটুক করে এগিয়ে আসছেন মানুষটি। সঙ্গে দু’চারজন। বাড়ির লোককে বলে দিতে হয় না মানুষটির পরিচয়। টিভির পর্দায় আর তাঁরই লেখা বইয়ের মলাটে তাঁকে দেখেছি বহুবার। তাঁর সঙ্গেই তো মনে মনে ট্রাকে চড়ে তখন সেবার কদিন আগেই ম্যাকমোহন লাইনে চলে গেছিলাম আমি। সেই তিনিই এখন সামনে! আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রায় বুঝভুম্বুল দশা তখন। তারই মধ্যে সামনে দিয়ে কখন তিনি হেঁটে চলে গেলেন। জীবনকে তিনি সরসতার পাঠ শিখিয়েছেন বারবার। মৃত্যুকে পর্যন্ত বলেছেন অত হুটোপুটি না করে, আসতে যখন হবেই তখন ধীরে সুস্থে এসো। রবীন্দ্রনাথ-এর ‘নবনীতা’ তিনি। আর বাঙালি মেয়েদের আজীবনের ‘সই’। তাঁর গলার স্বর এখনও কানে বাজে আর সেই ঠোঁট জোড়া তাঁর অনাবিল হাসি! একবার যে দেখেছে তাঁর লেখার মতোই সে হাসিও ভোলা মুশকিল। একবার যে মজেছে তাঁর লেখায় তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলার দায়িত্ব নেন নবনীতা নিজেই।    

সাহিত্যিক দম্পতি নরেন্দ্র দেব ও রাধারানিদেবীর ‘ভালোবাসা’য় তাঁদের আদরের ‘খুকু’র (নবনীতার ডাকনাম) জন্ম। এই বাড়িই নবনীতার ভুবন। ‘ভালোবাসা’র মায়ায়, ছায়ায় দেব দম্পতির চিরকিশোরী কন্যা নবনীতা, নিজস্ব সিগনেচার স্টাইল এনেছিলেন বাংলা সাহিত্যে। রাগ, কষ্ট, দুঃখ, অভিমান জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা ঠিক কোনো না কোনোভাবে ইতিবাচকতা খুঁজে পায় নবনীতার লেখায়। কেমন করে সহজ হতে হয়, আত্মবিশ্বাসী হতে হয় জীবন তা বারবার শিখে নেয় তাঁর কাছে। এমনই আশ্রয় দাত্রী ও প্রত্যয়ী নবনীতা ও তাঁর লেখা। গদ্যের পাশাপাশি কবিতার চরাচরেও তাই সেভাবেই দৃপ্ত হন নবনীতা, “জলের অনেক নীচে খেলা করি, শর্তহীন, একা/ সেইখানে পৌঁছবে না খাজনালোভী সমাজ পেয়াদা/ জলের অনেক নীচে সৌজন্যের দুঃখ সুখ নেই।” 

মানুষের জীবনে পারা যেমন থাকে, না পারার জায়গাও থাকে অজস্র। এই সহজ সত্যিটাকে স্বীকার করেই নবনীতা দেবসেন লিখতেন। তাঁর লেখায় এই পারা আর না পারারা হাত ধরে চলে সমান তালে। নবনীতা পড়াশোনায় তুখোড়, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তাঁর ঝুলিতে, এই নবনীতা তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপিকা, রামায়ণ গবেষিকা, কবি, প্রাবন্ধিক, গদ্যশিল্পী আবার এই নবনীতাই রান্নায় ভুল করেন, জীবনটাকে ঠিক মতো করে গুছিয়ে রাখতে চেয়েও শেষপর্যন্ত এলোমেলো করে ফেলেন, এই নবনীতাই আবার পরক্ষণে সময়কে তু্ড়ি মেরে নিরুদ্দেশের পথে হাঁটেন। এই যে নিজেকে কেটেকুটে না বাদ দিয়ে তার সবরকম বায়নাক্কা, ঝক্কি সামলাতে সামলাতে চলার যে জীবন সেইটেই নবনীতা, সেইটেই তাঁর লেখা। তাই এই নবনীতা দেবসেন যখন রামায়ণ নিয়ে গবেষণা করেন তখন ক্রমে বুঝতে পারেন সীতাকে না বুঝলে রামকে বোঝা যাবে না। তিনি মেতে ওঠেন সীতার জীবন নিয়ে। বাল্মীকির সীতা ও রাম যেখানে দেবত্বের খোলস ছেড়ে এসে রক্তমাংসের সমগ্র মানুষ, সেখানেই নবনীতা বুঝতে পারেন ও আমাদেরও বুঝিয়ে দেন, ভক্তিধর্মের বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে আসা রঘুপতি রাঘব রাজা রাম আসলে দোষেগুণে গড়া এক মানুষ। রামকথার অদরদি অংশগুলি নিয়ে তাই প্রশ্ন করতে পারেন নবনীতা। পুরুষকার ছেড়ে কেবল পুরুষতন্ত্রে আটকে রাখা রামতন্ত্রের নানা দিক স্পষ্ট করেন তিনি। প্রথম যে মহিলা রামায়ণকার চন্দ্রাবতী রামকে ধরাশয়ী করেন যুক্তিজালে, তাঁকেই সামনে আনেন নবনীতা। রাম ইতিকথায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। বেশিরভাগ সমস্যায় আমরা যে চোখ বুজে থাকতে চাই, সেই বোজা চোখ টেনে খুলে তার সামনে আয়না ধরে নবনীতার ‘বামাবোধিনী’। নারীবাদ কেবলমাত্র ঠুনকো পুরুষ বিরোধিতা নয়, মেয়ে হয়ে আর একজন মেয়ের ও আর একজন ছেলের সমস্যার কথাটা বুঝতে শেখায় শুনতে শেখায় যা, নবনীতা দেবসেন তেমন ‘ইজমে’ই আসলে আস্থা রেখেছিলেন।  

রূপকথাকেও যে সময়ের দাবিতে আধুনিক হয়ে উঠতে হয় তা অনুভব করেছিলেন নবনীতা। তাই শিশুসাহিত্যেও নতুন নিরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি। একেবারে সমকালীন ভাষায় তিনি লিখেছেন, যেখানে অনায়াসে বাংলার মধ্যে ঢুকে পড়ে ইংরেজি শব্দ। বদলে যাওয়া সময়ে ছোটোদের ভাষার জগৎটাও যে বদলাচ্ছে সেটা বুঝেছিলেন নবনীতা। ছোটোদের জন্য লেখা বলেই তা কেবল হাসি কান্নার গল্প দিয়ে তাই তিনি ভরিয়ে রাখেননি, বরং সেসবের মোড়কেই জীবনের তীক্ষ্ণতাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। পরিণত, সচেতন মনের খিদে বারবার নবনীতা উস্কে দেন তাঁর লেখায়।    

এত স্পষ্টবাদিতা, জীবন সম্পর্কে এত স্বচ্ছ ধারণা নবনীতা পেলেন কোথা থেকে! নিজে বারবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন নিজের মা রাধারানিদেবীর কথা, ‘অপরাজিতা’ ছদ্মনামে যিনি কবিতা লিখতেন। মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে নবনীতা পেলেন লেখা আর সৎ সাহস। বাবা তাঁকে দিয়েছিলেন এক দিলখোলা বিরাট হৃদয়। এই নবনীতার হাত ধরেই বাঙালির কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া। ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ যে আসে সে কথা নবনীতার মতো এত সত্যি করে বলতে পেরেছেন ক’জন! বাবা-মায়ের জন্যই একটি স্বাধীন জীবন বেছে নিতে পেরেছিলেন নবনীতা। সে জীবনে বিশ্বখ্যাত প্রেমের সুবাস ছিল, হাসি আহ্লাদ সব ছিল আবার সংসার ভেঙে গেলেও নোবেলজয়ী প্রাক্তন স্বামী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য যোগসূত্রেরও কোনোদিন অভাব ছিল না। স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতাকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় না দিয়েও নবনীতা বারবার মুখ থুবড়ে পড়া জীবনকে শিখিয়েছেন ‘চলো লেট’স গো – বলেছেন, ‘অলরাইট কামেন ফাইট! কামেন ফাইট’। 

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে কবি-অধ্যাপক নবনীতা দেবসেন | ভিডিও সৌজন্যেঃ প্রেসিডেন্সি

তিনমাস বয়সে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়েছিলেন এই নাম। শিশুবয়সের নবনীতার জন্যই বাঙালি চেখে দেখতে পারল ঠাকুরবাড়ির উদ্ভব ‘কমলালেবুর পোলাও’ আর ছোটোবেলায় ঘুম পাড়াতে পাড়াতে নবনীতার কানে রাধারানিদেবী দিয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘তোমার সুর শুনায়ে, যে ঘুম ভাঙাও, সে ঘুম আমার রমণীয়’। এই কোমল সুরের মধ্যেও হয়তো মেয়ের মধ্যে মা দিয়ে গেছিলেন অদম্য জেদ ও অসম্ভব প্রাণশক্তি। তাই নবনীতা বলতে পেরেছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘সই’ শব্দের তিনটি অর্থ। স্বাক্ষর, সখী আর সহ্য করা। আর তারপরেই বারংবার জানিয়েছেন, “তিনটিই আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত, শুধু ‘সহ্য করা’টার সঙ্গে সই পাতাব না”। দুরারোগ্য ক্যানসারও তাঁকে দমাতে পারেনি একটুও। প্রাণোচ্ছল হাসি নিয়ে তাকেও তিনি শুনিয়ে দিয়েছেন, “এই যে এত লম্বা জীবনটা কাটালুম, তার একটা যথাযথ সমাপন তো দরকার! পাঁজিপুঁথি দেখে, শুভ দিন, শুভ লগ্ন স্থির করে, স্বজনবান্ধবকে নেমন্তন্ন খাইয়ে তবে তো শুভযাত্রা!” পথ যতই এবড়ো-খেবড়ো হোক না কেন, নবনীতা দেবসেনের সব যাত্রাপথই তাই তাঁর নিজগুণে শেষপর্যন্ত সত্য, মঙ্গল ও প্রেমময় হয়েছে। জন্মদিনের সকালেও আজ বহুদূর থেকে জীবনরসে পূর্ণ সেই নবনীতাই যেন আমাদের কাছে চেয়ে নেন আরও একবার, “সব আলো ফিরে দাও, সব রং, সকল উত্তাপ/ আমি সব বেঁধে নিয়ে আরেক আকাশে যাবো আজ।”

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার আর্কাইভ এবং ‘ভালোবাসার বারান্দা’

Developed by DXDasia