ভুলে থাকার কথা ছিল

শৈলেন মুখার্জির সুরে," আমার ভুবনে এত আলো, আর ‘কাজল রেখা যেন/ মোছে না আঁখি নীরে’ গেয়েছিলেন বিশ্বজিৎ

যাকে ভুলে থাকার কথার কথা ছিল, তেত্রিশ বছরের বেশী কেটে গেছে আমরা কথা রেখেছি শৈলেন মুখার্জিকে ভুলে থেকে।আজকে ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। H M Vতে ঢুকেছিলেন ট্রেনার হিসেবে। কতৃপক্ষের ভালোবাসার জোরাজুরিতে রেকর্ড করলেন নিজের গলায়,‘স্বপ্ন আমার ওগো সাতটি রঙের প্রজাপতির পাখা’ উল্টোদিকে ছিল ‘স্বাতীতারা ডুবে গেল।’ পরে আরো গান রেকর্ড করেন।উত্তম কুমারের বন্ধু ছিলেন, ওঁর সাথে দেখা হলেই উত্তমের ফরমায়েশ ছিল, ‘আকাশ নদীর বুকে নেমেছে’ গানটা গাইবার।

ছোটবেলায় নাকি এত দুষ্টু ছিলেন, দিদিকে লাথি মেরে বলতেন, বাবা অফিস যাবার আগে বলে ‘গেছেন’।১৯৫৯ সালে ওঁর সুরে আরতি'র বেসিক গান আছে ওঁর সুরে। আকাশ অনেক দূর তা জানি, উল্টোদিকে ছিল, কত ছন্দ ঝরা, কত গন্ধ ভরা। রম্যগীতি থেকে রবীন্দ্রনাথের গান সমস্ত জায়গায় নিজের পারদর্শিতা রেখেছেন।হৈমন্তী শুক্লার প্রথম রেকর্ড,‘এ তো কান্না নয় আমার’  H M V কে ওঁর জন্যে শৈলেন বললে ওঁরা বলেন এবছর রেকর্ড লিস্ট তৈরি।পুলক ব্যানার্জি আর শৈলেন মুখার্জি হিন্দুস্থান রেকর্ডে গিয়ে বললে, সে রেকর্ড হয়। বানী ঘোষাল ছিলেন শৈলেন মুখার্জির আত্মীয়া , যে বছর ওঁর সুরে বানী ঘোষালের রেকর্ড বেরোয়, বাড়িতে আনন্দের সুর বয়ে গেছিল।

যারা নির্মলা মিশ্রের ‘ও তোতা পাখিরে’নিয়ে উচ্ছ্বসিত তাঁরা কত জন ৫০ আর ৬০ এর দশকে সলিল, শৈলেন, নচিকেতা'র সুরে নির্মলা মিশ্রের আধুনিক গান শুনেছেন হাতে গুনে বলা যায়। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি বলতেন, হারমোনিয়ামের যে রিডে ওঁর আঙুল পড়ে সেখান থেকে সুর বেরোয়।

ইলা বসু থেকে বানী ঘোষাল প্রায় সবাই ওঁর সুরে গেয়েছেন।খুঁজলে অনেক গান তো পাওয়া যাবেই ইলা বসুর গাওয়া ওঁর সুর। তার একটার লিঙ্ক রইল

সত্যেন দত্তের একটা অসামান্য কবিতা ছিল, ওটা কে পিয়ানোর গান নাম দিয়ে শ্যামল মিত্রকে দিয়ে গাওয়ালেন শৈলেন মুখার্জি। আর একটা গানও ‘চামেলি তুই বল’ শৈলেন মুখার্জির সুরে সত্যেন দত্তের কথায় শ্যামল রেকর্ড করেন। রেডিওতে বার দুয়েক বাজানোর পর আর বাজানো হয়নি অজানা কারণে।

বানীচক্রে গান শেখাতেন, তার মুখ্য ছিলেন রবি দাশ। হঠাৎ একদিন ছুটি পাবার জন্যে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রটিয়ে দিলেন, আজ রবি’র জন্মদিন। সবাই ওঁকে ফুল মিষ্টি দিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে গেলে তিনি অপ্রস্তুত।আবার একদিন ইচ্ছে করে ওঁকে অপ্রস্তুত করার জন্য বলেছিলেন,এবার বানীচক্র মহিষাসুরমর্দিনী করবে। শিগগির গিয়ে যেন উনি দেখা করেন আকাশবাণীতে।ফল যা হবার তাই হয়েছিল। পিন্টু ভট্টাচার্যের প্রথম গানও ওঁর সুরে।

ভুলে থাকার কথা ছিল তোমারই, আমার তো নয়, মৃণাল চক্রবর্তীর গাওয়া গান,   শৈলেন মুখার্জির সুর। উল্টোদিকে ছিল, দু হাতে আর এনো না, কনক চাঁপার ফুল তুলি/ ভেবে মরি ফুল নেব কি নেব তোমার/ চম্পা কলি অঙ্গুলি।

মৃণাল বলেছিলেন,‘এত ভালো মেজাজের ছেলে গান- বাজনার জগতে খুব কমই দেখেছি।খানিকটা যেন শান্ত অধ্যাপকের চলাফেরা – কথাবার্তা।’
এই শান্ত অধ্যাপকই যখন সুর করেন,যাক যাক দিন যাক /রাত চলে যাক’

অবাক হতে হয়। বাংলা গানে এমন রক অ্যান্ড রোল শুনিনি আর।
ঐ আকাশ পাড়ে/ সুধায় ভরে,

রবীন্দ্রনাথের গানটা কী অনবদ্য গেয়েছিলেন। তাসের দেশ গীতিনাট্যের রাজপুত্র ছিলেন শ্যামল মিত্র আর সদাগরপুত্র ছিলে শৈলেন। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ট্রেনার হিসেবে কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যের জন্য। যে সময় সরাসরি সম্প্রচার হত সে সময় বাকীদের সঙ্গে যে নাম দুটো অবাক করে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে, তার একটা নাম পান্নালাল ভট্টাচার্য হলেই দ্বিতীয়টা শৈলেন মুখার্জি। ওঁরা দুজনেই আকাশবানীর সে অনুষ্ঠানে গাইতেন।

দোল গোবিন্দের কড়চা সিনেমাতে, আরতি মুখার্জিকে দিয়ে গাইয়েছেন, যদি কাছে ডাকো/ কথা দিতে পারি। কোনও দিন শুনলাম না আরতি এটা কোনও অনুস্ঠানে গাইতে ।

কোনও দিন শুনিনি টি ভি তে গাইছেন, নির্মলা মিশ্র, ধুসর গোধূলি আলপনা গেল এঁকে, মিল্টু ঘোষের কথায় সুর ছিল শৈলেন মুখার্জির।

রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সুমিত্রা সেনের গাওয়া বেসিক গান শৈলেন মুখার্জি'র সুরে আছে ।

যারা একটু খোঁজ রাখেন, জানেন অভিনেতা বিশ্বজিৎ সলিল এর সুরে গেয়েছিলেন, ‘যায় যায় দিন /বসে বসে দিন’ তিনিও শৈলেন মুখার্জির সুরে," আমার ভুবনে এত আলো, আর ‘কাজল রেখা যেন/ মোছে না আঁখি নীরে।’
দোলনা ছবিতে লতাকে দিয়েছিলেন,‘ আমার কথা শিশির ভেজা হাস্নুহানার কলি’ এই গানের অ্যারেঞ্জার ছিলেন দক্ষিণামোহন ঠাকুর, বিখ্যাত দিলরুবা বাদক, যিনি শৈলেনের শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়ও বটে ।

অদ্ভুত রসিক মন ছিল,দরকার না হলে ইংরিজি বলতেন না, ডাক্তারের সঙ্গে ইংরিজিতে কথা বলছেন দেখে পিন্টু ভট্টাচার্যকে অবাক হতে দেখে বললেন, ভাবছিস না রে, রক্তের সাথে কতগুলো ইংরিজি শব্দ বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, তাও বেরিয়ে যাচ্ছে। এমন বহু বাংলা গান আছে যাতে ওঁর নাম নেই, আমরা অন্যের নাম রয়েছে সুরকার হিসেবে। অবশ্য অফিসিয়াল যার নাম আছে এক্ষেত্রে সেটাই প্রামাণ্য। তবু সত্যের খাতিরে বলে রাখতে হয় তেমন একটি মান্না দে’র গাওয়া অসামান্য একটা গান যেটা উত্তমের লিপে ছিল, ওঁর সুর। ছবিতে কিন্তু অন্য একজনের সুরে রয়েছে।

মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়েসে ১৯৭৮ সালে প্রয়াত হন শৈলেন মুখোপাধ্যায়।

Developed by DXDasia