
১৮৬০ সালে মূলত ইংরেজি ফৌজদারি আইনের উপর ভিত্তি করে, ভারতীয় দণ্ডবিধি প্রবর্তিত হয়
ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল ভবন
একদিকে অভিনেতা রণবীর সিং-এর (Ranveer Singh) নগ্ন ফটোশুটের (nude photoshoot) বিরুদ্ধে সম্প্রতি মামলা দায়ের করেছেন মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট আইনজীবী বেদিকা চৌবে (Vedika Chaubey), অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জী (Partha Chatterjee) এবং তার সহযোগীদের আর্থিক তছরুপের অভিযোগে চলছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) -এর লাগাতার কার্যকলাপ। বর্তমানে এই ‘আর্থ-সামাজিক অপরাধ’-এর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াই করছি আমরা। কিন্তু ঠিক কখন, কীভাবে এই অন্যায়গুলি অপরাধে পরিণত হল? মানুষের মধ্যে এই অপরাধপ্রবণতার জন্ম হয় কীকরে? কোনটাকেই বা অপরাধ বলা বাঞ্ছনীয়? ইত্যাদি প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করার এর থেকে উপযুক্ত সময় আর কিই বা হতে পারে?
চলুন ফিরে যাওয়া যাক বেশ কিছু বছর আগে। ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ, ১৮৫৭ সাল। সবে মাত্র শেষ হয়েছে সিপাহী বিদ্রোহ। ভারতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দখল নিয়েছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রথম প্রথম ব্রিটিশ-ভারতীয় প্রশাসনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। এর আগে সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল ভারতের গভর্নর-জেনারেল (Governor-General of India) উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের (William Bentinck) হাত ধরে (১৮২৮-১৮৩৫)। ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে তিনি “the new spirit was cold, bureaucratic, optimistic and racially arrogant” নীতি অনুসরণ করেন।
১৮৬০ সালে মূলত ইংরেজি ফৌজদারি আইনের উপর ভিত্তি করে, ভারতীয় দণ্ডবিধি প্রবর্তিত হয়
সময় যতো এগোয় স্বাভাবিকভাবেই, আইনিব্যবস্থা ক্রমশঃ ইংরেজ নীতির আওতাধীন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ভারতের প্রধান প্রদেশ ছিল বাংলা, তাই নীতি এবং আইনের সংক্রান্ত যা কিছু পরীক্ষার কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে বাংলা। পরবর্তী দশকগুলিতে এভাবেই তৈরি হতে থাকে ‘অপরাধ’-এর বেশ কয়েকটি নয়া বিভাগ। এই বিভাগগুলির মধ্যেই পশ্চিমী মূল্যব্যবস্থার অধীনস্থ আর্থ-সামাজিক অপরাধ, এবং ‘অর্থনৈতিক অপরাধীর’ (economic offender) উত্থান দেখা যায়।
১৮৬০ সালে মূলত ইংরেজি ফৌজদারি আইনের উপর ভিত্তি করে, ভারতীয় দণ্ডবিধি (আই.পি.সি) প্রবর্তিত হয়। আজও আমরা এই নিয়মই মেনে চলি। এই বিধিতে খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, চুরি এবং ছিনতাই -এর মতো ‘ঐতিহ্যমূলক’ অপরাধকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি একটি নতুন কোডও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতদিন পর্যন্ত যে সমস্ত অসামাজিক আচরণ আইনের হাত থেকে পার পেয়ে যেতো, এই কোড তৈরি পর থেকে সেগুলি নিয়েও সচেতনতা গড়ে ওঠে। এই অপরাধগুলির মধ্যে নিহিত ছিল একাধিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য। আই.পি.সি (IPC) -এর অধ্যায়ে ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধের তিনটি মূল ধারা। প্রথমটি, “জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সুবিধা, শালীনতা এবং নৈতিকতাকে প্রভাবিত করে এমন অপরাধ” (offences affecting the public health, safety, convenience, decency and morals)। দ্বিতীয়, “ধর্ম সম্পর্কিত অপরাধ” (offences relating to religion) এবং তৃতীয়টি, “বিবাহ সম্পর্কিত অপরাধ” (offences relating to marriage)।

বর্তমান সি.আই.ডি হেড কোয়াটার
এর সবই যে ভারতীয় মূল্যব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর ছিল তা নয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সংস্কারগুলির সবচেয়ে ইতিবাচক ফলাফলগুলির মধ্যে একটি ছিল নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ। যেমন ধর্ষণ এবং কন্যাশিশু হত্যা, বা জনসমক্ষে “অশ্লীল গান গাওয়া এবং অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করা” -এর মতো অসস্তিকর আচরণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। যদিও এসবের পাশাপাশি এই নীতিতে এমন কিছু কাজও ছিল যা ভারতীয়রা অশোভন হিসাবে দেখলেও, শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করেনি। যেমন জনসমক্ষে প্রস্রাব করা বা স্নান করা, অথবা ভিক্ষা করা। কিন্তু আইনত এগুলিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত।
বলা বাহুল্য, এহেন আইনটি জনসাধারণ এবং আইন প্রয়োগকারীর (প্রাথমিকভাবে পুলিশ) মধ্যে তিক্ততা তৈরি করেছিল। কারণ আর্থ-সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব মূল্যব্যবস্থা না মেনে কীসে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা পাবে সে দিকেই নজর দেয়। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার আশেপাশের পাটকলগুলিতে শিশুশ্রম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ইউরোপীয় আবাদকারীরা উত্তরবঙ্গের (North Bengal) চা বাগানে আবদ্ধ শ্রমিকদের ওপর ভয়ানক অত্যাচার অব্যাহত রাখে।
আরও একটি অর্থনৈতিক অপরাধকে ঘিরে তৎকালীন সমাজ উত্তাল হয়ে ওঠে। নাম ‘রেন গ্যামলিং’ অর্থাৎ একধরনের জুয়া। ১৮৯৭ সালের ‘বেঙ্গল অ্যাক্ট’ জনসাধারণের নৈতিকতার ভিত্তিতে এই অপরাধ দমন করতে চায়। অনেক বছর আগে অভিবাসী মাড়োয়ারিরা প্রথম এই জুয়া খেলার প্রচলন করেন। কলকাতার বড়োবাজার এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল এ খেলা। বড়ো বড়ো উঠোন আছে এমন দুটি বা তিনটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল খেলাটি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর প্রতিদিন ধরা হতো বাজি। বাজি ধরে তখনই কেউ জয়ী হতে পারবে যখন বৃষ্টিপাতের পরিমাণে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারোর নির্দিষ্ট জলের ট্যাঙ্কটি উপচে পড়বে।
জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির জুয়া ধীরে ধীরে বাংলার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনসাধারণের অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে ভেবে পুলিশ ও প্রশাসন এই ধরনের জুয়া খেলা বন্ধের জন্য কঠোর নিয়ম জারি করে। যদিও এ সময়ে, রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবে (RCTC) ঘোড়দৌড়ের উপর বাজি রাখা বন্ধ করার জন্য কোনো নিয়মই লাগু করা হয়নি। ইউরোপীয় বণিকদেরই পাশাপাশি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটের অনেক সদস্যই অংশ নিতেন এই বাজির খেলায়। ফলে, বৃষ্টি জুয়ার বিলুপ্তির অন্তরালে RCTC-এর কাছে নিশ্চয়ই আরও কিছু কারণ ছিল, কেবলমাত্র ‘দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার’কে নিয়ে সরকারি উদ্বেগের কারণেই বেঙ্গল অ্যাক্ট প্রবর্তিত হয়নি নিশ্চয়ই।
‘হোয়াইট কলার’ অপরাধের উদাহরণগুলির মধ্যে একটি হল ১৯০৪-০৫ সালের দিকে, বাংলার তদন্ত বিভাগ অর্থাৎ সিআইডির সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ব্যাংক, ব্যাংক অফ বেঙ্গল এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সংযোগে প্রমিসরি নোট জালিয়াতির তদন্ত। প্রায় ১৪ জন ‘শিক্ষিত’ – এর এই দলে ছিল বেনারস এবং এলাহাবাদের দুই বাসিন্দা এবং ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গলের তিনজন কর্মচারী। তারা ১৯০০ থেকে ১৯০৪ সাল, এই চার বছরের মধ্যে খুবই চতুরতার সাহায্যে তিনটি ব্যাঙ্কের বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতির পাশাপাশি অজস্র মুদ্রা এবং নোট জালের মতো কাজ করে। এই অভিযুক্তদের মধ্যে ছয়জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। একজন জেলেই মারা যায়, অন্য একজনকে সম্পূর্ণ অর্থ এবং স্বীকারোক্তির বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং তিনজন ব্যাঙ্ক কর্মচারী সহ বাকিদের পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
এরপর আসা যাক আরও এক কুখ্যাত অপরাধী বামাপদ মুখার্জির (Bamapada Mukherjee) কথায়। হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে (Serampore in Hooghly District) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বিরোধের কারণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। কিছুদিন পর নদিয়া জেলায় (Nadia district) সন্ধান মেলে তাঁর। সেখানে মাদক সেবন এবং শান্তিপুর (Santipur) সহ কৃষ্ণনগরের (Krishnanagar) বেশ কয়েকটি জায়গায় পতিতাদের ডাকাতি করার অভিযোগে পুলিশ তাঁকে সন্দেহ করে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ১৮৮৮ সালে নদিয়া থেকে পালিয়ে যান বর্তমান বাংলাদেশের গোয়ালন্দতে (Goalondo)। সেখানে গিয়ে পুনরায় মানি অর্ডার জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাঁকে। কিন্তু বিচার চলাকালীন আবার জেল থেকে পালিয়ে যান বামাপদ।

রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব
এরপর থেকে দীর্ঘদিন ফেরার ছিলেন তিনি। ১৮৯৬ সালে রেলওয়ে রসিদ জালিয়াতির মামলায় ইউনাইটেড প্রভিন্সে (আজকের উত্তরপ্রদেশ) আবার গ্রেফতার এবং সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯০২ সালে আবারও রেলওয়ে রসিদ জালিয়াতির মামলায় বিহারের সরান জেলায় গ্রেপ্তার হন বামাপদ মুখার্জি, কিন্তু জামিনে ছাড়া পেয়েই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। পরবর্তীতে, কখনোও মারাঠা বণিক, কখনোও উপদেশীয় ব্যবসায়ী, কখনোও বা মুসলিম ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে, বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২২টি মতো জালিয়াতির কাজে যুক্ত থেকেছেন। পাশাপাশি তখনকার দিনের হিসেবে ২০,০০০ টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছিলেন বামাপদ। অবশেষে ১৯০৭ সালের ৩ নভেম্বর বেঙ্গল ও পাঞ্জাব সি.আই.ডি-র যৌথ প্রচেষ্টায় বর্তমান মধ্যপ্রদেশের রাতলামে বামাপদ মুখার্জিকে গ্রেফতার করা হয়।

এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের প্রাথমিক হেড অফিস
আরও একজন উল্লেখযোগ্য অপরাধী ছিলেন মন্মথ নাথ মৈত্র (Manmatha Nath Moitra)। জানা যায়, শ্রীরামপুরের ধনী গোঁসাই পরিবারের (Gossain family) সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এই ব্যক্তি। কুখ্যাত প্রতারকদের একটি গ্যাংয়ের প্রধান মন্মথ নাথ মৈত্র। ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা প্রায় ১৭টির মতো মামলায় জড়িয়ে পড়েন।কিন্তু সবকটি ক্ষেত্রেই “যথেষ্ট প্রভাব” খাটিয়ে বেকসুর খালাস হয়ে যান।
সম্ভবত প্রতারকদের এই তালিকার মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ছিলেন আনন্দমোহন রায় (Ananda Mohan Roy)। প্রতিষ্ঠিত এবং সচ্ছ্বল জমিদার পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (Calcutta University) থেকে পাশ করেন স্নাতক ডিগ্রি। ১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে কোনো এক সূত্রে খবর পেয়ে তাঁর টালিগঞ্জের (Tollygunge) বাড়িতে অভিযান চালায় বেঙ্গল সি.আই.ডি (Bengal CID)। উদ্ধার হয় জাল নোট তৈরি করার সরঞ্জাম সহ প্রচুর পরিমাণে সমাপ্ত এবং অর্ধ-সমাপ্ত হাজার টাকার জাল নোট। বিচার চলাকালীন, আত্মপক্ষ সমর্থনে তাঁর মানসিক অস্থিতিশীলতার প্রমাণ পেশ করা হয়, যা বিচারক গ্রহণ করেন।
নৈতিক পুলিশিং (Moral policing); তথাকথিত শিক্ষিত এবং ধনী অপরাধীদের দুর্নীতি এবং প্রতারণা থাকা সত্ত্বেও তারা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে আদালতে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। এ প্রথা আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগেও বহুল প্রচলিত ছিল। যতোই বলা হোক যে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু আদপে সবকিছু একই আছে।
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।
