মেরিকামায়া সাতকাহন : মুক্তি, আমি আর আমাদের ছোট্ট মেয়ে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখোমুখি

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪

নিউ ইয়র্কে চায়নাটাউনের রাস্তায় প্রচারপত্র বিলি করছেন ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃতীয় পর্বের পর

দূরে হিউয়েট আর ম্যানচেস্টার রেসিডেন্স হলের বিরাট বিরাট উঁচু বাড়িগুলোয় আলো জ্বলে। সাতাশতলা উঁচু ডর্মিটরি ওয়াটার্সন টাওয়ার্সের মাথায় লাল সতর্ক আলো দপদপ করে। এখানকার আকাশ কেমন যেন অতিরিক্ত স্বচ্ছ। কোথাও কোনো ধূলো নেই। রাতের আকাশের তারাগুলো যেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল। মাঠের দিগন্তবিস্তৃত ঘাসের লনগুলো যেন কেমন অতিরিক্ত সবুজ। অল্পবয়েসী টিনএজার আমেরিকান ছাত্রীরা কেমন যেন অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবতী। মিডওয়েস্ট ইলিনয়ের কর্নবেল্টের ধনী পরিবারের আদুরে মেয়ে। আমার স্টুডেন্ট কয়েকজন আছে এসব ফ্যামিলি থেকে আসা। ওই লিজ, ওই স্যামান্থা, ওই ডন, ওই ক্যারেন। শ্বেতাঙ্গ যুবতীদের গায়ের রং যেন অতিরিক্ত সাদা, আর তাদের ঢলঢল বুক যেন মোমের মতো মসৃণ, বাতাবি লেবুর মতো গোল। ফল সিমেস্টারে শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই অনেক সময় কেটেছিল। তাদের রঙিন হালকা হালকা বড়ো বড়ো জামা। খোলা হাত, খোলা পা, ঊরুর অনেকটা উপর পর্যন্ত তোলা আলগা আলগা শর্টস। ছেলেরাও তাই। টি শার্ট আর শর্টস। প্রায় প্রত্যেক যুবতীরই সঙ্গে এক যুবক সঙ্গী। কেউ বয়ফ্রেন্ড, কেউ বা এক হাই স্কুল থেকে পড়তে আসা বন্ধু কাম দেহরক্ষী।

আমার মতো বিদেশী গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট আর টিচিং এসিস্টেন্টদের প্রতি তাদের মনোভাব কিছুটা রেসপেক্ট, কিছুটা অনুকম্পা, কিছুটা উদাসীনতা, আর কিছুটা ওপর-ওপর ছুঁয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব। দেখা হলে পাশ কাটিয়ে যাবার সময়ে একটু হালকা হাসি, আর “হাই দেয়ার।” আমাদের সঙ্গে তারা বেশি মিশতে চায় না। ডেট করতে চায় না নব্বই পঁচানব্বই শতাংশ ছেলেমেয়ে। সেক্সুয়াল স্বাধীনতা খুব বেশি, কিন্তু ভারতীয়রা — অন্তত আমার মতো শ্রেণী থেকে আসা ভারতীয়রা — এসব ব্যাপারে খুবই অনগ্রসর। আবার অতি-অগ্রসর ছেলেও আছে। পুণে থেকে আসা নরেন্দ্র । কংগ্রেসের লিডার ছিল দেশে। বিগ শট। পুরোনো একটা মার্সিডিজ গাড়ি কিনেছে এখানে এসেই। ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে একাধিক মার্কিনি যুবতী গার্লফ্রেন্ড। শ্রীলংকার দু একটা ছেলে। অতি খলিফা। কে বলবে, তারা পঁচাশি সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা ছাত্র? তারপর আছে ক্যারিবিয়ান থেকে আসা ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ্যানড্রিয়া, আর তার সঙ্গী বিশালাকৃতি অরুণ, আর সব কে কে যেন। উদ্দাম নাচ ডর্মের রাতের পার্টিতে। আমাকেও নিয়ে গেছে দু একবার। আলোছায়ার খেলা। উদ্দাম কানফাটানো মিউজিক। আমি মাঝপথে একা বাড়ি ফিরে এসেছি।

আই এস ইউ স্টুডেন্ট ডর্ম

কয়েকজন সুন্দরী মার্কিনি যুবতী আমার খুব কাছে এসে তাদের উত্তাপ দিয়ে আমাকে দ্রবীভূত করার চেষ্টা করেছে। তাদের গায়ের মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ আমাকে মাতাল করেছে। আর তারপরে মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যবিত্ত সংস্কার আমাকে ফ্রোজেন করে দিয়েছে। মোহময়ী স্যারা আমার সঙ্গে স্টুডেন্ট ক্যাফেটেরিয়ায় কাপডিশ ধুতেধুতে আমাকে অনেক প্রশ্ন করেছে। দুর্বলতা, কোমলতা দেখিয়েছে। কফি খেতে, পিৎজা খেতে নিয়ে গেছে। তারপর আমি ওকে ওর ডর্ম ওয়াকার হলে পৌঁছে দিয়েছি। ওর চোখের তারা আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেই আবার নিভে গেছে। অ্যান আর লিসা তাদের চার্চে আমাকে নিয়ে গেছে। সানডে বাইবেল স্কুলেও নিয়ে গেছে। কিন্তু খ্রীষ্টের প্রতি আমার উদাসীনতা দেখে হতাশ হয়েছে।

আমি একা। ভীষণভাবেই একা।

চট্টগ্রামের আবু হায়দার বিরাট ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে — শুনেছি ওখানে ওদের গাড়ির কারখানা আর শোরুম আছে, কলকাতা থেকে আমার সঙ্গে পড়তে আসা উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়ে সুনীতা, আর আমার রুমমেট সায়েন্স কলেজে আমার দুতিন বছরের জুনিয়র রঞ্জন গুপ্ত — এই তিনজন মাত্র এখানে বাঙালি। ছোট্ট স্কুল আই এস ইউ। নরম্যাল-ব্লুমিংটন টুইন সিটির নরম্যাল অংশে ইউনিভার্সিটি। ব্লুমিংটনে কদাচিৎ যাওয়া হয়।

মুক্তি এসে পৌঁছলো শিকাগো ও’হেয়ার এয়ারপোর্টে। বিরাট ভারী সুটকেস, আর শাড়ি পরা বাঙালি মেয়ে। একবছর দেখিনি ওকে। আমরা দুজনই নির্বাসিত ছিলাম। আমি আমেরিকায়, ও কলকাতায়।

স্প্রিং সিমেস্টারে আলাপ হলো কেরালার ইয়ং ডাক্তার রবি কাটুর ও তাঁর স্ত্রী রাধার সঙ্গে। আমার একাকীত্ব দেখে ইউনিভার্সিটিতে কথা বলে তাঁদের হোস্ট ফ্যামিলি হবার ব্যবস্থা করে দিলো আমার জন্যে। অর্থাৎ, বিদেশ বিভূঁইয়ে তাঁরা আমার দেখাশোনা করবেন স্বেছায়। দু চারবার ওঁদের ব্লুমিংটনের বাড়ি গেলাম ওঁদেরই বদান্যতায়। সদাশয়, শিক্ষিত ফ্যামিলি। সত্যজিৎ রায় আর রবি ঠাকুরের ভক্ত। বাংলা গান আর বাংলা সিনেমার ভক্ত। আমাকে গান গাইতে হলো বেশ কয়েকবার তাঁদের অনুষ্ঠানে। বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়ি। বিশাল গাড়ি। কখনো এতো বড়ো বাড়ি দেখিনি। এতো বড়ো স্ক্রীনের টিভিও দেখিনি। সেই টিভিতে ভিডিও ক্যাসেট চালিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখা। গৌতম ঘোষের “পার”। নাসিরুদ্দিন শাহ, ওম পুরী, শাবানা আজমি। হাসি, গল্প, খাওয়াদাওয়া হয়তো দুসপ্তাহে একদিন।

কিন্তু, তাও আমি একা। ভীষণভাবেই একা।

ছিয়াশির অগাস্টের গোড়ায় মুক্তি এসে পৌঁছলো বিশ্বদার স্পন্সরশিপে। আর, আমাদের ডিপার্টমেন্টের মালয়ালি খ্রীষ্টান প্রফেসর ডক্টর নাডাকাভুকারেনের পাঠানো এক আমন্ত্রণে। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে ডিপার্টমেন্টকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, পার্থ লেখাপড়ায় ও কাজে আরো অনেক বেশি সাফল্য লাভ করতে পারবে, যদি সে তার স্ত্রীকে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারে। এক বছরেই আমি বোধহয় আমার বায়োলজি প্রফেসরদের কিছুটা ইমপ্রেস করতে পেরেছিলাম আমার ভাঙা ভাঙা ইংরিজি দিয়ে, ও রাত জেগে ল্যাবে কাজ করার বাসনা ও পরিশ্রম দেখিয়ে। মুক্তি এসে পৌঁছলো শিকাগো ও’হেয়ার এয়ারপোর্টে। বিরাট ভারী সুটকেস, আর শাড়ি পরা বাঙালি মেয়ে। একবছর দেখিনি ওকে। আমরা দুজনই নির্বাসিত ছিলাম। আমি আমেরিকায়, ও কলকাতায়।

আর, তারপরে আমাদের মেয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো সাতাশি সালের জুলাই মাসের ভীষণ গরমের মধ্যে। সেই একই ইলিনয়। সেই একই শিকাগো। সেই একই নরম্যাল। জুলাই আর আগস্ট মাসে সেখানেই কী ভীষণ গরম! টেম্পারেচার চল্লিশ ডিগ্রি। ফারেনহাইটে একশো পেরিয়ে যাওয়া ঝাঁ ঝাঁ কান পোড়ানো গরম। সেখানেই, মেয়ে হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায়, মুক্তির পোস্ট-পার্টাম জটিলতা দেখা দিলো। সম্পূর্ণ ডাক্তারের গাফিলতিতে। মায়ের প্রাণসংশয়। এক সপ্তাহের এতটুকু ছোট্ট, পুতুলের মতো মেয়ে এখন মাকে হারাতে বসেছে।

মার্কিন হাসপাতালে, মার্কিন শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারের হাতে সন্তানপ্রসবের সময়ে চরম অবহেলা। আনক্লিন প্ল্যাসেন্টায় কয়েকদিনের মধ্যেই ভয়ঙ্কর ইনফেকশন। অস্বাভাবিক রক্তপাত। মুক্তিকে এক্ষুণি জরুরি অপারেশন করতে হবে। হয়তো ও বাঁচবে। হয়তো ও বাঁচবে না। আমরা যদি বিদেশি ও কৃষ্ণবর্ণের না হয়ে, দরিদ্র ছাত্র না হয়ে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিক হতাম, এতো অবহেলা কি করা হতো? আজকে এতকাল আমেরিকায় থাকার পরে মনে হয়, একেবারে কোর্টে বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবী করে মামলা করার কেস। আমরা কিছু করিনি। কেউ আমাদের বলে দেয়নি। পরামর্শ দেয়নি। ওই হোস্ট ফ্যামিলির সুখী সুখী রবীন্দ্রসঙ্গীত-প্রেমিক, সত্যজিৎপ্রেমিক ডাক্তার ও তাঁর স্ত্রী বলতে পারতেন। পরামর্শ দিতে পারতেন। ওঁরা অনেক আইনজীবীকে চিনতেন। ভারতীয়দের মধ্যেই ছিলেন আইনজীবী। কিন্তু স্কুলের বিরুদ্ধে যাবার সৎসাহস তাঁরা দেখাননি। আমাদের পাশে এসে দাঁড়াননি।

মুক্তির বাবা হয়তো সেই পুরোনো টেবিলটায় রেখে তাঁর প্রিয় গণশক্তি পড়ছেন। ওর মা রান্না করছেন, আর মাসির সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করছেন। এখন সে গল্পের সবটাই মেয়ে ও নাতনিকে ঘিরে।

সে রাতে ব্রকো হসপিটালের সেই আধো-অন্ধকার ঘরটায় আমার মাত্র আট দিনের বাচ্চা ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, মুক্তি যদি আর ফিরে না আসে, এই ফুলের কুঁড়ির মতো মেয়েটাকে নিয়ে আমি কী করবো? কোথায় যাবো? অনেক সঙ্কট পেরিয়ে সবকিছু পিছনে ফেলে রেখে আমেরিকায় এসেছি। কত ঝুঁকি, কত ফেলে আসা জীবন — ভালোবাসা, স্নেহ, পরিবার, বন্ধু, সমাজ। সব ফেলে রেখে এক নির্জন, প্রত্যন্ত, নির্বাসিত জীবন। একটু একটু করে আবার স্বাভাবিক, সুন্দর হতে শুরু করেছিল সবেমাত্র। ভয়ঙ্কর শীতের বরফ গলতে শুরু করেছিল সবেমাত্র।

আবার সবকিছু চিরকালের মতো শেষ হয়ে যাবে? জীবনের সব রং হারিয়ে যাবে চিরতরে?

কলকাতায় সবাই এখন দিনের বেলা নানা কাজ করছে। রোদ, সূর্য, আলো। বাংলা নামে দেশ। হাওড়ার সেই সরু গলিটায় বাচ্চারা দৌড়োচ্ছে, ডাংগুলি খেলছে। সাইকেল রিকশা অতি সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে প্যাঁক প্যাঁক হর্ন দিয়ে। দোকান, বাজার, হাওড়া ব্রিজের নিচেটায় সেই রোজকার মতো ট্র্যাফিক জ্যাম। লোকাল ট্রেনগুলো একে একে লম্বা লম্বা ইলেকট্রিক আঁকশিগুলো দিয়ে মাথার ওপরের তার ছুঁয়ে ছুঁয়ে স্টেশনে এসে থামলো। জনস্রোত। জীবনসংগ্রামের সেই আশ্চর্য সুন্দর ছবিটা।

বাংলাদেশ। ভারতবর্ষ। কলকাতা। রোদ, সূর্য, আলো। বাংলা নামে দেশ।

মুক্তির বাবা হয়তো সেই পুরোনো টেবিলটায় রেখে তাঁর প্রিয় গণশক্তি পড়ছেন। ওর মা রান্না করছেন, আর মাসির সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করছেন। এখন সে গল্পের সবটাই মেয়ে ও নাতনিকে ঘিরে। নাতনি এসেছে। নিশ্চয়ই কিছুদিনের মধ্যেই মেয়ে নাতনিকে নিয়ে আসবে দাদু দিদার কাছে।

আর এখানে, মুক্তি, আমি, আর আমাদের ছোট্ট মেয়ে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখোমুখি।

জটিল অস্ত্রোপচার চলছে এখন। কেউ জানে না। কেউ জানে না।

(চলবে…)

 

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে শুরু হল ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

Developed by DXDasia