মেরিকামায়া সাতকাহন : অপমানে গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠলো নিঃশব্দ প্রতিবাদ

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩

ইমিগ্রান্ট ওয়ার্কারস ফ্রিডম রাইড-এ ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

গত পর্বের পর

মি নির্বাসিতের জীবন যাপন করি। এক বছর এভাবে কাটলো। সারাদিন ক্লাস করি। সপ্তাহে দু’দিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের ল্যাবরেটরির ক্লাস নিই। বাড়ি এসে যা হয় কিছু খাই। খাওয়ার কোনো ঠিক নেই। প্রথম সিমেস্টারে পোট্যাটো চিপস দিয়ে ভাত খেতাম। রান্না করতে জানতাম না তো কী আর খাবো? দেশে আমাদের মতো ফ্যামিলিতে ছেলেরা কখনো রান্না করতে শেখে না, আর তাদের কোনো ধারণাও নেই রান্না কীভাবে হয়। দু’বেলা খাবার সময়ে লাঞ্চ ডিনার সামনে এসে হাজির হয় – তা সে মোগলাই খানাই হোক, আর নয়তো ভাত ডাল সবজি ভর্তা। ছেলেরা কেউ কখনো জানতেও চায় না এই রান্নাগুলো কেমন করে হলো। দু’চারজন ব্যতিক্রম থাকতে পারে, কিন্তু এই হলো ‘নর্ম’, অর্থাৎ সাধারণ প্রথা। সুতরাং, আমি রান্না জানি না। কোনোরকমে ভাত রাঁধতে পারি – এক মাত্র।

আমাদের সঙ্গে থাকে তামিল ছেলে ভরত। বড়োলোকের বখাটে ছেলে। বাপের টাকায় আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে এসেছে – অভাবনীয় আমাদের কাছে। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ। অনেক সময়ে ভরত একেবারে উলঙ্গ হয়ে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকে, আর ভয়ঙ্কর ঝাল মাংস রাঁধে। আর কেমন করে যেন হাসে। বিচ্ছিরি লাগে আমার। আমি এসব অশ্লীলতা কখনো দেখিনি। ওর হাসির মধ্যে কী যেন একটা কামার্ত ভাব আছে। ওর ঘর রুমমেট এডগার রাতে ছেড়ে দেয় মাঝেমাঝে, আর একাধিক মেয়ে এসে ওর ঘরে থাকে। এডগার তখন শুয়ে থাকে আমাদের বসার ঘরে সোফার ওপরে।

বুড়ির ধারণা, আমরা ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টরা সব কামুক, ড্রাগ অ্যাডিক্ট, মাদকাসক্ত। শোবার ঘরের দরজায় আমাদের কোনো খিল নেই। চাবি লাগানোর ব্যবস্থা নেই। আমরা ইন্ডিয়ান আর বাঙালিরা অতিবিনয়ী। নিজের অধিকার নিজেরা দাবি করতে শিখিনি। ঘরে চাবি দিতে পারবো না কেন আমরা?

আমাদের বাড়িওয়ালি ছিয়াশি বছরের মিসেস হ্যারিসন। কিন্তু বুড়ো হলে কী হবে, সবদিকে নজর। মাঝে মাঝেই উপরে উঠে এসে আমাদের বলে, “গট আ গ্যাল ল্যাস্ট নাইট, ডিডন্ট ইয়া?” তারপর গম্ভীর হয়ে আবার নিচে চলে যায় বুড়ি। বুড়ির ধারণা, আমরা ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টরা সব কামুক, ড্রাগ অ্যাডিক্ট, মাদকাসক্ত। শোবার ঘরের দরজায় আমাদের কোনো খিল নেই। চাবি লাগানোর ব্যবস্থা নেই। সেই নিয়ে আমাদের আর এক রুমমেট ইথিওপিয়ার ছেলে আবাবা কাবাডা সবসময়ে বিরক্ত। বিরক্ত হবারই কথা। আমরা ইন্ডিয়ান আর বাঙালিরা অতিবিনয়ী। নিজের অধিকার নিজেরা দাবি করতে শিখিনি। ঘরে চাবি দিতে পারবো না কেন আমরা?

গোয়ানিজ ছেলে এডগার। সেও বিরাট বড়োলোকের ছেলে, সেও বাপের টাকায় আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে এসেছে। তবে ভদ্র আর মিশুকে। ভরত, এডগার এরা দুজনেই ভারতবর্ষ থেকে আমেরিকায় পড়তে এসেছে বাপের পয়সায়। যা আমার পক্ষে কল্পনা করাই সম্ভব নয়। আমাকে আরো দুটো ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাডমিশন দিয়েছিলো। ওহায়োর কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে লিখেছিলো, আমি যদি একটা সিমেস্টার নিজের খরচে পড়ি, তাহলে নিশ্চয়ই সেই সময়ের মধ্যে আর একবার টোয়েফল পরীক্ষা দিয়ে আমি অনেক ভালো রেজাল্ট করতে পারবো, আর তখন ওরা আমাকে টিচিং ফেলোশিপ দিতে পারবে। আমি তার উত্তরে লিখেছিলাম, এক সিমেস্টার কেন, একটা দিনও আমি ইউ এস এ’তে নিজের খরচে থাকতে পারবো না। আর এই দুটো কুড়ি একুশ বছর বয়েসের ভারতীয় ছেলে নিজের ফ্যামিলির টাকায় পড়তে এসেছে। প্রতি মাসে পড়াশুনো, থাকা-খাওয়া, বইপত্র ও অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে চার-পাঁচ হাজার ডলারের মতো তো হবেই! আমাদের সে সময়কার হিসেবে মাসে হয়তো পঞ্চাশ হাজার টাকা। আমি এদেশে এসেছি আমার আর মুক্তির সমস্ত জমানো টাকা নিঃশেষ করে দিয়ে, এগারো হাজার টাকা দিয়ে ওয়ান-ওয়ে প্লেনের টিকিট কিনে। ফিরে যেতে চাইলেও ফিরে যাবার আর কোনো উপায় নেই।

ফলে সিমেস্টারে পড়ার ফলও অতি খারাপ হলো। ভীষণ ঠান্ডা লেগে, আর প্রায় না খেয়ে থেকে অসুখ করলো। তিনদিন স্টুডেন্ট ইনফার্মারিতে কাটালাম। যেসব কোর্স নিয়েছিলাম পড়ার জন্যে, তার একটা ছেড়ে দিতে হলো। ল্যাবের ক্লাস নিতে গিয়ে ইংরিজি বলতে না পারা, আর ভুল উচ্চারণ করার জন্যে অল্পবয়েসী আমেরিকান ছেলেমেয়েদের ব্যাঙ্গাত্মক উক্তি ও হাসি শুনতে হলো। কান লাল হয়ে গেলো অপমানে। গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে উঠলো একটা নিঃশব্দ প্রতিবাদ। মনের যখন এই অবস্থা, আর শরীরের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ, তখন ঠিক করলাম দেশে ফিরে যাবো। ঠিক সেইসময়েই বিশ্বদার আবির্ভাব দেবদূতের মতো, সঙ্গে দূতী রেবেকা, এবং দেবকন্যাদুটি।

শিকাগো ভ্রমণ, রান্না ও গাড়ি চালানো শেখা, এবং স্প্রিং সিমেস্টারের শুরুতে ফিরে গিয়ে ইন্ডিয়ান ও মার্কিন স্টুডেন্ট বন্ধু-বান্ধবীদের বাঙালি রান্না খাইয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া।

বিশ্বদা বললো, “তুমি দেশে ফিরে যাবে? এতো কষ্ট করে গরীবের ঘর থেকে নিজের চেষ্টায় এসেছো, এর মধ্যেই ফিরে যাবে?”

আমি বললাম, “কী করবো বিশ্বদা? এতো ঠাণ্ডা, আর এতো পড়ার চাপ আর নিতে পারছি না। শরীর ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু ফিরবোই বা কী করে? টাকাই তো নেই। ফিরে যেতে গেলেও তো এক হাজার ডলার প্লেন ফেয়ার লাগবে।”

বিশ্বদা বললো, “ওকে, সে তুমি ভেবে দেখো। কিন্তু টাকা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি তোমাকে দেবো। কিন্তু একবার ফিরে গেলে আর কখনো আসতে পারবে না। তোমার কনফিডেন্স নষ্ট হয়ে যাবে।”

এখনো মনে আছে বিশ্বদার সেই কথা। প্রাকটিক্যাল কথা। মেদবর্জিত কথা। বাস্তব কথা। সবচেয়ে যেটা বেশি সাহস দিয়েছিলো, তা হলো ওই টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেবে বলেছিলো দরকার হলে। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ অসহায়, ডেসপারেট অবস্থা আর থাকলো না। মনের জোর ফিরে এলো আবার।

ওদিক থেকে মুক্তিও বারবার করে বলছিলো ফোনে। “এতো কষ্ট করে, এতো সংগ্রাম করে এই যোগ্যতা, সাফল্য অর্জন করেছো। ফিরে এসো না।”

ডিপার্টমেন্ট থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন চারদিক নিস্তব্ধ, শুনশান। আকাশের তারাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকায়। বলে, “কী, কেমন লাগছে আমেরিকার স্বর্গ? কত ধানে কত চাল, বুঝেছো তো এবার?”

শীতের শেষে প্রকৃতিদেবীও একটু হাসলেন। আর সরস্বতী দেবীও।

পড়াশোনাতে সাফল্য এলো। ভারতের নিষ্ঠুর, নির্দয়, শাস্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যর্থতার যে ক্ষত থেকে এতকাল রক্ত ঝরছিল চুঁইয়ে চুঁইয়ে, আমেরিকার এক অজানা জায়গার এক অজানা স্কুলের অধ্যাপকবৃন্দের স্নেহচ্ছায়ায়, উৎসাহে, প্রশংসায় তাতে একটু প্রলেপ পড়লো। সঠিক চিকিৎসা হলো এতদিনে। মনটা একটু একটু করে ভালো হতে শুরু করেছিল আবার।

থেকে গেলাম আমেরিকায়। দেশে ফিরে আর যাইনি।

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিন্তু তাও, দ্বীপান্তরের আসামির মতো দিন কাটে। ফেল্মলি হলে বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধান দরজা আর আমার ল্যাবের দরজার চাবি আমার কাছে থাকে। রাত্তিরবেলা পড়াশোনা আর পেপার করার জন্যে ফিরে যাই আবার। তিনতলায় আমাদের ল্যাব আর অফিস। ওয়াক্স করা ঝাঁ চকচকে হলের, বারান্দার মেঝে, মাছি পড়লে পিছলে যাবে। ইনক্যান্ডেসেন্ট আলো জ্বলে। রাত বারোটা, একটা, দুটো। আমি আমার ল্যাবে কাজ করছি মাইক্রোস্কোপের নলে চোখ রেখে। কিংবা, কম্পিউটার রুমে ডক্টর অ্যান্ডার্সনের ইকোলজি পেপার লিখছি। জীবনে কম্পিউটার চোখেই দেখিনি। আর এখানে আসার দশ বারোদিনের মধ্যেই কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখে পেপার লিখে স্ট্যাটিসটিক্স করে জমা দিতে হবে। প্রথম টার্ম পেপার। টার্ম পেপার কাকে বলে, কলকাতায় জানতামনা। শিখিনি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় টার্ম পেপার ছিলোনা।

কাজ শেষ হলো। ক্লান্ত লাগছে। বাড়ি ফিরবো। কাছেই দশ মিনিটের হাঁটা পথ। ডিপার্টমেন্ট থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন চারদিক নিস্তব্ধ, শুনশান। আকাশের তারাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকায়। বলে, “কী, কেমন লাগছে আমেরিকার স্বর্গ? কত ধানে কত চাল, বুঝেছো তো এবার?”

ফেল্মলি হল থেকে আমাদের কিংসলি স্ট্রিট – ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ধনাঢ্য, সাজানো ক্যাম্পাসের মাঝখানে চেরি, মেপল, অ্যাশ, পপলার, বার্চ গাছে ঘেরা চত্বর – কোয়াড । জনশূণ্য এখন। দিনের বেলা সুবেশা, সুন্দরী মার্কিনি যুবতী ও স্বাস্থ্যবান যুবকদের ভিড় আর হাসিঠাট্টায় মুখর হয়ে থাকে। সেখানে আমার প্রবেশাধিকার নেই। আমি গরিব বাঙালি ছাত্র। বয়সও ওদের চাইতে অনেক বেশি। আমি ঊনত্রিশ বছর বয়েসে ঝুঁকি নিয়ে, ঝোঁকের মাথায় আমেরিকায় চলে এসেছি বাংলার মাটি জল ভালোবাসা আর কবিতার মায়া কাটিয়ে। আমি ওদের সঙ্গে মিশতে পারি না। আমি ভালো ইংরিজি বলতে পারি না। আমি ওদের সঙ্গে বারে গিয়ে ড্রিংক করতে পারি না। আমি ডর্মগুলোর উদ্দাম উইকেন্ড পার্টিতে গিয়ে ওদের সাথে নাচতে পারি না। আমি আমাদের ইন্ডিয়ান ধনী পরিবারের আন্ডারগ্রাজুয়েট ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গেও তাল মিলিয়ে মিশতে পারি না। ওরা রাজনীতির আলোচনা করে না। কবিতা, অল্টারনেটিভ ফিল্ম বোঝে না। সব ভীষণ রকম ক্যাপিটালিস্ট। অর্থ ও সম্পদ ওদের জীবনের ব্রত। রঙিন ম্যাগাজিনে ঝাঁ চকচকে গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখে ভরত আমাকে বলে, “বুঝলে, এই রকম গাড়ি আমি কিনছি আর কয়েক বছরের মধ্যেই। কেমন, ভালো না? আই থিঙ্ক ইট’স সোয়েল।” বাড়ি, গাড়ি, ধন, সম্পদ, শেয়ার বাজারে মুনাফা। ওরা দেশকে যে চোখে দেখে এসেছে, আমি সে চোখে দেখিনি। আমি উত্তর কলকাতার ধূলিধূসর গলি থেকে উঠে আসা ছেলে। আমি সুন্দরবনের এক অতিপ্রত্যন্ত গ্রামের কলেজে চার বছর পড়িয়ে আসা, দারিদ্র্যের সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলা ছেলে। আমার মা ক্যানসারে মারা গেছে বিয়াল্লিশ বছর বয়েসে বলতে গেলে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই। আমার জীবনদর্শনের সঙ্গে ওদের মেলে না। আমি উদ্দাম ‘ফান’ করতে পারি না। আমি ডেট করতে শিখিনি ওদের মতো।

তাছাড়া, আমি এখন বিবাহিত। দেশে পড়ে রয়েছে আমার স্ত্রী। সে আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে।

(চলবে…)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে শুরু হল ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

Developed by DXDasia