মেরিকামায়া সাতকাহন : বন্ধুহীন, আত্মীয়হীন সুদূর আমেরিকায়

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১

মার বৌ মুক্তিকে এইমাত্র ওরা নিয়ে গেলো সার্জারি ওয়ার্ডে। স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে গেলো অপরিচিত কয়েকজন মহিলা। নার্স। তাদের মাথায় অপারেশন থিয়েটারের ক্যাপ। পরনে সার্জিক্যাল রোব। তাদের চোখে জরুরি অবস্থার ভাব। ভীষণ, ভীষণ সিরিয়াস।

মুক্তি সম্পূর্ণ অচেতন। ও জানে না কী হচ্ছে। জানি না ওকে আর দেখতে পাবো কিনা।

স্ট্রেচারের কাঠামোতে লাগানো স্টিলের রড থেকে নানারকম রবারের নল ওর নাকে মুখে হাতে পায়ে লাগানো। ব্লাড, স্যালাইন, আরও সব কী কী। ওর জ্ঞান নেই। চোখ বন্ধ। পালস্‌ নেমে গেছে তিরিশে, নাকি আরো কম। ভীষণ কম। মৃত্যু আর জীবনের সন্ধিক্ষণে থাকলে যেমন হয়, ঠিক তেমন। ডক্টর প্যাটেলের মুখ দেখে মনে হলো, পালস্‌ পাচ্ছেন না উনি। অনেকক্ষণ ধরে দেখার পর যেন একটু পাওয়া গেলো। তারপর একটা মেশিন দিয়ে আবার দেখলেন। ওঁর মুখটা কেমন যেন হয়ে গেলো। গম্ভীর হয়ে গেলেন খুব। আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি। অজানা আশংকায় আমার বুকটা ওঠানামা করছে।

ওর মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। বিবর্ণ, রক্তশূণ্য। ওকে কখনো এমন অবস্থায় দেখিনি আমি। আমার বান্ধবী মুক্তি। আমার স্ত্রী মুক্তি। আমার মেয়ের মা মুক্তি। প্রাণোচ্ছ্বল। আমার ভয় করছে ও হয়তো আর বাঁচবে না, এই কথা ভেবে। কিন্তু ভয়ের থেকেও অসহায় লাগছে বেশি। নিজেকে কেমন যেন ভারশূণ্য মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি যেন আমার নিজের পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। আমার যেন আমার নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সবকিছু আমার কেমন যেন অদ্ভুত, অতিবাস্তব, অধিবাস্তব — সুর-রিয়েল মনে হচ্ছে। এই ঘর, এই হাসপাতাল, এই শহর, এই দেশ… আমেরিকা… সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার…

চার বছর এইভাবে কাটিয়ে একরকম বেপরোয়া, মরিয়া হয়ে আমেরিকায় ছাত্র হয়ে চলে আসার জন্যে চেষ্টা শুরু করেছিলাম। সফল হবো, ভাবিনি। কেমন করে যেন সবকিছু হয়ে গেলো। প্রস্তুতি ছিলোনা — শারীরিক, মানসিক, আর্থিক।

এখন রাত দশটা বোধহয়। সময় আর দেখছি না। সময়ের কোনো দাম এই মুহূর্তে আর আমার কাছে নেই। এখন দশটা হতে পারে। আটটা হতে পারে। বারোটাও হতে পারে। কী হবে জেনে? কোনো লাভ নেই। এখানে আর কেউ নেই। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলবার নেই। সবাই চলে গেছে। মুক্তিকে অপারেশন করা হবে এখন। বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে। বাঁচবে নিশ্চয়ই। বাঁচবে না কেন? বাঁচবে না? এই তো কালকেই… এই তো আজ সকালেই কত কথা হলো, কত গল্প হলো। মেয়েকে নিয়ে কত আদর, ভালোবাসা, স্নেহ… বাঁচবে না, এ আবার হয় নাকি?

বাঁচবে না?

ডাক্তার প্যাটেল বললেন, ডি এন সি বলে কী একটা অপারেশন করা হবে। আমাকে দিয়ে একটা কাগজে কী একটা সই করিয়ে নিয়ে গেলো। আমি সই না করে দিলে নাকি সে অপারেশন করা যাবে না। কারণ, মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। সার্জারির সময়ে মৃত্যু হলে ডাক্তার আর হাসপাতালকে যাতে কেউ দোষী করতে না পারে, ক্ষতিপূরণ দাবি করতে না পারে, মামলা আনতে না পারে।

এসব ব্যাপার আমি বুঝি না। আগে কখনো দেখিনি। কলকাতায় মার ক্যানসার অপারেশনের সময়ে যা করার বাবাই করেছিল। আমি কিছু জানতাম না। সেখানে তাও সব চেনাপরিচিত লোকজন ছিল। ডক্টর দীপক দাশগুপ্ত। আমাদের দীপুদা। রক্ত দিয়েছিলো বন্ধু নাগেশ। কত লোক দেখতে এসেছিলো। আত্মীয়স্বজন। এখানে আমি কারুকে চিনি না। জানি না। আমাদের এই অবস্থার কথা আমি কাকে বলবো এখন? এখানে তো আমি তেমন কারুকে চিনি না। যে ক’জনকে চিনি, তারা কেউ জানে না আজকে আমরা এখানে কী অবস্থায়। কারুকে তো খবর দেওয়া হয়নি। সবকিছু এতো হঠাৎ হয়ে গেলো!

ব্রকো হসপিটালের যে ছোট্ট ঘরটায় ওকে এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে এসে রেখেছিলো এমার্জেন্সি রুম থেকে, সে ঘরটার অন্যদিকে একটা বেবি-বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে আমাদের শিশুসন্তান। এখন এই ঘরটাতে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি।

ইলিনয় কোথায়, কেমন সেখানে পরিবেশ, আবহাওয়া কেমন, লোকজন কেমন, দিন কেমন, রাত কেমন? কোনো ধারণা ছিলোনা।

মেয়ের নাম আমি রেখেছি নন্দিনী। আদর করে রক্তকরবীর নন্দিনীর নামে নাম রেখেছি। রবীন্দ্রনাথের মায়াময় উজ্জ্বল জগতের একটু আলো মেয়ের নামকরণের মধ্যে দিয়ে ওর নিষ্পাপ, নরম মুখে মাখিয়ে দিতে চেয়েছি। আমাদের এই নিঃসঙ্গ প্রবাসে আমাদের দুজনের সংসারে নতুন মুখ। আমাদের সুখ, আমাদের আনন্দ, আমাদের অনেকদিনের অনেক স্বপ্নের, ভালোবাসার ফসল। ও এখন মাত্র সাত না আট দিনের। ও খুব ভালোই আছে। হাসছে, খেলছে, কাঁদছে, দুধ খাচ্ছে, ঘুমিয়ে পড়ছে। আমার আঙুলটা ওর ছোট্ট নরম হাতে মুঠো করে ধরে থাকে। আর আমার দিকে চেয়ে হাসে। আমি ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসে দরজা খুললেই ও জানতে পারে, বাবা এসে গেছে। খুশিতে ছোট্ট ছোট্ট হাত পা ছুঁড়তে থাকে। ওর ছোট্ট ক্রিবে ম্যাট্রেসের ওপর ওর পা ছোঁড়ার শব্দ হয়, “ধুপ ধুপ ধুপা ধুপ ধুপ…”।

কী আশ্চর্য সুন্দর ওর হাসিটা। স্বর্গ থেকে যেন সবেমাত্র দেবী সরস্বতী আর লক্ষ্মীর আশীর্বাদ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে ও, আমাদের এই সুদূর, নির্বাসিত জীবনে একটু আনন্দ, ভালোবাসা, গান, কবিতার ছোঁয়া দেবে বলে। ওর কচি মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি আমি অনেকক্ষণ ধরে, ও ঘুমিয়ে পড়বার পরে। বুকের গভীরে মরুভূমিতে বৃষ্টি হয়। বাংলার বৃষ্টি। শান্ত, পবিত্র, মায়াময়। বাংলার মাটির কোমলতা।

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি

উনিশশো পঁচাশিতে আমি এসেছি আমেরিকার মিডওয়েস্ট অঞ্চলের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ছোট্ট শহর, নাম নরমাল-ব্লুমিংটন। কোনোদিন আমেরিকায় আসবো ভাবিনি। আমাদের পরিবারের কেউ কখনো আমেরিকায় বলতে গেলে আসেইনি। দু-একজন এসেছে, কিন্তু খুব কম দিন থেকেই চলে গেছে। তাদের কাছে কোনো সাহায্য আমি পাইনি। শুধু দু-তিনজন বন্ধু এদেশে ছাত্র হিসেবে এসেছে, এবং থেকে গেছে। তাদের কাছে কিছু পরামর্শ পেয়েছিলাম। উৎসাহ পেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেনি। আমার মতো ভীষণ সংগ্রাম করতে হয়নি কারুকে। সেই আমার স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে যেমন লিখেছি, সুদূর সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজে অধ্যাপনা, টিচার্স হোস্টেলে থাকা। বিদ্যুৎ নেই, কলের জল নেই, রাস্তাঘাট নেই, ডাক্তার নেই। জলপথে যাওয়া আসা। ফোন নেই। কলকাতায় পড়ে আছে স্ত্রী এবং বাবা, বোন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। সপ্তাহান্তে বাড়ি যাওয়া। দু’দিন থেকেই আবার ফিরে আসা এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। চার বছর এইভাবে কাটিয়ে একরকম বেপরোয়া, মরিয়া হয়ে আমেরিকায় ছাত্র হয়ে চলে আসার জন্যে চেষ্টা শুরু করেছিলাম। সফল হবো, ভাবিনি। কেমন করে যেন সবকিছু হয়ে গেলো। প্রস্তুতি ছিলোনা — শারীরিক, মানসিক, আর্থিক। সবাইকে পৃথিবীর অন্যদিকে পিছনে ফেলে এসে দেশহীন, সমাজহীন, রাষ্ট্রহীন, বন্ধুহীন, ভাষাহীন জীবন কেমন করে কাটাতে হয়, তার কোনো ধারণাই ছিলো না।

শীতকালে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি

তারপর থাকা ভীষণ একাকীত্বের মধ্যে। নির্জনতা, বন্ধুহীন, আত্মীয়হীন সুদূর আমেরিকার জনশূণ্য মধ্য-প্রতীচ্য। ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, মিসৌরি, ওহায়ো। ইলিনয় কোথায়, কেমন সেখানে পরিবেশ, আবহাওয়া কেমন, লোকজন কেমন, দিন কেমন, রাত কেমন? কোনো ধারণা ছিলোনা। স্কলারশিপ পেয়েছি এই ইউনিভার্সিটিতে, আর চলে এসেছি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই। এই এক বছর তীব্র ভীষণ একাকীত্ব। দেশে ফিরে যাবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছিলাম।

তারপর একটু একটু করে কোনোরকমে সয়ে গেলো। একটু একটু করে দাঁড়িয়ে গেলাম।

চলবে…

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে শুরু হল ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia