মেরিকামায়া সাতকাহন : জুলিয়েটা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বললো, “তোমরাও ফুটবল খেলো নাকি?”

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩৬

তৎকালীন ভারতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক চুনি গোস্বামী (বাঁদিকে)

পঞ্চত্রিংশ পর্বের পর

ক এক সময়ে পিছন ফিরে তাকাই, আর ভাবি কী ভীষণ বিপদের মধ্যে দিয়েই না আমাদের যেতে হয়েছে সারা জীবন!

এ যেন আর শেষই হয় না। মৃত্যুশোক তো আছেই একের পর এক। দেশে থাকার সময়ে সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর মৃত্যু। তারপর এদেশে জীবন কাটানোর সময়ে দেশে ফেলে আসা সবচেয়ে প্রিয় কিছু মানুষের মৃত্যু। যেগুলো হবার কথা ছিল, সেগুলো তো হলোই। আর যেগুলো হবার কোনো কথা ছিল না, সেগুলোও ঘটে গেলো। তার সঙ্গে যুঝতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে, কারণ দূর থেকে শোক পেয়েছি, শক পেয়েছি, কিন্তু আরো পাঁচজন নিজের লোকের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে সে শোক ভাগ করে নিতে পারিনি। দেশে যে সামাজিক ফিল্টারটা থাকে, প্রবাসের জীবনে সেটা আমাদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ফলে, আমাদের মতো যারা দেশের মানুষের সঙ্গে, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মনের দিক থেকে যোগাযোগ রেখে গেছি, আমাদের কষ্টটা হয় সবচেয়ে বেশি।

আর যারা দেশের মানুষদের সঙ্গে সব বন্ধন ছিন্ন করে এদেশে চলে এসেছে, যাদের আর দেশে যাওয়ারও তেমন কোনো প্রয়োজন হয় না, তাদের সে কষ্ট অনেক কম। তারা দেশে যখন যায়, থাকার জায়গাও তাদের অনেকসময় থাকে না। অনেকে কলকাতায় গিয়ে, অমৃতসর, মুম্বাইতে গিয়ে নিজের সেই পুরোনো জায়গাটায় ফিরতে পারে না। অনেকে হোটেলে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেশে এ শহর সে শহর বেড়িয়ে আবার আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসে।

সত্যি কথা বলতে, তারা বোধহয় অনেক ভালো আছে। আমাদের মতো যন্ত্রণা তাদের নেই।

মৃত্যুশোক তো আছেই। তারপরেও আছে আমাদের জীবনের নানা বিপদ, দুর্ঘটনার গল্প। মেয়ে হবার সময়ে মুক্তির জীবনসঙ্কট। যে গল্প দিয়ে এই মেরিকামায়া সাতকাহন শুরু করেছিলাম। বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময়ে বিষাক্ত টিক আমার সারা গায়ে। সে ঘটনার পর বহুদিন আতঙ্ক ছিল, শরীরের মধ্যে কোনো দুরারোগ্য অসুখ প্রবেশ করেনি তো? শুনেছিলাম, একটা টিকের বিষ থেকেই লাইম ডিজিজ নামক মারাত্মক রোগ হতে পারে। আর আমার গায়ে তো অগুন্তি সেই অতিক্ষুদ্র লাল লাল পোকা — সারা গায়ে, হাতে, পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিলবিল করে। এতকাল পরেও ভাবলে কেমন যেন লাগে!

বনে জঙ্গলে ছত্রাকের শিকার। এই ছবিটি আমাদের এভারগ্রীন টেরেসের পিছনের বনে, দুপুরবেলায়

ভাগ্যই বলুন, ঈশ্বরই বলুন, কোনো খারাপ অসুখ আমার করেনি সে ঘটনার পর। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। রক্ত পরীক্ষাও করিয়েছিলাম। কীভাবে যে অসংখ্য সেই কীট আমার জামাপ্যন্টের মধ্যে দিয়ে শরীরকে ছেয়ে ফেলেছিলো, তার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। একমাত্র সম্ভাব্য কারণ, হয়তো আমি যখন মাশরুম হান্টিং করে বেড়াচ্ছিলাম, তখন কোনো গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কোনো স্পেসিমেন সংগ্রহ করছিলাম, এবং গাছের পাতা থেকে ঝরে ঝরে সেগুলো আমার গায়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। এই ঘটনার পর থেকে আমি অনেক বেশি সতর্ক হয়ে ঘুরতাম।

আমাদের শিশুকন্যাকে নিয়ে কিছুদিন আগেই সেই ভয়ের ঘটনা ঘটে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাক্তাররা একটা সামান্য ভাইরাল সংক্রমণ নির্ণয় করতে পারেনি, এবং মেয়েটা শুধু শুধু দিনের পর দিন কষ্ট পেয়েছে। ছুঁচ ফুটিয়ে ফুটিয়ে তার ছোট্ট ছোট্ট হাতে লাল লাল দাগ করে দিয়েছে তারা। সে চীৎকার করে কেঁদেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে কেঁদেছি আমরাও — অসহায় ভাবে। এমন কী তারা বলেছিলো, লাম্বার পাঙ্কচার করতে হতে পারে। যা ভীষণ বিপদজনক। আর দু একদিনের মধ্যে তার অসুখ নিজে নিজে ভালো হয়ে না গেলে সে পদ্ধতির আশ্রয়ও তারা নিতো – এ বিষয়ে আমি নিশ্চিৎ।

মুক্তির সঙ্গে আমাদের মেয়ে

আমরা ফিরে এলাম মিসৌরি রাজ্যের কেপ জিরার্ডো থেকে – হাসপাতালে চার পাঁচদিন কাটিয়ে। দুপুরবেলা বাড়ি ফিরলাম। রাতের পর রাত ঘুম হয়নি। ফিরে এসে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বোধহয় দু-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ আমাদের সাদার্ন হিলস অ্যাপার্টমেন্টের কাচের জানালার বাইরে কাদের যেন টকটক করে আঙুলের শব্দ। কারা যেন ঘোরাঘুরি করছে বাইরের দোতলার বারান্দায়। আমি ঘুমিয়েছিলাম বসার ঘরের সোফাতেই। ঘুম ভেঙে গেলো। এরকম করে না বলে কয়ে এদেশে তো কেউ দেখা করতে আসে না! কারা এলো?

উঠে দরজা খুলে দেখি আমাদের কেন্টাকির বন্ধু শুক্লা, বিভাসদা, আর তাদের দুটো ছোটো ছোটো ছেলে বিতান আর সায়ন। ওরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে নক করে, আর পর্দার মধ্যে দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে আমাদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে চলেই যাচ্ছিলো। আমাদের ঘুম ভাঙেনি।

আমার মেয়ের জন্মদিনে সাদার্ন হিলসের বাড়িতে শুক্লা (নীল শাড়ি) সামনে তার ছোট ছেলে সায়ন। আমার মেয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে

এই আতঙ্কের অভিজ্ঞতার পর, অপরিসীম ক্লান্তির পর ওদের এই অপ্রত্যাশিত আগমন সেদিন মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে গিয়েছিলো। এই প্রফুল্লতার দরকার তখন আমাদের ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেকক্ষণ বসে গল্প করলো ওরা। আমাদের মেয়েকে নিয়ে এই অভিজ্ঞতার কথা শুনে ওরা তো হতবাক।

এই আমাদের আমেরিকার ইমিগ্রেন্ট জীবন। মা বাবা, ভাই বোন, মাসি পিসি, মামা কাকার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে এসব যুদ্ধ আমাদের নিজে নিজেই করে যেতে হয়েছে। আমেরিকার জীবন সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই, এবং বিশেষ করে যারা কিছু না জেনেই সবজান্তা, তারা চিরকালই আমাদের এই জীবনটাকে হয় অশ্রদ্ধা, আর নয়তো উদাসীনতা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা এই জীবনটাকে কখনো বোঝেনি। বোঝার চেষ্টাও করেনি।

নিজের মানুষ বলতে চিরকাল থেকেছে আমাদের এই নতুন বন্ধুরাই। রক্তের সম্পর্কের থেকেও এই সম্পর্কগুলো আমাদের কাছে তাই অনেক বেশি দামী।

এরাই ছিল আমাদের পরিবারের মতো। কোনো এক শীতের দিনে আমার শিশুকন্যার সাথে শিপ্রাদি

সালওয়া এল তায়েব। ইন্টারন্যাশনাল স্পাউসেস গ্রুপের নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

সালওয়ার স্বামী ডঃ এল তায়েব এস আই ইউ’এর মেডিকেল ডাক্তার হয়ে এসেছিলেন কয়েক বছরের জন্যে। ওরা সুদানের। ওদের সঙ্গে পরিচয় হলো ওই গ্রুপে মুক্তি যোগ দেওয়ার পরে। প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিল এক বছর। তারপর এক বছরের জন্যে ওকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করলো ওরা। প্রত্যেক বছর নতুন নতুন একজন স্পাউস প্রেসিডেন্ট হয়ে ওই গ্রুপটা চালিয়েছে। তাদের স্বামীরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো বিভাগের ছাত্র। আর স্ত্রীরা স্পাউসেস গ্রুপের সদস্য।

ওরা একসঙ্গে সময় কাটায়, পিকনিক করে কোনো পার্কে। শিশুদের নিয়ে যায় সেখানে। শীতকালে যখন আর বাইরে অনুষ্ঠান করা যায়না, তখন ওরা সাদার্ন হিলস বা এভারগ্রীন টেরেসের কমিউনিটি হলে অনুষ্ঠান করে। নানা দেশের রান্নাই সেসব অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ। তার সঙ্গে আড্ডা।

এইভাবেই আমরা পৃথিবীর নানা দেশের মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি আমেরিকায় – যা দেশে থাকার সময়ে কখনো সম্ভব হয়নি। সম্ভব ছিলো না। ভূপেন হাজারিকার গান শুনতে গিয়েছিলাম সেই সেন্ট লুইসে। “পৃথিবী আমারে আপন করেছে, ভুলেছি নিজের ঘর, আমি এক যাযাবর” – এ গানের অর্থ এখন আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম। এবং ভীষণ বাস্তব।

সেন্ট লুইসে ভূপেন হাজারিকা গান গাইছেন

চোখের সামনে দেখছি পৃথিবীটাকে। সুদানের আল তায়েব ফ্যামিলির সঙ্গে ওদের বাড়ি গিয়ে ওদের খাবার খেয়েছি। ইথিওপিয়া, সুদান, কেনিয়া — এই দেশগুলোর সংস্কৃতি অনেকটা একধরনের। ভাষা, সঙ্গীত, পোশাক, আহার। সে মুসলমানই হোক, বা খৃস্টান। ঠিক যেমন আমাদের পশ্চিম বাংলা আর বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান খৃস্টান বা বৌদ্ধ বা আস্তিক বা নাস্তিক – সবার জীবনপদ্ধতিই মোটামুটি একরকমের।

আবার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এসব জায়গার লাইফস্টাইলও প্রায় এক। জাকার্তা থেকে এসেছিলো একটা পরিবার। তাদের ছোটো ছোটো তিনটে মেয়ে – শীলা, সেরিজা এই দুটো বোন ছিল আমার মেয়ের বয়সী – চার কি পাঁচ। সুতরাং তাদের বন্ধুত্বের সূত্রে তাদের বাবামায়ের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। ওরা ছুটির পর মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি আসতো, আর আমার মেয়েকেও বেবীসিটার না পাওয়া গেলে ওদের বাড়ি দিয়ে আসতাম।

আমেরিকায় দীর্ঘ সামার ভ্যাকেশন থাকে। তখন স্কুলে প্রায় সবই বন্ধ। মার্কিন ছাত্রছাত্রীরা প্রায় সবাই নিজের নিজের বাড়ি চলে যায়। একথা আগেও লিখেছি আই এস ইউ অধ্যায় লেখার সময়ে। ক্যাম্পাস জনশূন্য। স্কুল-পরিচালিত ডে কেয়ারও বন্ধ। সেখানকার দুই টীচার মার্কিন শ্বেতাঙ্গিনী ভিকি এবং থাইল্যাণ্ড থেকে আগত অ্যাড – যার থাই নাম কখনো জেনে নেওয়া হয়নি – তাদের আর পাওয়া যায়না। কিন্তু আমাদের তো কাজে যেতেই হবে, উপায় নেই। সুতরাং তখন এই আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট কমিউনিটিই ভরসা।

এইভাবেই এসআইইউ’তে কত দেশের মানুষের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়ে গেলো।

আফ্রিকা থেকে চীন, কোরিয়া থেকে ফিলিপিন্স থেকে ল্যাটিন আমেরিকা।

ব্রেজিলের মেয়ে জুলিয়েটার সঙ্গে আলাপ হলো বোধহয় সেই ইন্টারন্যাশনাল স্পাউসেস গ্রুপের মাধ্যমেই। তফাৎ হলো, এখানে জুলিয়েটা স্টুডেন্ট, আর তার স্বামী স্পাউস। জুলিয়েটা আবার ফুটবল ভক্ত। সুতরাং, জমে গেলো খুব।

পেলের গল্প, সক্রেটিস, গ্যারিঞ্চা, ভাভা, ডিডির গল্প। রিভাল্ডো, রোনাল্ডো, রোল্যান্ডিনিও, রবার্তো কার্লোস, কাকা তখনও আসেনি মাঠে।

আমি ওকে বললাম আমাদের হীরো চুনী বলরাম পিকে সমাজপতির কথা।

জুলিয়েটা ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বললো, “তোমরাও ফুটবল খেলো নাকি?”

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Developed by DXDasia