
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩৫
দেশ থেকে চিঠি আসে মাঝে মাঝে।
প্রথম বছরটায় যখন একা ছিলাম ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, তখন আসতো স্ত্রী’র চিঠি। সেসব চিঠিতে প্রধানতঃ একটাই কথা থাকতো – তুমি এতো লড়াই করে আমেরিকায় গেছো, এখন হঠাৎ সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ফিরে এসো না। কখনো মুক্তি চিঠিতে এমন কোনো কথা লেখেনি, যাতে আমার মন দুর্বল হয়ে পড়ে। সবসময়ে আমাকে সমর্থন ও শক্তি যুগিয়ে গেছে। যদিও আরো অনেক কিছু লেখার ওর ছিল। কিন্তু চিঠিতে সেসব কথা কখনো লেখেনি ও।
তারপর মুক্তি এদেশে আমার কাছে চলে এলো। আমাদের মেয়ে হলো। দিনগুলো, মাসগুলো কোথা দিয়ে কেটে গেলো একটু একটু করে। মেয়ে কথা বলতে শিখলো, হাঁটতে শিখলো, গান গাইতে শিখলো, কবিতা বলতে শিখলো। শুধু আমরাই তার দর্শক, তার শ্রোতা। আর কেউ নেই – বন্ধুরা ছাড়া। দেশে তার দাদু দিদা জানতেই পারলো না তাদের আদরের একমাত্র নাতনি কীভাবে বড়ো হয়ে গেলো।
তাদের চিঠি আসতো। আমার বাবা নিয়মিত চিঠি দিতেন। আমার নিজের বোন, এক মামাতো বোন দীপা কয়েকবার চিঠি লিখেছে। চিঠি লিখেছে আমার শৈশবের বন্ধু সুব্রত। তখনকার দিনে ফোন দুর্মূল্য—আন্তর্জাতিক ফোন করার অর্থ আমাদের নেই। ওদের তো একেবারেই নেই। ইন্টারনেট তখন কালের গর্ভে। চিঠি লেখা সে সময়ে একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল যে শুধু, তাই নয়। চিঠি লেখা ছিল একটা শিল্প, আর্ট। হাজার বছর ধরে – সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ চিঠি লিখেছে। ঠিক যেমন মানুষ সন্ধ্যেবেলা কাজকর্মের শেষে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে গল্প করেছে, সুখদুঃখের কথা শেয়ার করেছে।
টিভি এবং বিশেষ করে ইন্টারনেটের আগমনের পর থেকে মানুষ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চিঠি লেখার যুগের ট্র্যাডিশন ধ্বংস হয়ে গেছে।
আমাদের মেয়েকে কেউ দেখেনি দেশে। ফোন করে মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে দু একটা কথা বলেছে সে। তাতেই তারা আহ্লাদিত। একবার তিন কিংবা চার বছর বয়সে একটা ক্যাসেট টেপে তার কিছু কথা আমরা রেকর্ড করে কোনো এক বন্ধুর মাধ্যমে দেশে পাঠিয়ে দিলাম। সে দাদুকে বলছে, “হে হে দাদু, তুমি কেমন আছো, ভালো আছো? আমিও ভালো আছি। ওকে, বাই।” দিদাকে বলছে, “হে হে দিদা, তুমি কেমন আছো, ভালো আছো? আমিও ভালো আছি। ওকে, বাই।” এরকম প্রত্যেককে সে একই কথা রেকর্ড করে পাঠিয়েছে। সবাই তো সেই কথাগুলো শুনেই হেসে গড়াগড়ি। আমেরিকা থেকে নাতনি বাংলায় কথা বলে পাঠিয়েছে। আর কী মজা করে কথা বলে সে!

মুক্তির সঙ্গে আমাদের মেয়ে
নাতনি কিন্তু কারুকেই দেখেনি কখনো। সুতরাং, তার কল্পনায় সে সবাইকেই একই মানুষ হিসেবে দেখেছে, এবং একই ধরনের কথা সে সবার সঙ্গে বলেছে। কারণ, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা পার্সোনালিটি তার জানা নেই। তার ছোট্ট জীবনের ছোট্ট কল্পনায় তখনও তার কাছে সবাই সেই অদেখা, অজানা দেশের একই ব্যক্তি। আমাদের মুখে সে যা শুনেছে, তাই তার কাছে সে সময়কার ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষ তো নয়, ইন্ডিয়া।
এভাবেই আমাদের দিন কাটছে।
সপ্তাহের দিনগুলো আমার কাটে অতি ব্যস্ততার মধ্যে। প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে তখন আমার ফুল অ্যাসিস্টেন্টশিপ শুরু হয়েছে। মাসে মাসে প্রায় সাতশো ডলার। সুতরাং অর্থচিন্তা দূর হয়েছে। যদিও এই সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া অনেক বেশি। সাদার্ন হিলসের ক্ষুদ্র এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টে দুটো বছর থেকে নব্বইয়ের গোড়ার দিকে আমরা উঠে গেলাম অনেক বেশি জায়গার নতুন তৈরি এভারগ্রীন টেরেসের অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে ভাড়া আরো বেশি।
কিন্তু এখন মুক্তি ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্টের তরুণ প্রফেসর ফেরারোর কাছে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির কাজ পেয়েছে সেই আই এস ইউতে ডঃ নাডাকাভুকারেনের কাছে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এবং ফেরারো ওকে সাহায্য করেছেন ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টে আবেদন করে স্পাউস ভিসা থেকে এইচ ওয়ান-বি ভিসায় ট্রান্সফার করতে। ফলে, এখন মুক্তি রোজগার করতে পারে, যদিও সে রোজগার সামান্য। তবুও, নিজের পরিশ্রম ও যোগ্যতার একটা অর্থকরী মূল্য শেষ পর্যন্ত ও পেলো। আমাদেরও দারিদ্র্যদশা ঘুচলো।
সেই লজঝড়ে প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্টকে বিক্রী করে দিয়ে এবারে আড়াই হাজার ডলার দিয়ে পঁচাশির মডেলের নিসান সেন্ট্রা হ্যাচব্যাক গাড়ি কেনা সেই বিলাসিতার প্রথম সোপান। বিলাসিতা বললাম বটে, কিন্তু আগেই বলেছি আমেরিকায় গাড়ি কেনা বিলাসিতা নয়, বরং একেবারেই অপরিহার্য। শুধু যে প্রতিদিনের কাজকর্ম, চাকরি, শিশুকন্যাকে ডে কেয়ারে নিয়ে যাওয়া এবং বাড়ি নিয়ে আসার জন্যে তা অপরিহার্য তাই নয়। আমার নিজের রিসার্চের জন্যে উইকেন্ড পড়লেই সাদার্ন ইলিনয়, মিসিসিপি নদী পেরিয়ে সেন্ট লুইস অঞ্চল, আরো দক্ষিণে বিভাস-শুক্লাদের পশ্চিম কেন্টাকি এবং মুনমুন-রবিদার পশ্চিম টেনেসী আমাকে যেতেই হয়।

মিসিসিপি নদীর কাছে মাছ কিনতে যেতাম চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে। নদীর বুকে ভাসমান বরজ। উল্টোদিকে মিসৌরি রাজ্য। সেখানে খুব কাছেই মার্ক টোয়েন ও হাক ফিন-খ্যাত হ্যানিবল
তারপর বিলাসিতার আরো এক অপরিহার্য উপকরণ হলো মাছ কিনতে মিসিসিপির ধারে জেলেদের বিরাট বিরাট নৌকো রাখা আছে যেখানে, সেখানে যাওয়া মাঝে মাঝে। কারণ, আমেরিকায় থাকি আর উত্তর মেরুতেই থাকি, বাঙালি হয়ে যখন জন্মেছি, মাছ আমাদের খেতেই হবে। এবং সুপারমার্কেটের বরফের মাছ খেয়ে খেয়ে আমাদের মুখের আকৃতি আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। জলে জিওনো মাছ না খেলে জীবন বৃথা মনে হচ্ছে।
ডিপার্টমেন্টের উচ্চিংড়ে ডেভিড কার্টার বললো, “সে তো তোমরা এ্যানা-জোন্সবরোতে গেলেই পেতে পারো। ওখানে নদীর ধারে “ইউ শ্যাল ফাইন্ড লটস অফ ফ্রেশ ফিশ।” ততদিনে জেনে গেছি, ইউ কথাটার পরে শ্যাল দেওয়া যায় মাঝে মাঝে – জোর দিয়ে বলতে গেলে। ইউ শ্যাল ফাইন্ড, অর্থাৎ পাবেই পাবে।
বাংলাদেশের এক প্রফেসর মিজান মিয়া এবং ভারতের এক বাঙালি প্রফেসর বিদ্যুৎ এরাও আমাদের নতুন পরিচিতদের তালিকায়। অনেক নতুন নতুন বন্ধু ও বান্ধবী। পুরোনো যেসব বাঙালি এখানে বেশ কিছুদিন ধরে আছেন, তাঁরাও সেই পরামর্শ দিলেন। মৎস্য-ন্যায়-পরামর্শ।
সুতরাং, পরের উইকেন্ড চল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করে ফ্রেশ ফিশের খোঁজ, এবং উল্লাসে চীৎকার করতে করতে (মনে মনে) ফ্রেশ ফিশ নিয়ে প্রত্যাগমন। আসল রুই মাছ আর কাতলা মাছের মাঝামাঝি দেখতে জীবন্ত মৎস। যে মৎস মারিয়া সুখে খাইলে বাঙালির চিত্ত পরিপূর্ণ হয়।

মিসিসিপি নদীর ধারে মাছ ধরার নৌকো
একবার সেই মৎস্য আনতে আমি গেছি। ফেরবার সময়ে বোধহয় মনের আনন্দে পঁয়তাল্লিশ মাইল স্পীড লিমিটের রাস্তায় পঞ্চাশ মাইল স্পীড তুলেছিলাম। হঠাৎ পিছনে সাইরেন বাজতে লাগলো। পুলিশের গাড়ি আমার পিছন পিছন আসছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই আসছে, আমি টের পাইনি। এ অভিজ্ঞতা সেই প্রথম। মাইক্রোফোনে কী যেন একটা বলছে, কিন্তু আমার সে সময়কার সাদার্ন ড্রল বোঝার শ্রবণেন্দ্রিয় তখনও তীব্র নয়। শুধু এটুকু বুঝলাম, গাড়ি থামিয়ে হাইওয়ের ধারে সরে না গেলে সমূহ বিপদ।
থামলাম। আমার বিবর্ণ গোবেচারা মুখ দেখে, এবং আমি ছাত্র তা সনাক্ত করার পর অফিসার বললেন, “হোয়াই ডিডন্ট ইউ স্টপ স্যার?” আমাকে স্যার বলছে কেন রে বাবা? পেটের ভেতরে ভয়ে গুড়গুড় করতে লাগলো।
আমি বললাম, “স্যার, আই ডিড নট আন্ডারস্ট্যান্ড স্যার দ্যাট ইউ ওয়্যার আস্কিং মি টু স্টপ স্যার।” বিপদে পড়লেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা একেবারে রাস্তার ধুলোতে মিশে যায়। এতদিনের ভালো ইংরিজি বলতে পারার ফোলানো বেলুনটা এক মুহূর্তেই চুপসে গেলো।
"আই কুড গিভ ইউ আ টিকেট, ডিজা নো?" বুঝলাম, টিকিট মানে মোটা অংকের ফাইন। শুনেছি কয়েকজন বন্ধুর কাছে।
কিন্তু টিকিট না দিলে তিনি শুধু আমাকে একটা লিখিত ওয়ার্নিং দিয়ে সেযাত্রা ছেড়ে দিলেন। বাকি পথটা আমি পঁয়তাল্লিশ মাইলের জায়গায় পঁচিশ মাইলে চালালাম। বুকের ধুকপুকুনি থামতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিলো।
বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। নানা প্রজাতির মাশরুম সংগ্রহ করি। একটা প্রাথমিক কাজ চলছে বিভিন্ন জেনাস আর স্পিসিসের মধ্যে থেকে কোন বিশেষ গ্রুপের ছত্রাক নিয়ে আমি বিশদভাবে স্টাডি করবো, তার সম্পর্কে। বিষাক্ত নানাধরনের মাশরুম জঙ্গলে হয়ে থাকতে দেখি – যেসব নাম আগে শুধু বইয়ের পাতাতেই পড়েছি। অ্যামানাইটা ফ্যালয়ডিস বা ডেথ কাপ। মুখে দিলেই নিশ্চিৎ মৃত্যু। ওই অ্যামানাইটার আর এক স্পিসিস মাস্ক্যারিয়া। অপূর্ব সুন্দর তার রূপ। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষাক্ত। সেসব নিয়ে এসে ল্যাবে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে তার আভ্যন্তরীণ গঠন পর্যবেক্ষণ করি। ছবি তুলে রাখি, ছবি এঁকে রাখি।

বনে জঙ্গলে ছত্রাকের শিকার। এই ছবিটি আমাদের এভারগ্রীন টেরেসের পিছনের বনে, দুপুরবেলায়

আমি প্রথম প্লুটিয়াস মাশরুম স্পোর জার্মিনেট করার কৌশল আবিষ্কার করি ল্যাবরেটরিতে
তারপর আছে নানা প্রজাতির এডিবল মাশরুম বা আহার্য ছত্রাক। অ্যাগারিকাস, প্লিউরোটাস বা বাংলায় যাকে বলে ধিঙ্গরি মাশরুম। যার চাষ করার সহজ প্রণালী বর্ণনা করে দেশে থাকতে আমার প্রথম বৈজ্ঞানিক পেপার পাবলিশ করেছিলাম। আরো কত রকমের যে আশ্চর্য অদ্ভুত প্রজাতির ছত্রাকের সঙ্গে পরিচয় হলো এই মার্কিন মুলুকের প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে ঘুরে। একা একাই ঘুরে বেড়াই। পরণে থাকে উজ্জ্বল হলুদ-কমলা রঙের ভেস্ট, তার দুদিকে ফ্লুয়োরেসেন্ট দুটো স্ট্রাইপ থাকে, যাতে মার্কিনি শিকারীরা হরিণ ভেবে আমাকে গুলি করে না বসে।
না, বন্দুকের গুলি খাইনি কখনো। কিন্তু আরো অনেকভাবে মৃত্যু আসতে পারতো।

অতি দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির মোরেল মাশরুম জঙ্গলের মাটিতে

প্লুটিয়াস-এর এক বিরল প্রজাতি
একবার নির্জন অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হলো, সারা গায়ে কী যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হতেই বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেলো। সেই ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে কাজ করার সময়ে প্রফেসর অবারটিন দুটো জিনিস সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছিলেন। প্রথমটা হলো, “সী লিভস থ্রী, লেট্ দেম বী।” অর্থাৎ, লতানে গাছের ডগায় তিনটে তিনটে করে পাতা যদি দেখতে পাও, ওদের নিজের মতো থাকতে দিও। কারণ ওরা পয়জন আইভি। বিষাক্ত বিছুটি।
আর দ্বিতীয়টা হলো … সেই নির্জন বনে গাড়ীটা একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। আমি গাড়ির আড়ালে গিয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হলাম। দেখলাম, সারা গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য টিক। হরিণের গায়ে অতি ক্ষুদ্র আলপিনের মাথার মতো লাল লাল পোকা ঘুরে বেড়ায়, আর রক্ত চুষে খায়। ডিয়ার টিক।
গাড়ির পিছনে রেখে দেওয়া বোতলের জল দিয়ে সারা গা ধুয়ে মুছে, জামাকাপড় উন্মাদের মতো ঝাড়তে লাগলাম।
যদি কোনোভাবে রক্তের মধ্যে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পোকার বিষ প্রবেশ করে, তাহলে মৃত্যু বা পক্ষাঘাত অনিবার্য্য।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
