
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩৪
আমরা পাঁচ বছর দেশছাড়া। আমার বাবা আগেই অবসর নিয়েছেন তাঁর ঊষা সেলাই মেশিন কারখানার চাকরি থেকে। পেনশন নেই। সামান্য প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকা জমা আছে, তা তিনি আমার একমাত্র বোনের বিয়েতে খরচ করবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন।
মা দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করতে করতে বেয়াল্লিশ বছর বয়সেই জরায়ুর ক্যানসার হয়ে চলে গেলো। সেসব কথা আমি আমার দেশের স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে লিখে রেখেছি। তখন আমি এমএসসি’তে ঢুকেছি সবে। মা’র একটাই স্বপ্ন ছিল – ছেলে যেন উচ্চশিক্ষাতে যায়। আমাদের পরিবারে এমএসসি মানে অতি উচ্চশিক্ষা। যখন সে ইচ্ছে তার পূর্ণ হলো, তখনই তাকে চলে যেতে হলো পৃথিবী ছেড়ে।
এমএসসি শেষ করার পর দুটো বছর বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে আমি অধ্যাপক নির্মল সমাজপতির কাছে পিএইচডি গবেষণার কাজ করেছিলাম। বিদ্যাসাগর কলেজের বোটানির হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট ডঃ দীপক গুপ্তর মাধ্যমে সমাজপতির সঙ্গে আমার পরিচয়। এমএসসি করার আগেই ঠিক করা ছিল, আমি আর মুক্তি দুজনেই তাঁর কাছে পিএইচডি করবো। তখন স্বপ্নেও ছিলো না, কল্পনাতেও ছিলো না সে কাজে মাঝপথেই ইস্তফা দিয়ে আমেরিকায় চলে আসবো। কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি আমেরিকায় পড়াশোনা করবো, ডক্টরেট ডিগ্ৰী করবো, আর বাকী জীবনটা পৃথিবীর উল্টোদিকে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই কেটে যাবে।
প্রস্তুতি ছিলো না কোনোকিছুরই তেমন। হঠাৎ করেই কেমনভাবে যেন জীবনের গতিপথ বদলে গেলো দ্রুত। যা হবার ছিলো না, তাই হলো। যা হবার কথা ছিল, তা হলো না। হবার কথা ছিল দেশে একটা অধ্যাপকের নিশ্চিন্ত চাকরি, কলকাতার আশেপাশে একটুকরো জমি, সেখানে একটা ছোটো বাড়ি। হবার কথা ছিল ভারতবর্ষে জীবন কাটানো, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো, মাস গেলে অত্যন্ত কমফর্টেবল পে চেক ব্যাংকে জমা করা। হবার কথা ছিল কিছু না জেনে, কিছু তেমন না শিখে নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করা, আর ছাত্রছাত্রীদের গিনিপিগের মতো মনে করে তাদের ওপর ইন্টেলেকচুয়াল পরীক্ষানিরীক্ষা। বিএসসি পরীক্ষার খাতা দেখা, উপরি রোজগার। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি থেকে চিরকালের মতো সরে এসে বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আবোল তাবোল বকা।
এ সব কিছুই হতে শুরু করেছিল নিয়মিতভাবে। কিন্তু তারপর কয়েকজন বন্ধুর পরামর্শে ও উৎসাহে, এবং মুক্তির সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতায় প্রবল অদম্য ইচ্ছায় ও অতি কঠোর পরিশ্রমে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়তে চলে এলাম। জীবনটা ভাঙলো, আবার নতুন ভাবে গড়ে উঠলো নতুন দেশে।
কিন্তু দেশ থেকে চলে আসার সময়ে তেমন করে ভাবার অবকাশ পাইনি আমি আর মুক্তি দুজনেই আমেরিকায় চলে গেলে আমার বাবা ও বোন জীবন কাটাবে কীভাবে। বাবা মাথা উঁচু করা শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মানুষ। জয় ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস থেকে অবসর নিয়ে তিনি কয়েক বছর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক দাতব্য চিকিৎসালয়ে পার্ট টাইম কাজ করেছেন। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমেরিকায় চলে আসার পর আমার সতীর্থ অধ্যাপক শূলপানিদা বোধহয় আমার প্রাপ্য কিছু বকেয়া টাকা বাবার হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন। মুক্তি এক বছর আরো থেকে গেছে – পঁচাশির আগস্ট থেকে ছিয়াশির জুলাই পর্যন্ত ও অধ্যাপনার কাজ করে গেছে বেহালার বিবেকানন্দ কলেজে। ওরা থেকেছে আমাদের বেহালার বিরাট দোতলার ফ্ল্যাটে। কোনো আর্থিক অসুবিধে হয়নি।
কিন্তু তারপর?
মুক্তি আমেরিকায় চলে আসার পর অর্থাভাবের কারণে বাবাকে আর বোনকে আবার সে ফ্ল্যাট ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দিয়ে ফিরে যেতে হলো আমাদের আশৈশব বাসভূমি মানিকতলার সেই মেজেনাইন ফ্ল্যাটে। আমরা তখন নিজেরাই আমেরিকায় এতো অর্থাভাবের মধ্যে কাটাচ্ছি যে ওদের কথা ভাবার সময় পাইনি। বোনের বিয়ের বয়স হবার পর ও নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার আগে বেশ কয়েক বছর ওর নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ আমাকে করে যেতে হয়েছে। মাতৃহীন এক কিশোরীর জন্যে কলকাতার এঁদোগলির আবহাওয়া একেবারেই অনুকূল নয়। সেই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই ওর নতুন সম্পর্ক। আমি দেশ থেকে চলে আসার আগেই বোনের হবু স্বামীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা বলে এসেছি। কিন্তু অষ্টআশি সালের শীতকালে যখন শুভ্রজিতের সঙ্গে পূর্ণার বিয়ে হলো, তখন অর্থাভাবের কারণে আমরা দেশে যেতে পারিনি। বরং, সামান্য সঞ্চিত অর্থ মানি অর্ডার করে বাবার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।

আমি, মা, বাবা আর বোন
এই হলো আমাদের জীবনের আসল গল্প। টানাপোড়েনের গল্প। নতুন ইমিগ্রেন্ট জীবনের যন্ত্রণার কথা, অস্থিরতার কথা তেমন কেউ বলে না। বলতে চায় না। যেমন বলতে চায় না পাঞ্জাব, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ থেকে আসা গরিব লোকগুলো, যারা কেনেডি এয়ারপোর্টে, টরোন্টো বা লস অ্যাঞ্জেলেস এয়ারপোর্টে বাথরুম পরিষ্কার করে, হাইওয়ের ধারে কোনো গ্যাস স্টেশন অর্থাৎ পেট্রোল পাম্পে কাজ করে, কিংবা কোনো এক দেশি রেস্টুরেন্টে রান্নাঘরে মুরগি কাটে, কাপ ডিশ ধোয়। কিন্তু দেশে যায় না কখনো। দেশে তাদের পরিবারের লোকেরা কেউ জানে না তারা কী কাজ করে। মাসে মাসে পাঠানো ডলার পেয়েই তারা খুশি।

এই আমাদের ইমিগ্রেন্ট জীবনের আসল গল্প।
দেশে টাকা পাঠাতে শুরু কখন করেছিলাম, তা আর ঠিক মনে নেই। বোধহয় যখন এসআইইউ’তে দু’বছর কাটিয়ে একটু পায়ের তলায় মাটি আর ডিপার্টমেন্টে সম্মান খুঁজে পেয়েছি, আর মুক্তি শেষ পর্যন্ত এফ-টু ভিসা থেকে বদলে এইচ ওয়ান-বি ভিসাতে চলে গিয়ে মাসে মাসে কিছু টাকা রোজগার করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই বোধহয় আমরা বাবাকে কিছু কিছু করে টাকা পাঠাতে শুরু করেছি। সামান্য টাকা – হয়তো পঞ্চাশ কি একশো ডলার মাসে। আমরা যখন আমেরিকায় এসেছি, সে সময়ে এক ডলারে এগারো টাকা ছিল। যখন টাকা পাঠাতে শুরু করলাম, তখন সেই নব্বই সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতিতে দ্রুত ধ্বস নামছে, এবং টাকার মূল্য ভীষণ গতিতে নেমে যাচ্ছে।
হয়তো আমাদের পাঠানো পঞ্চাশ ডলারে আমার বাবা তখন পেতেন মাসে মাসে পনেরোশো টাকা। তখনকার খরচের হিসেবে মোটামুটিভাবে দুজন মানুষের হয়তো চলে যেতো।
আজকে এক মার্কিন ডলারে প্রায় পঁচাশি টাকা। দীর্ঘকাল ধরে বাবার সমস্ত খরচ, নতুন ফ্ল্যাটের ভাড়া, চিকিৎসা, দুবেলা দুজন দেখাশোনা করার দিদি – সবকিছু আমরা পাঠিয়ে এসেছি। মুক্তির বাবা-মা’কে একবার, আমার বাবাকে আলাদাভাবে তিনবার, এবং বাবা, বোন ও আমার ভাগ্নীকে একবার আমেরিকা ঘুরিয়ে নিয়ে গেছি আমাদের দুজনের রোজগারের টাকায়। যতটা পেরেছি, করেছি। নিজেদের সমস্ত জমানো টাকা এবং দুর্মূল্য ছুটি খরচ করে এই সাঁইত্রিশ বছরের মধ্যে অন্তত কুড়িবার কি পঁচিশবার দেশে ছুটে ছুটে গেছি মাটির টানে।
তারপর বাবা দুহাজার সতেরো সালের আগস্টে চলে গেলেন। টাকা পাঠানোর প্রয়োজন ফুরোলো।
এই আমাদের ইমিগ্রেন্ট জীবনের গল্প।
আরো অনেক গল্প আছে। এবারের মতো একটা গল্প বলে শেষ করবো। গল্প মানে নির্জলা সত্যি।
সাদার্ন হিলসে থাকার সময়েই বোধহয় ঊননব্বই সালে হঠাৎ আমার আড়াই বছরের মেয়ে একদিন হাঁটতে গিয়ে টলে টলে পড়ে যেতে লাগলো। তখন সে ভালোই হাঁটতে শিখেছে। আমাদের দোতলার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে যে গাছে-ঢাকা জমিটুকু আছে, সেখানে আমার সঙ্গে ছোট্ট ফুটবল নিয়ে খেলে। প্রাণশক্তিতে ভরপুর। বাংলা গান গায়, আবোলতাবোলের ছড়া বলে। টিভিতে শিশুদের মিউজিক্যাল শো দেখে। আনন্দের সমস্ত হেতু আমাদের এই শিশু।

সাদার্ন হিলসে আমাদের বাড়ির সামনে মেয়েকে ফুটবলের প্রথম পাঠ
তার হঠাৎ এমন হলো কেন?
এসআইইউ’এর ডাক্তাররা পরামর্শ দিলেন, আমরা যেন ওর একটা ব্রেন স্ক্যান করি।
আমাদের মাথায় বাজে ভেঙে পড়লো। ব্রেন স্ক্যান? কেন? কেন?
কিন্তু কার্বনডেলে এম আর আই করানো যায় না। আমাদের যেতে হবে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করে মিসিসিপি নদী পেরিয়ে কেপ জিরার্ডো বলে একটা ছোটো শহরের হাসপাতালে। সেখানে মেয়েকে রেখে ওরা নানারকম পরীক্ষা করবে। ওখানে থাকতে হবে কয়েকদিন।
আমরা পাগলের মতো ছুটলাম। সে হাসপাতালের গেস্ট রুমে থাকলাম আমরা দুজন।
মেয়েকে ওরা ঘুম পাড়িয়ে ঢুকিয়ে দিলো এম আর আই মেশিনের গহ্বরে। একবার, দুবার।
মস্তিষ্কে কোনো রোগ ধরা পড়লোনা। ডাক্তাররা হতভম্ব।

কোথায় হারিয়ে গেছে সেসব দিন। আমার মেয়ে আর কোনো এক বন্ধুর শিশুসন্তান
তারপর তার সেই ছোট্ট শরীরটাতে অজস্র ছুঁচ ফুটিয়ে নানা টেস্ট করা হলো, আর রক্ত নেওয়া হলো। ধমনীর রক্ত, শিরার রক্ত। ধমনীর রক্ত নেওয়ার জন্যে গভীর ছুঁচ। আমাদের আড়াই বছরের মেয়েটা সারাদিন ধরে বাবা, বাবা বলে আমাকে ডাকতে লাগলো। আর আমরা দুজন চোয়াল শক্ত করে সহ্য করতে লাগলাম।
তিন চারদিন পরে তার উপসর্গগুলো নিজে থেকেই চলে গেলো। মেয়ে আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করলো।
আমেরিকার ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত দিলেন, কোনো এক অজানা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে এমন হয়েছিল। বিপদ এখন কেটে গেছে।
আমরা এক সন্ধ্যেবেলা কার্বনডেল ফিরে এলাম।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
