মেরিকামায়া সাতকাহন : বিদেশে নিজের হাতে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন তৈরি করে ফেললাম

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২৬

পঞ্চবিংশ পর্বের পর

রাজনীতির সঙ্গে আরো অনেক বেশি জড়িয়ে পড়লাম এসআইইউ’তে এসে।

পঁচিশ ছাব্বিশ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে যেমন বলেছি, হয়তো দশ পার্সেন্ট ফরেন স্টুডেন্ট আমাদের মতো, তেমনই আবার গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অর্থাৎ যারা মাস্টার্স বা পিএইচডি করে তাদের সংখ্যাও আরো দশ কি পনেরো পার্সেন্ট হবে। বিশাল সংখ্যক এই গ্র্যাজুয়েট লেভেলের ছাত্রছাত্রীদের ইউনিয়ন রয়েছে। তার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হল। বিল বোধহয় ভিয়েতনাম ভেটারেন। ওর বয়স সেই সময়েই চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ মতো হবে নিশ্চয়ই। লম্বা কাঁচাপাকা দাড়ি আর চুলে আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় ওকে আরো বয়স্ক দেখায়।

সারা ইউনিভার্সিটির অবিসংবাদিত নেতা। বিল আর ওর বউ সুসান দুজনেই লীডার। মাঝে মাঝেই ওদের ছবি আর নানা বিষয়ে কথা ক্যাম্পাস সংবাদপত্র ডেইলি ইজিপ্সিয়ানে বেরোয়।

এমনকী, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে আলোচনা বা প্রেস কনফারেন্স থাকলে স্থানীয় পেপার দ্য সাদার্ন ইলিনয়ান কাগজেও বেরোয়। সুতরাং এরা দুজন যাকে বলে বিগ শট।

ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দিনে ডাকাতি রুখে দেওয়ার পর স্টুডেন্ট মহলে আমার একটা পরিচিতি হয়ে গেলো। বিল আর সুসান আমাদের বাড়িতে এসে একদিন ডিনার খেয়ে গেলো, মুক্তির হাতের ভারতীয় রান্নার প্রশংসা করে গেলো, আর দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে গেলো।

“তুমি জানো পার্থ আজ পঁচিশ হাজার স্টুডেন্টের প্রত্যেককে ওয়ান হান্ড্রেড ফিফটি ডলার্স করে বাঁচিয়ে দিয়েছে?” মুক্তি শুনে তো অবাক!

আমি স্কুলের এসব কথা ওকে বলিনি। একদিকে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ও একা হাতে সবদিক সামলাচ্ছে। তার ওপর কাজকর্ম পাচ্ছে না বলে মন খারাপ। কলকাতায় থাকতে বড়িশা বিবেকানন্দ কলেজে বোটানির অধ্যাপিকার চাকরি পেয়ে চমৎকার দিন কাটাচ্ছিল। আমরা উঠে এসেছিলাম আমাদের সেই পুরোনো গোয়াবাগানের ছাদে মাথা ঠেকে যাওয়া ফ্ল্যাট থেকে গাছপালায় ঘেরা তিন রুমের প্রায় বিলাসবহুল একটা ফ্ল্যাটে সেই বেহালা ঠাকুরপুকুরে – মুক্তির চাকরিতে যেতে সুবিধে হবে বলে। দশ মিনিটের বাস রাস্তার মধ্যেই কলেজ। জনপ্রিয় ইয়ং টীচার। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমেরিকায় আসার কোনো দরকারই ছিলো না ওর। কেবলমাত্র আমার জেদের জন্যে বা বলা যায় আমার আর কোনো উপায় না থাকায় ও আজ সবাইকে ছেড়ে, বাবা-মা, কাকা-কাকীমা, মামা-মামী সবাইকে ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে এই প্রবাসে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

তার ওপর স্টুডেন্ট স্পাউস ভিসায় থাকার কারণে কাজকর্ম পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। মানে, কাজ করতেই পারে বিনা পয়সায়। সেই যেমন আইএসইউ’তে ডঃ এন’এর কাছে কাজ নিয়ে দেশ থেকে আসার সুযোগ পেয়েছিলো। কিন্তু বাংলায় আমরা যাকে বলে থাকি “অনাহারী।” কিন্তু একটা পয়সা রোজগার করার উপায় নেই। স্বাধীনচেতা মেয়ে। এভাবে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকার মেয়ে ও নয়।

এসব কারণে মন ওর এমনিতেই ভালো থাকে না। বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র সন্তান। তাঁদের ছেড়ে থাকতেও ভালো কি আর লাগে? লাগে না মোটেই। ওই ছোট্ট মেয়েটাই ওর একমাত্র সুখের, আনন্দের কারণ এই সুদূর নির্বাসনে। মেয়েটা একটু একটু করে কথা বলতে শিখছে। হাঁটতে শিখছে। আমাদের সাদার্ন হিলস স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সামনে গাছে ঢাকা জায়গাটায় দৌড়োদৌড়ি করে। ওকে একটা বাচ্চাদের ফুটবল কিনে দিয়েছি। একটু একটু করে শেখাই খেলতে। দোলনা টাঙানো আছে কয়েকটা। আরো যারা গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট ফ্যামিলি এখানে থাকে, তাদের বাচ্চারাও খেলে ওখানে।

সাদার্ন হিলস অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে আমাদের বাড়ির সামনে মেয়ে। হলুদ জামা পাঠিয়েছিল আমার মাসি — কার হাত দিয়ে যেন

ঠিক পাশের বাড়িটাতেই একতলায় রেখা বলে একজন ভারতীয় মহিলা তাঁর পরিবার নিয়ে থাকেন। দুটো ছোটো ছোটো ছেলে। স্বামী স্টুডেন্ট। আর ওদিকের একটা বাড়িতে দোতলায় আমাদের মতো একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকে একটা নেপালি পরিবার। তাদের গৃহকর্ত্রীর নাম রচনা। স্বামী স্টুডেন্ট। আমাদের সবারই জীবনের গল্প মোটামুটি একরকম। এই দুই পরিবারের সঙ্গেই আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল একটু একটু করে।

বিলের কথা শুনে মুক্তি বললো, “ওহ আই ডিড নট নো।” জিজ্ঞেস করলো, “ওকে কোনো বিপদে পড়তে হবে না তো?”

আমাদের জীবনে আশঙ্কা এখন নিত্যসঙ্গী। আর কোনো বিপদ আমরা চাই না। অনেক হয়েছে।

সুসান ওকে আশ্বস্ত করলো।

“ডোন্ট ওয়রি। ভয় পাবার কোনো কারণই নেই। হোয়াট হি ডিড ইজ জাস্ট অসাম।” আমি যথারীতি দাঁত বের করে বসে থাকলাম।

আমাদের এই স্কুলে কিন্তু আরো একজন ছাত্রনেতা আছে। সে হলো আন্তর্জাতিক স্টুডেন্টদের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে, যারা প্রতি বছর স্কুলের শাসকদের প্রশ্রয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল করে, তার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। সে আবার দিল্লির বাঙালি, নাম নবারুণ ঘোষ। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, কোনোদিনই তার সঙ্গে এবং তার ওয়াইফ সুস্মিতার সঙ্গে আমাদের কোনো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। এই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির স্ক্যামের বিরুদ্ধে যে কাজটা আমি করেছিলাম, সে ব্যাপারে কোনো সাহায্যও তার কাছে কখনো পাইনি, বা কোনো প্রশংসাসূচক কথাও কখনো শুনিনি। কে জানে, হয়তো আমাদের দুজনেরই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একটা অদৃশ্য গণ্ডি ছিল। নবারুণ আমার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, লেখার ক্ষমতা, রাজনীতির জগতে কাজ করার ক্ষমতাকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। দিলেও আমি জানি না। আমাকে কখনো বলেনি। হয়তো একটা অদৃশ্য টার্ফ ব্যাটল ছিল।

আমাদের সাড়ে চার বছরের কার্বনডেলের জীবনে বহু বন্ধু বান্ধবী হয়েছে। কিন্তু এই দম্পতির সঙ্গে কখনো বন্ধুত্ব তেমন হয়নি।

সুসান হিসেব করে দেখালো, ছাত্রছাত্রীদের এক বছরেই অন্তত সব মিলিয়ে তিন মিলিয়ন ডলার সেভ হয়ে গেছে।

আমাদের প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে এসব কথা জানাজানি হবার পরে আমার সেখানেও খাতির অন্যরকম হয়ে গেলো। আমি নিজে থেকে কিছু বলিনি। কিন্তু এসব খবর কি আর চাপা থাকে? এমনিতেই আমাদের ডিপার্টমেন্টে সেই যাকে আমি ডঃ ভয়গট বলে ডাকতাম, সেই জন ভয়েট আদ্যিকালের কায়দায় ডিপার্টমেন্ট চালাচ্ছেন, যেখানে নতুন কিছু শেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। পুরোনো বস্তাপচা সব ক্লাস, আদ্যিকালের রিসার্চ। কেউ জানেই না এসআইইউ প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের নাম। সেই আমাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই অনেকটা। কোনো পরিবর্তন নেই, কোনো আধুনিক গতি বা দিকনির্দেশ নেই।

আমাদের প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট এই লাইফ সায়েন্স টু বাড়ির তিনতলায় ছিল

সেই নিয়ে আমি আর কয়েকজন সহছাত্র ও ছাত্রী দল বেঁধে একটা পিটিশন দিয়েছি ভয়েটের সেক্রেটারি মিসেস বেটি গ্রাফের কাছে। আমিই তার পাণ্ডা। একেবারে আনকোরা নতুন একটা ছেলে এসে ডিপার্টমেন্টে গোলমাল বাধাচ্ছে। ওল্ড জেনারেশন প্রফেসররা খুব একটা খুশি নয়। ভয়েট তো খুব অখুশি।

আমার নিজের মেজর প্রফেসর ওয়াল্ট সান্ডবার্গও সেই ওল্ড স্কুলেরই লোক। মুখ দেখলাম অন্ধকার। এই লোকটার সঙ্গে পরে আমার অনেক খটাখটি হয়েছে।

কিন্তু একজন বিরাট ফোর্স ছিলেন আমার পাশে। প্রফেসর লরেন্স ম্যাটেন – যিনি এক বছর পরেই হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হয়েছিলেন এবং সবাই তাঁকে খুব মান্যগণ্য করতো আগে থেকেই তাঁর বুদ্ধিদীপ্ততার জন্যে, কোনো কারণে তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতে আরম্ভ করেছিলেন। এবং আমি যে পিটিশন করেছিলাম আধুনিক কারিকুলাম চালু করার জন্যে, তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। ল্যারি ম্যাটেন আমার পাশে থাকায় আমাকে কখনো কোনো বিপদে পড়তে হয়নি।

প্রফেসর লরেন্স ম্যাটেন

এবারে আমি আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রথম গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন তৈরি করে ফেললাম। বিল, সুসান এদের সাহায্য নিয়ে আমাদের নিজস্ব একটা সংবিধান আর বাই-ল লিখে ফেললাম। সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি প্ল্যান্ট বায়োলজি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রথম প্রেসিডেন্ট আমিই।

আত্মশ্লাঘার মতো শোনাচ্ছে হয়তো। কিন্তু যে-আমি দুবছর আগেও খুব শেকি, নার্ভাসভাবে আমেরিকায় ছাত্রজীবন শুরু করেছিলাম, যে-আমি ইংরিজিতে কথা বলতে পারতাম না, যে-আমি পড়ার চাপ সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আর কোর্স ড্রপ করে দিতে হয়েছিল, এই নতুন স্কুলে এসে আমার যে ট্রান্সফরমেশন হয়েছিল, আমূল রূপান্তর হয়েছিল, তার কথা না বললে আমার এই স্মৃতিকথা বিশ্লেষণহীন একটা গতানুগতিক বর্ণনা হয়ে পড়বে।

চরিত্রের এই বিবর্তনটা কেমন করে হচ্ছে, সেটা বলতেই হবে আমাকে।

ইংরিজিতে কথা বলি নিশ্চয়ই এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এতকিছু কাজ করছি, আর সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। অধ্যাপক, অধ্যাপিকা, কলীগ ছাত্রছাত্রীরা তো বন্ধুর মতো। তার ওপর আছে পড়াই যাদের, সেই আমেরিকান ছাত্রছাত্রীরা। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে খুব বেশি সখ্য হয়েছে, যদিও পেশাদারিত্ব বজায় রাখবার জন্যে একটা দূরত্ব আছেই। যত কথা বলছি, তত ইংরিজি বলার কায়দা, উচ্চারণ, নানারকম শব্দ ও ইডিয়ামের প্রয়োগ আরো ভালো করে শিখছি।

আমেরিকার এই দক্ষিণ দিকের রাজ্যগুলোতে একটা বিশেষ জিনিস আছে। হয়তো এখানকার সবুজ গাছপালায় ঢাকা প্রকৃতিই তার জন্যে দায়ী।

এখানকার মেয়েরা, কী আর বলবো, অনেক বেশি ইয়ে … মানে … আমারই কয়েকজন ছাত্রী আছে বায়োলজি ক্লাসের। মারাত্মক সুন্দরী। অনেকেরই চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।

স্বাস্থ্যবতী তো মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত মার্কিনি মেয়েরা সবাই। কিন্তু দাক্ষিণাত্য এখানকার নারীদের একটা আশ্চর্য সৌন্দর্য দিয়েছে।

প্রতি সপ্তাহে আমি আমার বাধ্যতামূলক অফিস আওয়ারে দুঘণ্টা বসে থাকি। ওরা আসে পড়া বুঝে নিতে।

সুন্দরী যুবতী নারীরাই বেশি আসে। সুন্দর যুবক পুরুষরাও আসে, তবে খুব কম।

(চলবে…)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia