
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২৫
নতুন স্কুল, নতুন জীবন
দক্ষিণ ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় বা এসআইইউ’তে এসেই কেমন করে যেন রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম।
আমেরিকার ভাষায় হলে বলতাম, “লাইক, ঢেঁকি ইজ মাই মিডল নেম, সো…”
এর যেন আবার আক্ষরিক অর্থ করে বসবেন না। না, আমার নাম পার্থ ঢেঁকি ব্যানার্জী নয়। ওটা একটা বাগধারা। যেমন, আপনি যদি কাঠের কাজ খুব ভালো জানেন, তাহলে বলতে পারেন, “উডস্মিথ ইজ মাই মিডল নেম।” যদি গাড়ি চালানোতে আপনার বিশেষ দক্ষতা থাকে, বলতেই পারেন, “ইউ নো, ড্রাইভিং ইজ মাই মিডল নেম।” এইরকম আরকি।
আমি যদিও সেই বাংলার ডাকাত বইয়ের সর্বানন্দ ঢেঁকির মতো মাথার ওপরে সুদর্শন চক্রের মতো ঢেঁকি ঘুরিয়ে ডাকাতের দলকে ঘায়েল করে কখনো দিইনি, কিন্তু এই মার্কিন মুলুকে আমার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার ঢেঁকিকথা কিছুটা হলেও বলার মতো বৈকি।
আমিও ডাকাত ধরে দিয়েছিলাম। হুঁহুঁ বাবা, ইয়ার্কি নয়।
ব্যাপারটা ঘটলো এইভাবে। তবে, তার আগে সে নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ডটা আগে একটু দিয়ে ফেলা যাক।
স্প্রিং সিমেস্টারের ঢুকলাম নতুন স্কুলে। নতুন ইউনিভার্সিটি। অনেকদূর ছড়ানো বিরাট ক্যাম্পাস। চতুর্দিক ঘন সবুজ গাছপালায় ঢাকা, যদিও শীতের মধ্যে এসেছি বলে পাইন, জুনিপার, আর ঐসব চিরহরিৎ বৃক্ষ ছাড়া আর কোনো গাছে পাতা নেই। কিন্তু বোঝা যায়, আইএসইউ’এর তুলনায় একেবারে যেন বৃষ্টি অরণ্য। ক্যাম্পাসের মাঝখান দিয়ে একটা সরু নদীও বয়ে গেছে। তার ওপর দিয়ে একটা সাঁকো।
বাংলায় যাকে বলে বিউটিফুল।
দক্ষিণ ইলিনয় উত্তর ইলিনয়ের থেকে ভৌগোলিকভাবে একেবারেই আলাদা। কে বলবে, এই রাজ্যেরই অন্য একদিকে শিকাগোর মতো বিশাল গমগমে মেট্রোপলিস, আর ভীষণ মারাত্মক শীত আর বরফ। উত্তরমেরু থেকে হাহা করে ছুটে আসা, মিশিগান লেকের ওপর দিয়ে বয়ে আসা শৈত্যপ্রবাহ হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ফুটো করে দিয়ে চলে যায়। এখানে শীত আছে খুবই, এবং বাংলার কোমল উত্তাপ থেকে আসা আমাদের মতো যারা তাদের জন্যে সে শীতও হেলাফেলা করার মতো নয়।
কিন্তু ওই যে বলেছিলাম, কামারের হাপর দিয়ে আগেই কাস্তে কোদাল হাতুড়ি হয়ে বেরিয়ে চলে এসেছি। এখন এ শীত আমাদের কাছে কিস্যু না। বরফ ওই একবারই পড়েছিল বলার মতো। তারপর থেকে কার্বনডেলের সাড়ে চার বছর সেরকম ব্লিজার্ড আর দেখিনি। আমাদের ছোট্ট মেয়ে স্নোম্যান বানানোর জন্যে যথেষ্ট বরফ খুঁজে পেতো না।

স্নো ম্যানের সঙ্গে মেয়ে। কার্বনডেলে সামান্য তুষারপাত। তাই দিয়েই স্নো ম্যান
অনেক বেশি ছাত্রছাত্রী। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অফিসের হাসিখুশি, ছোটোখাটো অ্যাডভাইজার অফিসার কার্লা কপ্পি। হাসিখুশি, কিন্তু প্রবল প্রতাপ। বিরাট দায়িত্ব। পঁচিশ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে দশ পার্সেন্ট আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট তো হবেই। তার মানে, আড়াই হাজারের মতো। সঠিক সংখ্যাটা আমাদের বান্ধবী নাসীম আহমেদ আর পরবর্তীকালে গ্র্যাজুয়েট স্কুলের ডীন হওয়া রত্না সিনহাকে জিজ্ঞেস করলেই হবে। দুজনেই কার্বনডেলে উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে কাজ করে গেছে বহু বছর – আমরা ছেড়ে চলে আসার পরেও।

কার্লা কপ্পি

রত্না সিনহা
সবচেয়ে বড়ো কথা, কত দেশের ছাত্রছাত্রী যে এখানে এসেছে! সেই উজবেকিস্তান থেকে আমাদের মতো উজবুক, আর মেক্সিকো থেকে নানা রঙের মিক্স, আর চেনা চেনা চীনা থেকে সম্পূর্ণ অচেনা সব দেশের মানুষ। “নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান” গানের নতুন সংস্করণ চোখের সামনে দেখে ফেললাম পরের কয়েকটা বছরে।
আপনাদের কখনো সুদান, সেনেগাল, ব্রেজিল আর মালয়েশিয়ার বন্ধু হয়েছে, আর তাদের সঙ্গে বসে খেয়েছেন? আমরা করেছি। এসব গল্প না বললে এই স্মৃতিকথার কিছুই বলা হবে না।
সুতরাং, ধৈর্য্যং ধরং। অপেক্ষ্যাং করং।
শুনলাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাজার ইউনিভার্সিটির মধ্যে এই এসআইইউসি সর্বোচ্চ সংখ্যার আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট বডির অন্যতম প্রধান। সেটা রীতিমত একটা শ্লাঘার বিষয়, কারণ সুবিশাল ইউনিভার্সিটি অনেক আছে, যেমন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেস, ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান, পেনসিলভ্যানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি যেখানে এডমিশন পেয়েছিলাম কিন্তু টাকা দিতে পারবে না বলে যাওয়া হলো না, তারপর আছে ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা। সেসব জায়গা ছেড়ে এতো বেশি আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী এই এসআইইউসি’তে আসে, নিশ্চয়ই এখানকার সুনাম আছে।
সেটা জানার পর বুকের ছাতি দেড় ইঞ্চি বেড়ে গেলো।
ও হ্যাঁ, জনগণকে জানিয়ে রাখি, এসআইইউসি যদিও শুনতে আমাদের এসইউসি পার্টির মতো লাগে, কিন্তু তা নয়। ওই শেষের সি’টা হলো কার্বনডেল বোঝানোর জন্যে, কারণ এডওয়ার্ডসভিল বলে আর একটা জায়গায় এই স্কুলের দ্বিতীয় একটা ক্যাম্পাস আছে। যদিও ওরা এলেবেলে। আমরা কখনো যাইনি।
আগেই বলেছি, সান্ডবার্গ আমার জন্যে প্রথম সিমেস্টারে একটা হাফ অ্যাসিস্টেন্টশিপ জোগাড় করে দিয়েছিলেন। আইএসইউ’তে সেই ঢুকেছিলাম মাসে তিনশো আশি ডলারের স্টাইপেন্ড নিয়ে। এসআইইউ একটু বেশি দাক্ষিণ্য দেখালো। ফুল স্কলারশিপ মাসে মাসে ছশো পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু স্প্রিং সিমেস্টারের জন্যে যেহেতু আলাদা করে কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হয় না, যা হবার সব ফল টার্মেই ঘোষণা হয়ে যায়, সুতরাং এমনিতে আমার কোনো স্টাইপেন্ড পাওয়ার কথাই নয়। তাও, আমার হতদরিদ্র অবস্থার কথা শুনে সান্ডবার্গ ডিপার্টমেন্টকে বলে কোথা থেকে যেন তিনশো পঁচিশ ডলারের একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। তার মানে, ওই টাকাতেই জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চালাতে হবে। তারপর সামারে জিরো ইনকাম। সেই আগস্ট মাসের মাঝামাঝি আবার ফল টার্ম শুরু হলে তখন আবার আমরা মিলিয়নেয়ার হয়ে যাবো।
অর্থাৎ মাসে মাসে ছশো পঞ্চাশ পাওয়া যাবে। হুররে!
কিন্তু এখন, এই জানুয়ারির ভীষণ শীতে পকেট একেবারেই ঢুঁঢুঁ। সুতরাং, কাজ, কাজ, কাজ। কোথায় পাবো কাজ?
মুশকিল আসান করে দোহাই মানিক পীর। কার্বনডেলে পীর হিসেবে আবির্ভূত হলেন ফরেষ্ট্রী ডিপার্টমেন্টের ডঃ অবারটিন। ভারিক্কি চেহারার বয়স্ক মানুষ, মোটা ফ্রেমের চশমা পরা। কার কাছে যেন খবর পেয়ে গিয়ে দেখা করলাম। তাঁদের একটা প্রোজেক্ট আছে – জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টির পরিমাপ করা, আর তার সঙ্গে সঙ্গে নানাপ্রকার গাছের স্যাম্পলিং করা। তাঁদের একজন ফীল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট লাগবে। মাসে মাসে আরো তিনশো না সাড়ে তিনশো টাকা পাওয়া যাবে।
সান্ডবার্গকে এসে বললাম উল্লসিত হয়ে। তিনি একটু গম্ভীর হয়ে সুতো লাগানো চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে বললেন, “দ্যাটস গুড নিউজ। বাট মাইন্ড ইউ, স্টিল নীড টু ডু আওয়ার ওয়ার্ক।”
অর্থাৎ, কাজ পেয়েছো, ভালো কথা। এক্সট্রা টাকা রোজগার হবে। কিন্তু ভুলে যেওনা, আমাদের এখানকার যে কাজের জন্যে তোমাকে হাফ স্টাইপেন্ড দেওয়া হচ্ছে, সেটাও কিন্তু করে যেতে হবে।
“হুঁ হুঁ জানি রে বাবা।” মনে মনে বললাম। “না খাটিয়ে এমনি এমনি টাকা দেওয়ার বান্দা তোমরা নও।”
আমেরিকার আশ্চর্য সুন্দর বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগটা সেই থেকেই হয়ে গেলো। সে গল্পটাও এখনকার মতো তোলা থাক। সবকিছু আগেই বলে দিলে নাটক জমবে কী করে?
এখন বলি এই রাজনীতি শুরুর নাটকের কথা।
এই স্প্রিং সিমেস্টারে আধপেটা খেয়ে থাকতে হবে, এবং আসন্ন সামারে ফুলপেটা, সুতরাং ভাবতে হবে খরচ কীভাবে কমানো যায়। ফরেষ্ট্রী থেকে উপার্জন করা এক্সট্রা টাকাগুলো মারাত্মক কাজে লাগবে। কিন্তু সামারে কী হবে? অবারটিন বললেন, সামারে কাজটা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। আসল কথা হলো, আমার কাজের মূল্যায়ন করবেন তিনি এখনকার পারফরমেন্স দেখে। তারপর দেখা যাবে, এই আর কী।
এবারে জোগাড় করতে হবে হেলথ ইন্স্যুরেন্সের টাকা। কারণ, সেটা দিয়ে যেতেই হবে, নইলে এই আড়াই বছরের মার্কিন মুলুকের জ্ঞান থেকে বুঝে গেছি, আর যাই করো, দুটো ভুল কদাপি করিও নাকো।
এক, ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস কদাপি যেন লঙ্ঘিত না হয়। সর্বদা খেয়াল রাখিও, তোমার আমেরিকা বাসের অনুমতিপত্র রহিয়াছে। একদিনের জন্যেও যেন সেসব ডকুমেন্টে কোনো গ্যাপ না হয়। তাহা হইলেই সর্বনাশ।
আর দুই, একদিনের জন্যেও যেন মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স গ্যাপ না হয়ে যায়। পরে দেখেছি, সে গ্যাপ হওয়ার জন্যে – মাত্র কয়েকদিনের গ্যাপে – একটা ধনী ইঞ্জিনিয়ার ফ্যামিলি দারিদ্র্যতে তলিয়ে গেছে।
এ বড়ো ভয়ঙ্কর জায়গা রে ভাই। সুতরাং, ইন্স্যুরেন্স থাকা চাইই চাই।
পোস্তায় গিয়ে খবর পেলাম, ইয়ে, নিজেদের প্রয়োজনেই খোঁজখবর করতে করতে আবিষ্কার করলাম, এসআইইউ’তে যে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এই বিশাল পঁচিশ হাজার স্টুডেন্ট বডির জন্যে বীমা বিক্রি করে, তারা গোপনে সামার সিমেস্টারে প্রতি ছাত্রছাত্রীপিছু একশো না দেড়শো ডলার করে প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এবং এমনভাবে করছে, এবং এমন সময়ে করছে, যখন ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকবে, এবং আমরা অর্থাৎ সহায়সম্বলহীন, রাজনীতি থেকে তিনশো মাইল দূরে থাকা বিদেশী স্টুডেন্টরা ছাড়া কেউই বলতে গেলে থাকবে না। এই সুযোগে তারা একবার যদি প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিতে পারে, ফল সিমেস্টারে ফিরে আসার পরে তা নিয়ে তেমন কোনো গোলমাল হবে না, এবং কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধও হবে না।
এমনিতেই আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পরে, এবং বিশেষ করে রোনাল্ড রেগানের সময় থেকে প্রতিবাদ প্রতিরোধ বন্ধই হয়ে গেছে একরকম।
কিন্তু আমি তো এসেছি ঢেঁকি এই স্বর্গেও ধান ভানার জন্যে। এসব দুনম্বরি তো আমার কাছে চলবে না বাবা।
জানতে পেরেই ক্যাম্পাস পেপার “দ্য ইজিপ্সিয়ান” এর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। এবং তাদের কাগজে একাধিক চিঠি লিখে ফেললাম। অন্যায়ভাবে এবং গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে এই হঠাৎ বাড়িয়ে দেওয়া প্রিমিয়ামের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানালাম।

এস আই ইউ’এর দৈনিক সংবাদপত্র দ্য ডেইলি ইজিপ্সিয়ান
প্রচুর গোলমাল হলো বোধহয় ভেতরে ভেতরে। নিশ্চয়ই হলো, কারণ কয়েক সপ্তাহ পরে ঘোষণা করা হলো, এখনকার মতো প্রিমিয়াম বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হয়েছে।
(চলবে…)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
