মেরিকামায়া সাতকাহন : প্রফেসর ক্যাথি গাইস্ট বললেন “আই অ্যাম অল রে”

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১৪

ত্রয়োদশ পর্বের পর

“ব্যথা কৈ সে ফলার

বিঁধেছে যা ধারালো?”

একদিকে আমার আমেরিকাদর্শন হচ্ছে মুহুর্মুহু – প্রথমে এক বছর একা একা, আর তারপর প্রথমে মুক্তিকে নিয়ে, এবং তার আরো এক বছর পরে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে – আর একদিকে দেশে ঘটে যাচ্ছে ঘটনা। আমরা দূর থেকে বসে বসে সে খবরগুলো পাচ্ছি একের পর এক।

প্রিয়জন, অতি প্রিয়জনের চলে যাবার খবর। যে শোক এই সাঁইত্রিশ বছরে কতবার যে তাড়া করে বেড়িয়েছে, তার ঠিকঠিকানা নেই। কিন্তু প্রথম দুটো বছর, তিনটে বছর সে শোক সহ্য করতে অনেক বেশি সময় লাগতো। বহু বহু দূরে দীর্ঘকাল থাকলে যে ফিল্টারটা মনের ভেতরে, মগজের ভেতরে তৈরি হয়ে যায়, তা তখন তৈরি হয়নি। চিঠি লেখার সেই যুগে, যখন ফোন ছিল অতি মহার্ঘ্য, আর ইন্টারনেট, ইমেল, ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ আর স্কাইপ ছিল সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে, তখন খবর আসতো চিঠিতে। সেই নীল নীল সবুজ সবুজ এয়ারোগ্রাম, আর তার পাশে ওপরের ডানদিকে একটা অশোকস্তম্ভ মারা স্ট্যাম্প। যে স্টাম্পে তারিখ পড়তে পারার কথা, কিন্তু প্রায় কখনোই পড়া যায় না।

সে সময়কার এয়ারোগ্রাম, যার তারিখ পড়া যায় না

খবর এলো আমার দিদিমার মৃত্যুর। দিদিমা, যাকে আমি ডাকতাম দিদি। যার কথা ঘটিকাহিনিতে অনেক লিখেছি। যে দিদি আমার ছোটমামার – দিদিমার অতি আদরের ছোট ছেলের – রাজনৈতিক দলাদলিতে খুন হয়ে যাবার পরেও “আমায় সকল রকমে কাঙাল করিয়া গর্ব করিছ চুর” গাইতো জানালার ধারে বসে বসে। যে দিদি আমাকে প্রথম রূপকথার গল্প শুনিয়েছিল। উমনো ঝুমনো, লাউ গড়গড় বুড়ি, পিপুফিশো। তারপর তার নিজের লেখা গল্প। ক্লাস থ্রী পর্যন্ত পড়া, ন’বছর বয়েসে বিয়ে হয়ে যাওয়া আর তেরো বছর বয়েসে প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়া তপবালা ভট্টাচার্য্য আমার জীবনে এক উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।

আমার মায়ের মতোই ক্যানসারে ভুগে ভুগে চলে গেলো সে। আমি বিদেশে। শেষবারের মতো একবার দেখতেও পেলাম না।

মুক্তির মা এক পরিচিত মামাকে খুঁজে বের করলেন। আমার শ্বাশুড়ি কাজ করতেন পোস্ট অফিসে। সে সময়ে যাকে বলা হতো পোস্ট এ্যান্ড টেলিগ্রাফ। অফিসতুতো মামা কাজ করতেন কোনো এক টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। অনেক রাতে যখন দেশে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তিনি যেতেন তাঁর অফিসে, এবং সেখান থেকে ফোন করতেন আমাদের। হয়তো তিন মাসে একবার। মেয়েকে দীর্ঘ এক বছর না দেখে তিনি অতি কাতর হয়ে পড়েছিলেন। হওয়ারই কথা। একমাত্র মেয়ে, বাবা ও মায়ের অতি আদরের। কোনোদিন তাঁরা ভাবেননি সে মেয়ে আবার কখনো বিদেশে চলে যাবে, আর তার সঙ্গে বহুকাল আর দেখাই হবে না।

আধঘন্টা, পঁয়তাল্লিশ মিনিট ফোন করতেন তিনি। তার মধ্যে পনেরো মিনিট কাঁদতেন শুধু। আর জিজ্ঞেস করতেন আমরা কবে দেশে ফিরে আসবো।

ফোন রেখে দেওয়ার পরে এবারে এদিকে মুক্তির চোখ মোছার পালা।

আমাদের মেয়ে হওয়ার পর শুধু তার হাসি বা কান্নার আওয়াজ শুনতেন তিনি ফোনটা কানে চেপে ধরে। মেয়ে চীৎকার করে কেঁদে উঠলে তিনি বলতেন, “ওরে বাবা, সে তো খুব জোর হয়েছে দিকি গায়ে।” তাতেই আনন্দ।

এইভাবে কেটে গিয়েছিলো অনেকগুলো বছর। আমি এসেছিলাম আমেরিকায় পঁচাশিতে। প্রথমবার দেশে যেতে পারলাম চুরানব্বইতে। যাক, সে গল্প পরে বলা যাবে এখন। রক্ত বেরোতো ধারালো ফলার আঘাতে। ব্যথা মুখ বুজে সহ্য করতাম আমরা। দেখাতাম, ব্যথা নেই।

দেশে যারা থাকতো, তারা কখনো সেসব কথা জিজ্ঞেস করেনি আমাদের। আহা, আমরা আমেরিকায় থাকি কিনা!

এবারে আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো, বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের বাইরেও আমি কেন ক্লাস নিতে পারবো না? প্রথম প্রথম সব ব্যাপারেই যে ইন্ডিয়া থেকে নিয়ে আসা ভীতি ছিল, তা একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছিল বছরখানেক এদেশে থাকার পর।

আই এস ইউ থেকে পাওয়া ডিপ্লোমা

আমেরিকান কিছু বন্ধু ও বান্ধবী হয়েছিল। যেমন, আমার সঙ্গে যে মেয়েটা একসঙ্গে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের ল্যাবরেটরি ক্লাস নিতো। কী যেন নাম মেয়েটার, ডেবি মনে হয়। না কি, রেবেকা অর্থাৎ সংক্ষেপে বেকি। এতদিনে নামটামগুলো বেশি সড়গড় হয়ে এসেছে। ডেবোরা হলো ডেবি, রেবেকা হলো বেকি। রিচার্ড হলো জ্যাক, টিমোথি হলো টিম। এ্যালেক্স ছেলে বা মেয়ে সবারই নিকনেম হতে পারে, কিন্তু ছেলে হলে সে খুব সম্ভবতঃ এ্যালেকজান্ডার, আর মেয়ে হলে এ্যালেকসিস বা এ্যালেকজান্দ্রা। বা, হয়তো অ্যালেকসা। তারপর ড্যানিয়েল থেকে ড্যান, টমাস থেকে টম, পেনিলোপি থেকে পেনি, ক্যাথরিন থেকে ক্যাথি। আমাদের দেশের মতো নামের বৈচিত্র্য আমেরিকা বা ব্রিটেনে নেই। কিন্তু লাস্ট নেম অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সারনেম, তার কোনো শেষ নেই। এবং তার কোনো মাথামুণ্ডুও নেই। একদিন আই এস ইউ’র সায়েন্স লাইব্রেরিয়ান জর্জ ব্ল্যাকের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেখা করতে গেলাম কী একটা কাজে। গিয়ে দেখি, ওমা, এ কী রে, ভদ্রলোক মোটেই কালো নয়, একেবারে ধবধবে ফর্সা। আমি তো হাঁ করে গাড়লের মতো তাকিয়ে থাকলাম খানিকক্ষণ। ওদিকে আবার ব্যাডমিন্টন ক্লাবে সন্ধেবেলা নাম লেখাতে গিয়ে দেখি, এক ভদ্রলোক যিনি রেজিস্ট্রেশন করে দিচ্ছেন, তাঁর নাম ফর্স্টার হোয়াইট। মিশমিশে কালো।

রাত্তিরে সেদিন ঘুমই হলো না ভালো।

তা, সেই সব ছাত্রছাত্রী কাম কলিগ কাম বন্ধুদের কাছে খোঁজখবর করে দেখলাম, ফল বা স্প্রিং সিমেস্টারকে না চটিয়ে সামারে এটা সেটা ক্লাস নেওয়া যেতেই পারে। কেউ তেমন কেয়ার করে না ডিপার্টমেন্টে। সামারে এমনিতেই সব ধুধু ফাঁকা। চারদিকে শুধু আমাদের মতো হতভাগা ভারতীয় আর চীনা, কোরিয়ান আর ফিলিপিনো ছাত্রছাত্রীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাদের কোথাও যাবার নেই। বাকী সব আমেরিকান স্টুডেন্ট বাড়ি চলে গেছে।

আমার এক কোরিয়ান বন্ধু হয়েছিল – তাকে আমরা ডাকতাম রো বলে। রো আমাকে প্রথম স্টুডেন্ট সেন্টারে ম্যাকডোনাল্ড নামে একটা দোকানে খাইয়েছিল। সেই নিরানব্বই সেন্টের ফিশ ফিলে খেয়ে আমার সে কী আনন্দ – ওই ঠিক এখন যেমন আমাদের কলকাতার বাড়ির কাছে এ্যাক্রোপলিস মলে সবাইকে কেএফসি আর বার্গার কিংয়ের দোকানে জুলজুল করে যেতে দেখি।

ভাবলে হাসি পায় এখন – সম্পূর্ণ বিষাক্ত খাবার কীভাবে কেবলমাত্র বিজ্ঞাপনের জোরে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলা যায়। তখন আমি নতুন রুকি ছাত্র, পকেট ঢুঢু, আমেরিকা সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, তার ওপর আবার কোরিয়ান বন্ধু নিরানব্বই সেন্ট। সব মিলিয়ে হৈহৈ ব্যাপার। কোকাকোলাকে যে আবার কোক বলে, সেটাই জানতাম না আমার মতো চূড়ান্ত নাইভ একটা ছেলে।

রো বললো, সামারে সাঁতার শেখো। ক্রেডিট রিকোয়্যারমেন্ট যখন ফুলফিল করতেই হবে, কোনো উপায় নেই, না হলে হেলথ ইনস্যুরেন্স থাকবে না, তখন কিছু একটা নিয়ে নাও। স্যারা বললো, সিনেমা তোমার এতো ভালো লাগে, ফিল্মের ক্লাস নাও। দুটোই নিলাম। সাঁতারে সুবিধে হলো না তেমন। জলটল খেয়ে আধডোবা হয়ে সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড!

ফিল্মের ক্লাস নিয়ে কিন্তু চোখ খুলে গেলো। না, ঐসব ফালতু পর্ন আর আমাদের দেশের সেই ফিল্ম ক্লাবে যাওয়া কেবলমাত্র নগ্ন নারীদেহ দেখার জন্যে – ওসব নয়। জীবনে প্রথমবার সিটিজেন কেন দেখলাম। গোদার দেখলাম, ফ্যাসবিন্ডার দেখলাম, দেখলাম মার্টিন স্করসেসে। পরীক্ষায় ফাটাফাটি। তাও আমার বই কেনার পয়সা ছিলো না। দু চারটে ছেলেমেয়ে, তারা আবার আমার বায়োলজি ক্লাসে ছিল, তাদের ডর্মে গিয়ে বই দেখে নোট টুকে টুকে নিলাম সেই বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের মতো। তাতেই বাজিমাত। রক্তের মধ্যে হিউম্যানিটিজ আছে। সায়েন্স পড়েছি ঠিকই, কিন্তু … এ গল্পটার বাকী অংশ অনেক বড়ো করে পরে বলার আছে।

সিনেমার জগৎকে তোলপাড় করে দেওয়া ছবি ‘সিটিজেন কেন’ (১৯৪১)

এখন আপাততঃ ছোটো করে বলি। সিনেমার ক্লাসের অধ্যাপক আমাকে একদিন ডেকে পাঠালেন। বললেন, তোমার মতো একজন বায়োলজি গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টের ফিল্মে এতো আগ্রহ দেখে আমি খুব অবাক হয়েছি। আমাকে বললেন, এখানে একজন প্রফেসর আছেন ফিল্ম এ্যান্ড ড্রামা ডিপার্টমেন্টে। তিনি ইন্ডিয়ান ফিল্ম নিয়ে কাজ করেন। তুমি তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করো। তোমার ভালো লাগবে।

প্রফেসর ক্যাথি গাইস্ট। তখন ওসব বুঝতাম না। দারুণ হাসিখুশি, একেবারে ফ্রেণ্ডলি বছর তিরিশ পঁয়ত্রিশের মহিলা। আমার সঙ্গে বসে দু’ঘন্টা ধরে সত্যজিৎ রায় নিয়ে আলোচনা করলেন। আলোচনা মানে আড্ডা। আমি মৃণাল সেন ঋত্বিক ঘটক নিয়ে আসাতে বললেন, “ইউ ক্যান সে হোয়াটেভার ইউ লাইক, বাট আই অ্যাম অল রে।” নাচতে নাচতে সেদিন বাড়ি ফিরলাম। যদি বুদ্ধি তেমন থাকতো, আর মার্কিন ইউনিভার্সিটির হাজার সম্ভাবনা সম্পর্কে একটু জ্ঞান, আমি ক্যাথিকে বলতে পারতাম, “হে ক্যাথি, ক্যান ইউ টেক মি ইন এ্যাজ এ ট্রান্সফার স্টুডেন্ট – ফ্রম বায়ো টু ইওর স্কুল? লুক, আই অ্যাম অল রে টু।”

জীবনটা তখন থেকেই অন্যরকম হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। অনেক, অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল তার জন্যে।

আমি বায়োতেই ঘষে যেতে লাগলাম। আর সপ্তাহে একদিন সন্ধেবেলা রিক্রিয়েশন সেন্টারে গিয়ে ডঃ এন আর তাঁর বাডিদের সঙ্গে ব্যাড ধরনের মিন্টন। তারপর শকিং হলেও সত্যি, শাওয়ারে গিয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে স্নান লকার রুমে জামাকাপড় রেখে। সাঁতারের ক্লাসের পরেও তাই। প্রফেসর, ছাত্র সব একধার সে। সে এক মারাত্মক ব্যাপার!

নগ্নতা যে এতো বেশি লজ্জা পাওয়ার বিষয় নয়, আর নগ্নতা মানেই অসভ্যতা নয়, সেটাও আমেরিকার এই প্রথম স্কুলে মগজে প্রবেশ করতে লাগলো। কে যেন মনের ভেতরে বলতে লাগলো, “ভয় নাই ওরে ভয় নাই।”

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia