
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১৩
সিঁড়িভাঙা এই সবে শুরু হলো…
সেল বায়োলজি ক্লাসটা নিয়েছিলাম ডঃ এন’এর পরামর্শে। উনি বোধহয় ভেবেছিলেন, অধ্যাপক ছিলাম যেহেতু, এসব ক্লাস আমার জন্যে হবে যাকে বলে ‘পিস্ অফ কেক’। হায় রে, আমার শূন্য কলসী যে কতখানি শূন্য, আমার অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম টর্ম দেখে তা উনি ধরতেই পারেননি।
আমিও ভেবেছিলাম, সেল বায়োলজি মানে আর কী – আমরা দেশে যাকে বলতাম সাইটোলজি বা কোষবিদ্যা। ওই উদ্ভিদ কোষ আর প্রাণীকোষের মধ্যে কী কী পার্থক্য, তা লিষ্টি করে লিখে দিলেই মিষ্টি মিষ্টি লম্বর মিলবে।
সেই যে সুন্দরবন কলেজের ছেলেরা আমার নাম দিয়েছিলো “পার্থক্য, পার্থক্য, পার্থবাবুর পার্থক্য।” কারণ, আমার তৈরি প্রশ্নপত্রে “পার্থক্য নির্দেশ করো” – এরকম একটা থাকবেই।
ডঃ ওয়েবারের সেল বায়োলজি নিয়ে হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেলো। জ্বর এসে গেলো ফেল করে। তার ওপর সেই লিটল ব্লুস্টেম কেটে ফেলার মারাত্মক ব্লান্ডার। লাইবারটা যেন মেঘের আড়াল থেকে ঘোষণা করছেন, “ইটস আ মেস।” প্রতিধ্বনি হচ্ছে আকাশে বাতাসে। “ইটস আ মেস।” “ইটস আ মেস।”
উদ্ভিদের হাজার রোগের মধ্যে একটা রোগ
এমন জ্বর এলো যে পড়াশোনা তো দূরের কথা, মাথা তুলে উঠতেই পারি না। আই এস ইউ’এর স্টুডেন্ট ইনফার্মারিতে ভর্তি হতে হলো। ভাগ্যিস, চিকিৎসার খরচ সব ফ্রী।
আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। ক্রেডিট, অডিট, জিপিএ – ফোর পয়েন্ট ও, থ্রী পয়েন্ট ও – এসব কী ব্যাপার কোনো ধারণাই ছিলো না আমার। একেবারে শূন্য থেকে সবকিছু শিখতে হয়েছিল। ফলে, হোঁচট খেতে হয়েছিল, গর্তে পড়ে যেতে হয়েছিল প্রথম দিকে বড্ড বেশি।
শিকাগো স্কাইলাইন যা দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলাম
এদেশের প্রত্যেকটা ব্যাপার সে সময়ে আমার মতো পরিবার থেকে উঠে আসা বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে আর কলেজে পড়া ছাত্রের কাছে – এবং একজন আপাদমস্তক বাঙালি যুবকের কাছে – হিব্রু ল্যাটিন গ্রীকের মতোই ছিল। সে রান্না করাই হোক, ইংরিজি বলাই হোক, শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করাই হোক, বা লেখাপড়া। এই ভীষণ পরিশ্রম! পরিশ্রম কাকে বলে, আমাদের মতো কলকাতার সুখী সুখী ছেলেরা তা জানেই না। গ্রামের ছেলে হলে তাও বা একটু কথা ছিল। কষ্ট ওরা করতে পারে আমাদের থেকে শতগুণে বেশি। আমরা শুধু বড়ো বড়ো কথা বলতেই শিখেছি।
আমাকে সত্যি কেউ কিছু শিখিয়ে দেয়নি, কোনো মেন্টরিং পাইনি, কী করলে ভালো হয়, আর কী করা আমার মতো একজন আনকোরা নতুন বিদেশি ছাত্রের পক্ষে সম্ভব নয়, তাও কেউ বলে দেয়নি, সতর্ক করে দেয়নি।
এদেশে এসে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে নতুন করে ছাত্রজীবন যখন শুরু হলো, তখন জানলাম, প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অর্থাৎ মাস্টার্স বা পিএইচডি লেভেলের স্টুডেন্ট যাদের অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেওয়া হচ্ছে, বাধ্যতামূলকভাবে তাদের প্রতি সিমেস্টারে অন্ততঃ এগারো কিংবা বারো ক্রেডিট ক্লাস নিতে হবে। তার মানে হলো, চার ক্রেডিটের তিনটে করে ক্লাস নিতেই হবে, এবং তার ওপরে সপ্তাহে কুড়ি ঘণ্টা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের কাজ – ল্যাবরেটরি ক্লাস পড়ানো, এবং খাতা দেখা। টি এ’দের কম্পালসরি মিটিং সপ্তাহে একবার। এই চার ক্রেডিটের ক্লাসগুলো হলো সবচেয়ে বেশি ওয়ার্ক লোড। প্রচুর পড়াশোনা, লেকচার ক্লাস সপ্তাহে অন্তত দুদিন, এবং প্রতি মাসে পরীক্ষা। ক্লাসের মানও খুব কঠিন।
তিন ক্রেডিটের ক্লাসও নিতে পারো, কিন্তু তা হতে হবে গ্র্যাজুয়েট লেভেলের – যাকে বলা হয় থ্রী হান্ড্রেড বা ফোর হান্ড্রেড লেভেলের ক্লাস। একশো লেভেলের ক্লাসগুলো হলো একেবারে সবে কলেজে ঢুকেছে, সেই ফ্রেশম্যানদের জন্যে। তারপর এক বছর পড়লে নিতে পারবে দুশো লেভেলের ক্লাস। আমি এসব কিছুই জানতাম না।
দৈত্যাকার সীয়ার্স টাওয়ার – এর স্থপতি ছিলেন কিন্তু একজন বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর খান এবং ভারতীয় শ্রীনিভাসা
মাইকেল বলে একটা বন্ধু কাম ছাত্র ছিল আমার। হাসিখুশি, আর সদয় ব্যবহার। তাকে বললাম (এখানে বাংলায় বলছি), “মাইকেল, সত্যি কথা বলতে আমি সবে আমেরিকায় এসেছি, এসব জটিল ব্যাপার কেউ একটু না বুঝিয়ে দিলে আমার পক্ষে তো …”
মাইকেল হয়তো হেসে উত্তর দিলো, “ইয়া ম্যান, ইওর এ রুকী ম্যান। ইওর নাও, লাইক, ইউএসএ ওয়ান ও ওয়ান।” আমি তো এসব কথার কোনো মানেই বুঝতাম না। একটু একটু করে বুঝছি, শিখছি, জানছি। একটু একটু করে আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার দরজা খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে।
রুকী মানে হলো একেবারে আনকোরা। নতুন সৈন্যদের জন্যে এই কথাটা ব্যবহার করা হয়। যাদের গ্রাম থেকে বা শহরের গরিব পাড়া থেকে মার্কিন আর্মি রিক্রুট করেছে নানা প্রলোভন দেখিয়ে। তারপর ভিয়েতনাম, ক্যাম্বোডিয়া, ইরাক বা কোথাও একটা পাঠিয়ে দেবে। তারপর কয়েক মাসের মধ্যে তারা বডি ব্যাগ হয়ে ফিরে আসবে।
এসব জেনেছি অনেক অনেক পরে। সেসব গল্প বাকি থাকলো এখনকার মতো।
জুলিয়েন হল বলে একটা বাড়িতে দোতলায় আরো কয়েকশো ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে লাইন দিয়ে গিয়ে ফর্ম ভরে জমা দিতে হবে। আমাদের মতো যারা স্কলারশিপ পাওয়া ছাত্রছাত্রী, তাদের কোন টাকা জমা দিতে হবেনা। আর বাকি নব্বই শতাংশ স্টুডেন্ট – তাদের প্রায় সবাই আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট – তাদের প্রতি ক্লাস এবং প্রতি ক্রেডিট হিসেবে টাকা জমা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলতে হবে সিমেস্টার শুরু হওয়ার আগে। এক একরকম ক্লাসের জন্যে এক এক রকম ফীজ।
যেমন, কেউ হয়তো আর্চারির ক্লাস নিচ্ছে, তাকে ক্লাসের ফীজ তো দিতেই হবে, তার সঙ্গে তীর ধনুক এসবের জন্যে আলাদা ফীজ। বা, কেউ হয়তো থিয়েটার প্রোডাকশন নিয়ে পড়াশোনা করছে, তাকে কস্টিউম তৈরি করার একটা ক্লাস নিতেই হবে। তার জন্যে আলাদা টাকা। কত অদ্ভুত রকমের ক্লাসের বর্ণনা যে আমাদের কোর্স ক্যাটালগে থাকতো, তা বলে শেষ করা যায় না।
আমাদের ফর্ম ভর্তি করার সময়ে যে প্রফেসর আমাদের প্রধান এ্যাডভাইসর, তার অনুমতি ও সই থাকতে হবে। অর্থাৎ, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ না করে আমি কোনো ক্লাস নিতে পারবো না।
প্রথম প্রথম এসব নিয়মকানুন আরো বেশি কড়া থাকে। আস্তে আস্তে একটু শিথিল হয়ে যায়। শিথিল হয়ে যাবার পরে আমি কয়েকটা ফ্রেশ-এয়ার ক্লাস নিয়েছি। তার কথা আসবে।
ইনফার্মারী থেকে তিন চারদিন পরে ছাড়া পেলাম। ডাক্তার সহৃদয়। আমার মতো ওই রুকী ছাত্র অনেক দেখেছেন। বললেন, “লুক, ইউ নীড রেস্ট। ক্যান ইউ ড্রপ সাম ক্লাসেস ফর নাও?” আমি তো অবাক! জানতামই না যে ক্লাস নিয়ে আবার ড্রপ করা যায়। ভেবেছিলাম, একবার ড্রপ করলে আমাকেই ইউনিভার্সিটি চিরতরে ড্রপ করে দেবে। এই ভয়গুলো আমাদের দেশে এতো বেশি রক্তের সঙ্গে মিশে থাকে যে চিরকাল তা বয়ে বয়ে বেড়াতে হয়। আমরা ভয় ও রক্তচক্ষুর শিকার।
“ড্রপ সেল বায়োলজি?” ডঃ এন – আমাদের ভারতীয় ছাত্রদের পারের কাণ্ডারি – অতি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। “হোয়াই?”
বুঝিয়ে বললাম। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যাখ্যা করে সে যাত্রা অনুমতি পাওয়া গেলো। বাকি কোর্সগুলো ম্যানেজ করতে অসুবিধে হয়নি। আমাদের লাইবারটার নিজের ক্লাস প্ল্যান্ট প্যাথোলজিতে সিমেস্টারের ওই তিনটে না চারটে পরীক্ষায় প্রত্যেকটাতে একশো পেয়েছিলাম। কারণ, ওই যে বললাম, ভেতরে ঢুকতে হবে কি হবে না, তার ওপরেই সবকিছু। ভাগ্য ভালো, প্ল্যান্ট প্যাথোলজি একটু একটু জানতাম। কলকাতায় সায়েন্স কলেজে ছত্রাক আর উদ্ভিদের রোগ স্পেশাল পেপার ছিল।
চারশোর মধ্যে চারশো। এরকম যে কখনো পাওয়া যেতে পারে আবার, সেই স্কটিশ ইস্কুলের ক্লাস থ্রী ফোরের পরে কখনো জানতাম না। নম্বর তো আমাদের সম্পত্তি নয়, যেন পরীক্ষকের সম্পত্তি। তাঁর পিতৃদেবের। এদেশে এসে প্রথম জানলাম, আমার নম্বর আমারই নিজের সম্পত্তি। তুমি ইচ্ছে হলেই কেটে নিতে পারো না। আমি ঠিক লিখলে আমার নম্বর এক আনা কেটে নেওয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই।
“কেমনে তরিব তারা ভাবি তাই দিনরজনী
কাল হয়ে কালভুজঙ্গ আসিতেছে ধরি ফণী”
মা তারা তরিয়ে দিলেন কোনোরকমে। কেটে গেলো প্রথম সিমেস্টার। কোষতত্ত্ব আর তেমন করে পড়া হয়নি সেই পরের ইউনিভার্সিটিতে যাবার আগে।
ডিসেম্বরের শেষে ফল আর স্প্রিং সিমেস্টারের মাঝের ছুটিতে আট দশদিন কাটিয়ে এলাম বিশ্বদা আর রেবেকা বৌদির বাড়ি। সেই পিওরিয়া চার্টার বাস ধরে দশ ডলার ভাড়া দিয়ে জুলিয়েট বলে একটা ছোট্ট শহরের মলে নেমে পড়লাম। নতুন একটা মোটা জ্যাকেট কিনেছি রঞ্জনের পরামর্শে। দেশ থেকে আনা সেই সেলে কেনা লাল রঙের প্লাস্টিকের কোট দেখে সবাই হাসছিলো।
জুলিয়েটের কাছেই বিশ্ববিখ্যাত শিকাগো শহর। তার একটু দূরেই বিশ্বদার বাড়ি ছোট্ট ঘুমন্ত লাইল।
ঘুমন্ত শহর লাইল
চারদিক তখন বিশাল বরফে ঢাকা। দূর থেকে শিকাগোর আকাশছোঁয়া সিয়ার্স টাওয়ার কিছুক্ষণের জন্যে দেখা দিলো যাত্রাপথে। বিশ্বদা বললো তার মার্কিনি উচ্চারণে, “ইটস ওভার এ হান্ড্রেড স্টোরিজ।”
আমি হাঁ করে থেকে বললাম, “একশো তলা?”
“ওয়েল, দ্যাটস হোয়াট দে সে।” … সে কথাটার পরে একটা সুর আছে, সেটা আমি লিখে বোঝাতে পারলাম না।
নীল রঙের পুরোনো বিউইক গাড়ি ছুটে চললো লাইল গ্রামের দিকে।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
