মাধুরীতে ‘ফিদা’ মকবুল, সাক্ষী শুধু কলকাতা

আজাদ হিন্দ হোটেলের দেওয়ালে মকবুল ফিদা হুসেনের শিল্পকর্ম

যেন এক বহমান চিত্র প্রদর্শনী, বা বলা ভালো কলকাতা তিলোত্তমার বুকে ভালোবাসার দাগের মতন রয়ে যাওয়া এক শিল্পীর চিহ্ন। ফেরেস্তার মতন চেহারার সাদা জোব্বা, সাদা দাড়ির প্রেমিক শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন (Maqbool Fidaa Hussain)-এর শৈল্পিক মনন সমর্পন তাঁর শিল্প চেতনার প্রেয়সীর প্রতি, যার সাক্ষী এই শহরেরই পথ চলতি রেস্তোরাঁ। সাকিন ১২ নম্বর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, গন্তব্য আজাদ হিন্দ হোটেল (Azad Hind Hotel, Ballygunge)।

ৎকালীন মালিক ধর্মবীর শর্মার কাছে আবদার কিছুটা ফাঁকা দেওয়াল তাঁর মর্জির মতন তুলির আঁচড় ফুটিয়ে তোলবার জন্য। শিল্পীর আবদার সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নেন তিনি। প্রথমে চারকোল আর স্কেচপেনের আঁকিবুঁকিতে সাদা-কালোয় ফুটিয়ে তোলা ‘হুসেনীয়’ সভ্যতার ট্রেডমার্ক ঘোড়া সঙ্গে ‘মাধুরীয়’ শরীর বিভঙ্গের মোটিফ রমণী।

প্রেমের শহর কলকাতায় সেই ’৯৬ সাল থেকে গোপন হিকির মতনই বিরাজমান খোদ হুসেনের তুলির আঁচড়। কলকাতায় এলেই উঠতেন বাইপাসের ধারে পাঁচতলা হোটেলে, কিন্তু চায়ের আমেজে গলা ভেজাতে জাঁকজমক হোটেলের তুলনায় বরাবরই পছন্দ করতেন আজাদ হিন্দ হোটেল। কখনও সেদ্ধ আলু বা ছোট্ট কামড় পছন্দের কাবাবে; সঙ্গে পাতা পাল্টানো খোদ তাঁরই জন্য এনে রাখা উর্দু সংবাদপত্রে। যেতেন পাশের ছোট্ট জামা মসজিদে। সই শিকারিদের হাজার অনুরোধ সামলানো বা কারো আবদার মেটাতে খাতা টেনে নিয়ে তাতে ছোট্ট আঁকিবুকি সব কিছুরই সাক্ষী ১২ নম্বর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের এই হোটেল।

সময়টা নব্বইয়ের দশক। একের পর এক ছবিতে রূপের সম্রাজ্ঞী মাধুরী দীক্ষিত (Madhuri Dixit)-এর মারকাটারি সম্মোহন। রূপের মাধুরী, হ্যাঁ স্বার্থকনাম্নীই বটে! আট থেকে আশির হৃদয় জোড়া ‘ধক ধক গার্ল’-এর মুক্ত ঝরানো হাসি আর শরীরী লাস্যে বুঁদ আসমুদ্র হিমাচল। শুধু এ দেশই বা কেন, কাঁটাতার পেরিয়ে পড়শি মুলুকের সেনাদেরও একটাই দাবি কারগিলের যুদ্ধেও, হয় হুরের মতন সুন্দরী মাধুরী নয়তো স্বর্গের মতন কাশ্মীর, দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা দাও তাতে এই জান কবুল যুদ্ধও থামিয়ে দিতে রাজি।

মাধুরীর অগুনতি গুণমুগ্ধের মধ্যে অন্যতম বা বলা ভালো শ্রেষ্ঠ গুণমুগ্ধ অথবা মাধুরীর রূপের প্রতি দীক্ষিত হুসেন তুলে নিয়েছিলেন রং, তুলি, ব্যতিক্রম বলতে শুধু ইজেল ক্যানভাসের পরিবর্তে এক টুকরো সাদা দেওয়াল। ফুটিয়ে তুলতে তাঁর মানসপটের ‘গজগামিনী’-কে, আপন মনের মাধুরী মিশায়ে। তৎকালীন মালিক ধর্মবীর শর্মার কাছে আবদার কিছুটা ফাঁকা দেওয়াল তাঁর মর্জির মতন তুলির আঁচড় ফুটিয়ে তোলবার জন্য।  শিল্পীর আবদার সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নেন তিনি। প্রথমে চারকোল আর স্কেচপেনের আঁকিবুঁকিতে সাদা-কালোয় ফুটিয়ে তোলা ‘হুসেনীয়’ সভ্যতার ট্রেডমার্ক ঘোড়া সঙ্গে ‘মাধুরীয়’ শরীর বিভঙ্গের মোটিফ রমণী। তার ঠিক তিন বছর পরে মাধুরী-অনিল জুটির ‘রাজকুমার’ ছবি মুক্তির পর কলকাতায় ফিরে দেওয়াল চিত্রে রঙিন রুপটান। ঘোড়ার বদলে এবার হাতি সঙ্গে অবশ্যই পুরোনো মাধুরীও সৌন্দর্যের সেই নারী দেহের লালিত্বের শৃঙ্গার। একাধারে মোহময়তার সঙ্গেই নারী সৌন্দর্যের হিল্লোল উদযাপনে যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় হুসেনের কল্পনার গজগামিনী। মাত্র সতেরো মিনিটে শেষ করা মাস্টারপিস।

দেশে বা বিদেশে, মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা শিল্পকীর্তি দেখতে ভিড় জমান তাঁর অগুনতি গুণমুগ্ধ, কিন্তু খোদ কলকাতার বুকে বিরাজমান প্রায় এক জীবন্ত মহব্বতের দলিলের হদিস জানে হাতে গোনা শহুরে বাঙালিই।

সাধারণত ছবিতে একটিই মাত্র সাল বা তারিখের উল্লেখ থাকে, তবে এই ছবিতে সন তারিখের উল্লেখ দুটি, ১৯৯৬ এবং ১৯৯৯, কারণ দু-বারে দুটি আলাদা আলাদা সময়ের নিরিখে যুগপথ ভাবে সৃষ্টির আলো দেখা এই রঙিন ক্যানভাস থুড়ি দেওয়াল চিত্র। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের এই হোটেলে ২০০৫ সাল পর্যন্ত নিয়মিত আসতেন তিনি।

তুলি ইজেল বাদেওদ ক্ষ ফটোগ্রাফার এই শিল্পী কিছু বছর পর ২০০০ সালে ছবি পরিচালনার সময়ও বেছে নেন গজগামিনীকেই এবং সেখানেও তাঁর চির প্রেয়সী মাধুরী। ক্যামেরার আইপিসে চোখ রেখে তাঁর সর্বোচ্চ বিদিত ছবি গজগামিনীর মধ্যে দিয়েই মাধুরীকে তুলে দেওয়া তাঁর সৌন্দর্য অর্ঘ্য, ঠিক যেন ‘ফাউন্টেন অফ ইয়ুথ’ বা রূপের সমুদ্র থেকে আঁজলা ভরা জলের অর্পনে গঙ্গা জলেই গঙ্গা পুজো। মকবুল শব্দের বাংলা তর্জমা প্রসিদ্ধ বা নির্বাচিত, হুসেন সাহেব সত্যিই ছিলেন স্বার্থকনামা শিল্পী, তাঁর নামের মধ্যবর্তী অংশের মতনই রূপের মাধুর্যে ফিদা এক প্রেমিক শিল্পী।

দেশে বা বিদেশে, মকবুল ফিদা হুসেনের আঁকা শিল্পকীর্তি দেখতে ভিড় জমান তাঁর অগুনতি গুণমুগ্ধ, কিন্তু খোদ কলকাতার বুকে বিরাজমান প্রায় এক জীবন্ত মহব্বতের দলিলের হদিস জানে হাতে গোনা শহুরে বাঙালিই। কিছুটা প্রচার বিমুখতা আর নিত্যনতুন গজিয়ে ওঠা ক্যাফে থেকে শুরু করে থেকে তিন তারা, পাঁচতারা হয়ে সাত তারা স্কাই স্ক্যাপার হোটেল-মোটেলের ভিড়ে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের এই হোটেল কিছুটা অন্তরালে চলে গেলেও, পুরোনো অনুরাগীরা এখনও ভিড় জমান এই সাবেকি আস্তানার উষ্ণ আতিথ্য আপ্যায়নের টানে। সোনালি ফ্রেম বন্দি হুসেনের এই দেওয়াল চিত্রকে অপলক তারিফের কুর্নিশ ফিরিয়ে দিতে রোজ সন্ধেয় বসে রঙিন আড্ডা।

Post Tags
Developed by DXDasia