কথা ও সুরের এমন দরদি মিশ্রণ বাংলা গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
ছবির নাম ডাক হরকরা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই মর্মস্পর্শী কাহিনীটির লেখক। ছবিটির জন্য নিজে দু-একটি গানও রচনা করে রেখেছেন। এমনই একটি গান হল ‘ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়।’ ছবিটি তৈরি হয়েছে ১৯৫৮ সালে। ছবির পরিচালক সুধীনবাবুকে মানে সুধীন দাশগুপ্তকে দিয়ে সুর করাবেন বলে ঠিক করলেন। সুধীনবাবু রাজিও হলেন এক কথায়। তার পর একে একে ছবির গায়ক গায়িকাকেও সুধীনবাবু ঠিক করলেন নিজের মনের মতো করে। নিলেন মান্না দে, গীতা দত্ত প্রমুখ কে। বাংলার লোকাঙ্গিক ছাঁচে, ভাটিয়ালির করুণ রসামৃত, গানের ধারায় ‘ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়’ গানটিকে সুর দিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। সুধীনবাবুর দেওয়া এই সুর তারাশঙ্করবাবুর মনে গভীর ভাবে দাগ কেটে গেল।
সুধীনবাবুর মুখে গানটি শুনতেও ভালোবাসতেন। দেখা হলেই হাত ধরে অনুরোধ করেন গানটি শোনানোর জন্য। স্থান কালেরও তোয়াক্কা করতেন না। এ রকমই একদিন চৌরুঙ্গী রোডে স্ত্রী মঞ্জুশ্রী দাশগুপ্ত-র সঙ্গে একটা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে শোকেসে বই দেখছেন সুধীনবাবু। হঠাৎই লক্ষ্য করলেন দূর থেকে তারাশঙ্করবাবু ছুটতে ছুটতে আসছেন। সুধীর যেন কাউকে দেখেন নি, এমন ভাবেই মঞ্জুশ্রীকে বললেন ‘চলো চলো শিগগির পালাই। নইলে এখনই বলবেন গানটা শোনাও।” তার পর বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে সুধীনবাবু বললেন “ওরে বাবারে প্রাণে বেঁচে গিয়েছি, তারাবাবুকে দেখেই পালালাম, নইলে দেখা হলেই বলতেন সুধীন ‘ওগো তোমার’ গানটা শোনাও দেখি।” গানটির কথার সাথে সুরের এমন দরদি মিশ্রণ বাংলা গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর তার জন্যই গানের স্রষ্টার এই শুনতে চাওয়ার প্রবল আকুতি।
অন্যদিকে প্রাণ ঢেলে গানটি গেয়েছিলেন ছবিতে মান্না দে। মান্না দে যেহেতু তখন মুম্বইতে, তাই গানটি রেকর্ড করার জন্য মুম্বইতেই স্টুডিও ভাড়া করা হল। সে দিনও এক বিরল ঘটনার সাক্ষী রইলেন সবাই। কথার সাথে পাল্লা দিয়ে তৈরি হওয়া গানটির এমনই সুর যে রেকর্ডিং শেষ হওয়া মাত্র মান্না দে এবং সুধীন দাশগুপ্ত পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আসলে দেখার জায়গাটা বৈরাগ্যের আবেগে। কারণ গায়কের বয়স তখন ঊনচল্লিশ আর সুরকারের বয়স তখন মাত্র আঠাশ।
তথ্য সহায়তাঃ শচীদুলাল দাশ।
