মানভূমের সত্যাগ্রহ অভিযান, বাংলা ভাষার দাবিতে পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম আন্দোলন

বাঙালি অধ্যুষিত মানভূম, সে সময় ছিল বিহার-ওড়িশার অংশ

বাংলাই পৃথিবীর এমন এক ভাষা, যা নিয়ে বারবার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছে। প্রাণ গিয়েছে। বাংলায় কথা বলার অধিকারের দাবিতে তৈরি হয়েছে দেশ। এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বাংলা ভাষা আরও এক ইতিহাসের সাক্ষী, সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনটিও বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই সংগঠিত হয়েছিল।

১৯১২ সালে মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। পরাধীন ভারতে ইংরেজরা নিজেদের সুবিধার জন্যই মানভূমের জন্ম দিয়েছিল। ১৯৩১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী, মানভূমের প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। বাঙালি অধ্যুষিত মানভূম, সে সময় ছিল বিহার-ওড়িশার অংশ। (১৯৩৬ সালে বিহার, ওড়িশা বিচ্ছিন্ন হয়) এরপরই বাংলা ভাষার উপর শুরু হয় আক্রমণ, বস্তুত সে কারণেই আন্দোলনের সূত্রপাত। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হিন্দির বিরুদ্ধে সরব হন মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী মানুষজন। ১৯৩৫ নাগাদ মানভূম বিহারী সমিতি নামের এক সংগঠন তৈরি হয়। পাল্টা বাঙালিরা তৈরি করে ‘মানভূম বাঙালি সমিতি’। যার মুখপাত্র ছিল মুক্তি পত্রিকা।

রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম ও মানভূম জেলা নিয়ে ছোটনাগপুর নামক এক নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব ওঠে, আবার ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের রঘুনাথপুর অধিবেশনে বাংলার সঙ্গে মানভূমের সংযুক্তির প্রস্তাবও উঠেছিল। কিন্তু সে'সব দানা বাঁধেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৮ থেকে চরমে ওঠে আন্দোলন। ১৯৪৮ সালেই ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনার বদলে ঐক্যবদ্ধ দেশের জন্য প্রদেশ গড়ার প্রস্তাব দেয় ভাষাভিত্তিক প্রদেশ কমিশন। যা হিন্দি আগ্রাসনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। স্কুল-কলেজ-অফিস-সরকারি দপ্তর সর্বত্র বাংলার বদলে হিন্দি প্রচলনের চেষ্টা শুরু হয়। বাংলায় বই ছাপা বন্ধ করে বিহার সরকার, বাংলায় লেখা দলিল গ্রাহ্য হবে না বলেও ফরমান জারি করা হয়, ধানবাদ রেজিস্ট্রি অফিস বাংলা ভাষায় লেখা দলিল রেজিস্ট্রি করতে অস্বীকার পর্যন্ত করে। 

অরুণচন্দ্র ঘোষের লেখা টুসু গানে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছিল,

আমার ভাষা প্রাণের ভাষা রে,
মারবি তোরা কে তারে।
এই ভাষাতেই কাজ চলছে
সাত পুরুষের আমলে
এই ভাষাতেই মায়ের কোলে
মুখ ফুটছে মা বলে।
এই ভাষাতেই পরচা রেকর্ড
এই ভাষাতেই চেক কাটা
এই ভাষাতেই দলিল নথি
সাত পুরুষের হক পাটা।

তদানিন্তন প্রশাসনের তরফে বিদ্যালয়ে হিন্দি মাধ্যমে পঠন-পাঠনের নির্দেশ আসে, স্কুলগুলিতে বাংলা পড়ানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬, এই আট বছরে মানভূম ভাষা আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ জুন পাকবিড়রা গ্রামে আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার, শরৎচন্দ্র সেন, অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত এবং গুণেন্দ্রনাথ রায়দের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে লোকসেবক সঙ্ঘ। এঁরা লড়েছেন ময়দানে, অন্যদিকে ভারতীয় সংসদে মানভূম আন্দোলন নিয়ে সরব হয়েছিলেন নির্মলকুমার চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার বসু, মোহিত মৈত্র, ভজহরি মাহাতো, চৈতন মাঝির মতো সাংসদরা। সংসদে দাঁড়িয়ে বিহার থেকে মানভূমের মুক্তির দাবিতে ভজহরি মাহাতো বলেছিলেন, তিনি মানভূমের অধিবাসী, তাঁর ভাষা বাংলা। বিহার সরকারের শাসন থেকে মুক্তি চায় মানভূমবাসী। 

এই প্রসঙ্গে বলা ভালো, জাতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে নেতারা লোকসেবক সঙ্ঘ গড়েছিলেন, দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অর্থাৎ ১৯৫২ সালে লোকসেবক সঙ্ঘের ভজহরি মাহাতো, চৈতন মাঝি জয়ী হয়েছিলেন। রাজ্য বিধানসভাতেও তাদের সদস্য ছিল।

তদানিন্তন বিহার সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলন দমাতে দমন-পীড়নের নীতি নিয়েছিল। বাঙালিদের প্রতিবাদসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫১-তে সরকার হিন্দি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করলে, আন্দোলনের আগুনে যেন ঘি পড়ে। লোকসেবক সঙ্ঘ ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে।

তদানিন্তন বিহার সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলন দমাতে দমন-পীড়নের নীতি নিয়েছিল। বাঙালিদের প্রতিবাদসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫১-তে সরকার হিন্দি ভাষাকে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করলে, আন্দোলনের আগুনে যেন ঘি পড়ে। লোকসেবক সঙ্ঘ ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে। আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা অতুলচন্দ্র ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, অশোক চৌধুরী প্রমুখরা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, লাবণ্যপ্রভা ঘোষের সঙ্গে সঙ্গে রেবতী ভট্টাচার্য, ভবানী মাহাতোরা জীবনপণ লড়াই লড়েছিলেন। আন্দোলনে পড়ুয়ারাও সামিল হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ১১ ডিসেম্বরের ছাত্র ধর্মঘট মানভূম ভাষা আন্দোলনের বারুদ ঠাসা মশালে আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছিল। ১৯৫৪-র ৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলন চলে। টুসু সত্যাগ্রহকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্ধ টুসু গায়ক দশ বছরের বাবুলালকেও রেহাই দেয়নি পুলিশ। ‘টুসু গানে মানভূম’ শিরোনামে একটি ষোলো পৃষ্ঠার বইও বাজেয়াপ্ত করেছিল বিহার সরকার। টুসু সত্যাগ্রহে সামিল হওয়ার অপরাধে বছর তেরোর দুই কিশোর সুধ্যন মাহাতো এবং হরিপদ মাহাতোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এমনকি তাঁদের গরু, মোষ, ঢেঁকিও বাজেয়াপ্ত করেছিল বিহার সরকারের পুলিশ। 

যার প্রতিবাদে টুসু গান লেখা হয়- 

সুধন্যার ঢেঁকি
দারোগার বউ ধান কাটে 
সবাই দেখি

টুসু গানে ছড়িয়ে পড়েছিল আন্দোলনের কথা। আদপে বাঙালিরা বিপ্লবকে বরাবর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রূপ দিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

টুসু গানের কলিতে ভজহরি মাহাতো লিখেছিলেন-

শুন বিহারি ভাই
তোরা রাইখ্যতে লারবি ভাঙ দেখাই
এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষায় রাজ্য চাই
বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই
কোনও ভেদের কথা নাই
তোরা আপন তরে ভেদ বাড়ালি
বাংলা ভাষায় দিলি ছাই৷

মধুসূদন মাহাতোর লেখা গানটি ছিল-

মন মানে না হিন্দি সইতে
ভাষা মোদের হরে নিল হিন্দিতে।
মাতৃভাষা হরে যদি
আর কী মোদের থাকে রে?

জগবন্ধুর গানের কথায় ধরা দিয়েছিল হিন্দি আগ্রাসনের দাপট-

প্রাণে আর সহে না
হিন্দি কংগ্রেসিদের ছলনা
ইংরেজ আমলে যারা গো
করতো মোসাবিয়ানা
এখন তার হিন্দি কংগ্রেসি
মানভূমে দেয় যাতনা

হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কবলম পানিক্করের রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন ১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর মানভূম জেলা থেকে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলি নিয়ে পুরুলিয়া জেলা তৈরির প্রস্তাব দেয়। স্বভাবতই এর বিরুদ্ধ মতও ছিল। লোকসেবক সঙ্ঘের সদস্যরা ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল পুঞ্চার পাকবিড়রা ময়দান থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেন। ১৬ দিন ধরে পায়ে হেঁটে বাঁকুড়া, বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া হয়ে তিনশো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে প্রায় হাজারের বেশি আন্দোলনকারী ৬ মে কলকাতায় পৌঁছয়। প্রায় তিনশো জন মহিলা আন্দোলনকারীও ছিলেন সেই মিছিলে। সাধারণ মহানগরবাসী তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিল, সত্যাগ্রহীদের কণ্ঠে ছিল রবি ঠাকুরের অমোঘ বাণী ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’। ৬ মে ময়দানে সভাও করেছিলেন তাঁরা। পদযাত্রা কয়েকটি ভাগে এসেছিল, ধলভূমের একদল সত্যাগ্রহী আবার ৫ মে কলকাতা পৌঁছে হাজরা পার্কে সভা করেছিলেন। ৭ মে মহাকরণ অবরোধের কর্মসূচী নিয়ে প্রতিবাদীরা বিবাদী বাগে পৌঁছলে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিধান রায়ের সরকার আন্দোলন ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, কলকাতার পাশাপাশি গোটা বাংলাজুড়ে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সত্যাগ্রহী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যদিও সপ্তাহ দুয়েক পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। 

ওই বছর লোকসভায় ও রাজ্যসভায় যথাক্রমে ১৭ আগস্ট ও ২৮শে আগস্ট বাংলা-বিহার সীমান্ত নির্দেশ বিল পাশ হয়। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায়। সে বছর ১লা নভেম্বর জন্ম হয় পুরুলিয়ার। মানভূম তিন টুকরো হয় কিন্তু সফলভাবে শেষ হয় মানভূম ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে কেউ শহিদ হননি, কিন্তু রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন কম হয়নি। দশ বছরের শিশু থেকে মহিলা, এমনকি প্রবীণরাও রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচার সয়েছেন। দোকানপাট, বাড়িঘর জ্বলেছে। কারা রুদ্ধ হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সেই সঙ্গে রয়েছে গৌরবও, বাংলা ভাষার জন্য লড়াইয়ের গৌরব। পৃথিবীর দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন সফলভাবে গড়ে তোলার গৌরব মানভূমের, একই সঙ্গে দেশের প্রথম সফল ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের কৃতিত্বও মানভূমবাসীর।
________________
তথ্যসূত্র: 
১) গানের ভাষায় ভাষা আন্দোলন,  আলোককুমার চক্রবর্তী
২) পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকা, পুরুলিয়া সংখ্যা
৩) মানভূমের ভাষা আন্দোলন ও পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি: দিলীপকুমার গোস্বামী
৪) ভাষা আন্দোলনে মানভূম: নন্দদুলাল আচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা
৫) বাংলা ভাষা অন্য আন্দোলন, অন্য শহিদর: পবিত্র সরকার, বর্তমান পত্রিকা
৬) পুরুলিয়া তরুণদেব ভট্টাচার্য

 

Developed by DXDasia