আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পবিত্র সরকারের কলাম
ভাষা নিয়ে উৎসব-উচ্ছ্বাস আর বাস্তব
আরও একটা একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশে আর পশ্চিমবাংলায়, ত্রিপুরায়, শিলচরে আমাদের বাংলাভাষার গৌরব আর দুর্গতি নিয়ে নানা বাৎসরিক উচ্ছ্বাস ও আর্তনাদ শুনতে হবে। প্রত্যেক বছরই হয়, আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে এই সময়টায় হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠি, ফাগুনের ভোরবেলা নানারকম ব্যায়াম-কসরত করি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বাংলা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা, বাঙালিদের নোবেল পুরস্কার—এই সব প্রসঙ্গ কুস্তিগিরের ঊরুতে তাল ঠোকার মতো করে আলোড়িত হয়। তারপর সারা বছর চুপচাপ, অন্য সময়ে বাংলা ভাষা বাঁচল কি মরল তা নিয়ে আমরা বিশেষ সাড়াশব্দ করি না। বাংলাদেশের বাঙালিদের ভাষা নিয়ে গৌরব করার অধিকার যত বেশি, কিংবা আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালিদের উচ্চকণ্ঠে কথা বলার যে দাবি আছে, অন্যত্র বাঙালিরা তার ভাগ টেনে নিতেই পারে, তাতে কোনো অন্যায় নেই। বাংলা ভাষার অংশীদারি তাদের সেই অধিকার দিয়েছে। আর এ-ও আমরা হয়তো মেনে নেব যে উৎসবের ধর্মই এই যে, তা উপলক্ষ্যনির্ভর এবং সাময়িক, উৎসব শেষ হয়ে গেলে আবার পরের বছর সেই উৎসব-লগ্নটির জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। অনেক সময় পরের উৎসবটি এসে আগের উৎসবটিকে অস্পষ্ট করে দেয়। এবার আর একটা উৎসব আসছে বাঙালির, পয়লা বৈশাখ, তা প্রত্যক্ষভাবে বাংলা ভাষার সঙ্গে যুক্ত না হলেও ‘বাঙালিত্ব’-এর সঙ্গে যুক্ত, তাই কিছুটা বাংলা ভাষাও এখানে মনোযোগ পায়। হিন্দু বাঙালি গঙ্গাস্নান করে ছোটেন, ছোটেন কালীঘাটে পুজো দিয়ে হালখাতা শুদ্ধ করে আনতে, দোকানে সারাদিন উৎসব চলে, মুসলমান বাঙালিদেরও কিছু পালনীয় আছে বলে শুনেছি। নতুন পোশাক তো যাঁরা পারেন তাঁদের হয়ই পুজো বা ইদের মতো। এই সঙ্গে বাংলাভাষাও কিঞ্চিৎ নজর পায়, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর বদলে ‘শুভ নববর্ষ’ শুনি টেলিফোনে, পড়ি ফেসবুকে। এতে আমরা কৃতার্থ হব কী না, বাংলা ভাষা বর্তে যাবে কি না—সেইটেই প্রশ্ন।
বাংলা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা, বাঙালিদের নোবেল পুরস্কার—এই সব প্রসঙ্গ কুস্তিগিরের ঊরুতে তাল ঠোকার মতো করে আলোড়িত হয়। তারপর সারা বছর চুপচাপ, অন্য সময়ে বাংলা ভাষা বাঁচল কি মরল তা নিয়ে আমরা বিশেষ সাড়াশব্দ করি না।।
এই উপলক্ষ্যে বাংলা ভাষাটাকে আমরা কেমন রেখেছি সেই হিসেবটা নেওয়া যাক। না, গত শতাব্দীর শেষ তিরিশ বছর থেকে পৃথিবীর ভাষাতাত্ত্বিকেরা ভাষার বাঁচামরা নিয়ে খুব চিন্তায় পড়েছেন, তাও আমরা জানি, বাংলা ভাষার এই মুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। ইউনেস্কোর একটা হিসেব দেখেছিলাম, যে ভাষার মৃত্যুর একটা হিসেবের ক্রম যদি শূন্য (০) থেকে ১০০-র মধ্যে খাড়া করা যায়, তা হলে ইংরেজি ভাষার মৃত্যুর সম্ভাবনা শূন্য, আর বাংলা এবং আরও অনেক ভাষা দাঁড়িয়ে আছে ১-এর ঘরে। মনে রাখতে হবে, ১০০র কাছাকাছি পৌঁছেছে এমন অনেক ভাষাও আছে। ওইরকম আর-একটা হিসেব আছে মার্কিনদেশের ‘এথ্নোলগ্’ বলে আর-একটা পত্রিকার, যারা পৃথিবীর ভাষাগুলির অসুখবিসুখ জন্মমৃত্যুর খবর রাখে। তারা বলেছিল, মানুষের সভ্যতা যদি চোদ্দ-পনেরো হাজার ভাষা দিয়ে শুরু করে থাকে কথা বলতে—সে আজ অন্তত চল্লিশ হাজার বছর তো হবেই—এর মধ্যে তার অর্ধেকই মরে গেছে। এখন পৃথিবীতে বলা হয় ৭০০৫টির মতো ভাষা। আর তার চেয়েও আতঙ্কের কথা হল, তারও অর্ধেক এই একবিংশ শতাব্দীতে লুপ্ত হয়ে যাবে এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তাতে বাংলা থাকবে না থাকবে না, থাকলে মৃত্যুর কত কাছে বা কত দূরে থাকবে—সবই নির্ভর করছে বাংলাটা যারা ব্যবহার করছে তাদের উপর। মানে বাঙালিদের উপর। তারা কি চায় আমাদের ভাষাটা বেঁচে থাকুক, আমরা ভাষার হয়ে তার মৃত্যুর সঙ্গে দড়ি-টানাটানিতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ব, তারপর সবাই মিলে হেঁইয়োঁ বলে এক হ্যাঁচকা টানে আমাদের ভাষার মৃত্যুকে হারিয়ে দেব। বাঙালি কি সেইরকম ভাবছে?
ভাষা মরে কেন?
ভাষা মরে নানাভাবে। এক, যুদ্ধে, মড়কে বা দুর্ভিক্ষে, কিংবা আরও নানা কারণে ভাষাগোষ্ঠীর সকলের মৃত্যু হতে পারে, অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ার আদিবাসীদের যেমন ইংরেজরা মেরে শেষ করে দিয়েছিল ১৮৩০ নাগাদ। এ রকম রাতারাতি খুন বা Sudden Death তো আছেই। তার পরে আছে ধীরে ধীরে কিন্তু সম্পূর্ণ মৃত্যু, Radical Death, যেখানে শক্তিশালী ভাষাগোষ্ঠের অত্যাচারে দুর্বল ভাষার লোকেরা নিজেরাই নিজেদের ভাষা বলা বন্ধ করে দেয়। মার্কিনদেশের অনেক আদি আমেরিকান (আগেকার ‘রেড ইন্ডিয়ান’ কথাটা ওরা আর ব্যবহার করে না, বলে ‘নেটিভ অ্যামেরিকান’) ভাষার এইভাবে মৃত্যু ঘটেছে। স্কুলে ওদের ছেলেরা ইংরেজি না বলে নিজেদের ভাষা বললে তাদের গলায় কাটা শুয়োরের মাথা ঝুলিয়ে শাস্তি দেওযা হত এক সময়ে। তারপর আছে ক্রমবদ্ধ মৃত্যু বা Gradual Death, বেশিরভাগ ভাষার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে। আর-এক ধরনের মৃত্যু আছে তলার দিক থেকে মৃত্যু— Bottom to Top Death, যেখানে লোকে ভাষাটা বলতে ভুলে যায়, কিন্তু নানা ধর্মীয় ব্যাপারে ভাষাটার ব্যবহার থাকে, যেমন সংস্কৃত আছে ভারতে, লাতিন আছে খ্রিস্টধর্মের কোনও কোনও অংশে।
প্রথম দু-ধরনের মৃত্যু আমরা লক্ষ করি। দুটোই ঘটে দুটো ভাষা পাশাপাশি আসার কারণে, দুয়ের সঙ্গে সংঘাতের কারণে। ভাষা তো কাছে এলে মারপিট করে না, মারপিট করে ভাষার মানুষেরা। এক ভাষার মানুষেরা বলে, এই, আমরা তোদের রাজা, তাই আমাদের ভাষাটা না শিখলে সরকারি চাকরি হবে না, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবি না। আমাদের ইংরেজ রাজারা ১৮৩৫ সালে চাকরি আর শিক্ষার জন্য ইংরেজি শেখা বাধ্যতামূলক করেছিল, তা তো আপনারা জানেন। এতে আমাদের বেশ কিছু ভালোও হয়েছে তা সবাই জানে, আমরাও অস্বীকার করব না। বাংলায় ‘নবজাগরণ’ হয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহাপুরুষেরা এসে বাঙালিকে পৃথিবীর নাগরিক করে দিয়েছেন।
প্রথমত ইংরেজি লেখাপড়ার মাধ্যম হওয়ার জন্য আমাদের দেশের মানুষ প্রথম দিকে লেখাপড়া শিখেছে খুব কম। ওয়েবসাইটেই পাবেন ঊনবিংশ শতকের দশক দশক ধরে ভারতীয়দের সাক্ষরতা, অর্থাৎ লেখাপড়া শেখার হিসেব।
কিন্তু কিছু রীতিমতো খারাপও যে হয়েছে, তা হয়তো সবাই জানেন না, বা ইংরেজ বা ইংরেজির প্রতি ভক্তিবশত মানেন না। খারাপ কী হয়েছে, কেন হয়েছে? প্রথমত ইংরেজি লেখাপড়ার মাধ্যম হওয়ার জন্য আমাদের দেশের মানুষ প্রথম দিকে লেখাপড়া শিখেছে খুব কম। ওয়েবসাইটেই পাবেন ঊনবিংশ শতকের দশক দশক ধরে ভারতীয়দের সাক্ষরতা, অর্থাৎ লেখাপড়া শেখার হিসেব। একশো জনের মধ্যে কতজন কীভাবে লেখাপড়া শিখেছে তার পরিসংখ্যান দেখলে আপনারা তাজ্জব হয়ে যাবেন। যখন ইংরেজি মাধ্যম ছিল (১৮৭২-১৯৩১) তার হিসেব হল—১৮৭২—৩.৭৫, ১৮৮১—৪.৩২, ১৮৯১—৪.৬২, ১৯০১—৫.৪, ১৯১১—৫.৯, ১৯২১—৭.২, ১৯৩১—৯.৫। যাঁরা অঙ্কে উৎসাহী তাঁরা হিসেব করুন প্রতি দশকে সাক্ষরতা কী হারে বেড়েছে—খুব কম ক্ষেত্রে দশ বছরে দুইয়ের উপরে উঠেছে।

১৯৪০ থেকে স্কুলশিক্ষায় মাতৃভাষায় পড়ানো অনুমোদিত হল। বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে আগেই, ১৯২৯ থেকে হয়েছিল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ১৯৪০ থেকে। এবার সাক্ষরতা কী হারে বাড়ছে দেখুন—১৯৪১—১৬.১, ১৯৫১—১৮.৩৩, ১৯৬১—২৮.৩, ১৯৭১—৩৪.৪৫, ১৯৬১—৪৩.৫৭—এই ভাবে চলেছে। এই গতি আমরা সব সময় বজায় রাখতে পারিনি, তবু এই করতে করতে আম আমাদের সাক্ষরতা ৭৭.৭-এ এসে পৌঁছেছে, মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না হলে তা সম্ভব হত না।
ইংরেজি শেখার ফলে আমাদের অনেক লাভ হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আর-একটা ক্ষতিও হয়েছে। সে ক্ষতিটা সামাজিক। তা হল, যারা ইংরেজি শিখল, তারা একটা নতুন ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণিতে অবস্থান নিল, আর যারা তা শিখল না, বা ইংরেজের স্কুলে যেতে পারল না, তারা ‘ভদ্রলোক’ হতে পারল না। ‘ছোটোলোক’ কথাটা এখন আমরা হয়তো গালাগাল ছাড়া তত ব্যবহার করি না, কিন্তু এক সময় ‘না-ভদ্রলোক’-দের ওই নামেই চিহ্নিত করতাম আমরা—নিরক্ষর চাষি, জেলে, শ্রমিকদের আমরা তাই বলতাম। আর যারা স্কুলে ঢুকতে পারেনি, তাদেরই আমরা ‘অশিক্ষিত’ বলতে অভ্যস্ত হলাম, যদিও স্কুলে পড়া আর শিক্ষা এক জিনিস নয়। পুরুষানুক্রমে, হাতে-কলমে, মুখে মুখে শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরাই দীর্ঘদিন আমাদের সমাজকে লালন করে এসেছেন। চাষিরা, ব্যবসায়ীরা, মৎস্যজীবীরা প্রত্যেকে নিজেদের পেশায় যেমন ‘শিক্ষিত’ হয়েছেন, তেমনই রামায়ণ-মহাভারত, বয়েতগান কথকতা শুনে মানবিক শিক্ষা আর নীতিবোধও আয়ত্ত করেছেন। কিন্তু ইংরেজি স্কুলে পড়েননি বলে আমরা তাঁদের ভদ্রলোকের সমাজ থেকে নির্বাসনে পাঠালাম।
ভাষা আর সমাজের ভাষা সম্বন্ধে মনোভাগ
যখন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতায় একটা ভাষার দাপট বেড়ে যায়, আর তুলনায় পাশাপাশি অন্য ভাষাগুলি একটু দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দুর্বল ভাষা সম্বন্ধে মানুষের মনোভাবও বদলাতে থাকে। দাপুটে ভাষার প্রতি ভক্তি বেড়ে যায়, দাপুটে ভাষা জানলে সমাজে সম্মান বাড়ে, দাপুটে ভাষা জানি দেখাতে পারলে অহংকার হয় এবং নিজের ভাষা যদি দাপুটে না হয়, তার প্রতি একটু করুণা আর অবহেলা জন্মাতে থাকে। পরাধীনতার সময় ইংরেজি আর বাংলার ক্ষেত্রে আমরা এটা দেখেছি, এখনও দেখি, কারণ ইংরেজির দাপট এখন কমবে কি, বরং অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের কবি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটক ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ থেকে কিছু সংলাপ আমি নানা জায়গায় তুলে এই বিষয়টা দেখাই। সেই ১৮৫৯ সালে লেখা নাটক, কিন্তু এখনও কী জীবন্ত এই দৃষ্টান্ত।
যারা ইংরেজি শিখল, তারা একটা নতুন ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণিতে অবস্থান নিল, আর যারা তা শিখল না, বা ইংরেজের স্কুলে যেতে পারল না, তারা ‘ভদ্রলোক’ হতে পারল না। ‘ছোটোলোক’ কথাটা এখন আমরা হয়তো গালাগাল ছাড়া তত ব্যবহার করি না।
বড়লোকের বখাটে কিছু ছেলে একটি বারবনিতার বাড়িতে মদ্যপান ইত্যাদির জন্য জমায়েত হবে। এদের নেতা নব আর কালী মদ কিনে আড্ডায় আসতে একটু দেরি করেছে, শিবু ইত্যাদি অন্যরা একটু অধৈর্য হয়ে পড়েছে। নব আর কালী এসে পড়ায় সকলে ‘হিপ হিপ হুরে’ বলে উঠল, তখন নব বলল, ‘দেখ ভাই, আজ আমাদের একটু এক্সকিউজ করতে হবে, আমাদের একটু কর্ম ছিল বলে তাই আসতে দেরি হয়ে গেল।’ শিবু, যে এতক্ষণ মদের অভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে, সে জানে ‘কর্ম’ মানে অন্য জায়গায় নব আর কালী মদ্যপান করে এসেছে, তাই সে বলে উঠল, ‘দ্যাটস এ লাই।’ তখন নব রেগে উঠে বলল, ‘হোয়াট, তুমি আমাকে লাইয়র বল? তুমি জানো না, আমি এক্ষুনি তোমাকে শুট্ করব!’ (কারও কাছেই কিন্তু বন্দুক-পিস্তল কিছু নেই)। আর-এক বন্ধু চৈতন্য দুজনকে থামাবার চেষ্টা করে বলল, ‘হাঃ, যেতে দেও, যেতে দেও, এমন ট্রাইফ্লীং (‘তুচ্ছ’) কথা নিয়ে ঝগড়া কেন?’ নব বলল, ‘ও আমাকে লাইয়র বলল, আবার ট্রাইফ্লীং? ও আমাকে বাঙ্গালা করে বল্লে না কেন? ও আমাদের মিথ্যাবাদী বল্লে না কেন? তাতে কোন্ শালা রাগতো? কিন্তু—লাইয়র—এ কি বরদাস্ত হয়!’
এ এক অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি সেই কবির, যিনি বলেছিলেন, ‘পাইলাম কালে, মাতৃভাষারূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।’ ঠিক একই কারণে আমরা কথায় কথায় ইংরেজির ফোড়ন দিয়ে লোককে ঘাবড়ে দেবার চেষ্টা করি, যাতে সে মনে করে, আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাষার বাসিন্দা, সে ইংরেজি যেমনই হোক।

বিদেশে যেখানে শুধু ইংরেজি ভাষা বলা হয় সেখানে বাঙালি বাচ্চা গিয়ে পড়লে হতেই পারে সে বাংলাটা ভুলে যাবে আস্তে আস্তে। কারণ ঘরে ইংরেজি টেলিভিশন চলে, বন্ধুবান্ধবেরা পাড়ায় বা স্কুলে ইংরেজি বলে। বাড়িতে মা-বাবা যদি না বলে তার বাংলা বলার সুযোগ নেই। ফলে সে বাংলা ভাষা ভুলতে থাকে, বা ওখানে জন্ম হলে, শেখেই না। একে বলে ভাষাক্ষয় বা language loss। এর উল্টোটা হল ভাষারক্ষণ বা Languae maintenance. ছেলে বা মেয়েটির বাবা বা মা তার সঙ্গে কথায় এবং আরও নানা উপায়ে বাংলা না বললে সে ভাষাটা রক্ষা করতে পারবে না। আমরা আমেরিকায় থাকার সময়ে একটি দৃষ্টান্ত দেখেছিলাম। একটি বাংলাদেশি দম্পতি এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে, তাদের সাত বছরের ছেলে রহমানকে নিয়ে। তাঁরা তাকে ডাকতেন ‘রেমন্ড’ বলে। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে সকালে ঘুমোতাম, আর রেমন্ড আর আমার দেড় বছরের মেয়ে সকালে উঠে তাদের খেলার জিনিসপত্র নিয়ে খেলত। একদিন ভোরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমি, রেমন্ড এসে আমাকে আস্তে আস্তে ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘Uncle, uncle, she did some হাগা।’ অর্থাৎ আমার মেয়ে তার ডায়াপারে প্রাতঃকৃত্য করেছে, দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে, তাই সে বিপন্ন হয়ে আমাকে জাগাতে এসেছে।
বোঝা গেল, রেমন্ডের বাংলা ভাষা ক্ষয় হয়েছে বেশিরভাগ, একটা দুটো শব্দে রক্ষিত আছে। তাও শিগগিরই মুছে যাবে।
আরও পড়ুন: ঠিকঠাক বাংলা বলছেন তো?
আমাদের এখানকার বাংলাও কি ক্ষয়ের মুখে?
আমরা এখনকার অনেকের মুখে যে বাংলাটা শুনি তাকে অনেকে বাংলিশ বলেন তা আমরা জানি। মধুসূদনের নাটকে যেমন দেখলাম, বা এখন দুই বন্ধুর সংলাপের এক টুকরো— “ওকে, সি ইয়ু, চলি ভাই, এক্ষুনি আমার বসের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে ছুটতে হবে, প্লিজ ভাই, ডোন্ট মাইন্ড, আমার ইয়ঙ্গার ব্রাদারের একটা জবের ব্যাপারে বস একটু প্রমিজ করেছেন, তাই আইম ইন এ হারি, টাইম মেনটেন করতেই হবে, লেট হলে হয়তো চান্সটা মিস্ হয়ে যাবে। আমার হোম কন্ডিশন তো জানিসই, ফাদার রিটায়ার করেছেন অলমোস্ট ফাইভ ইয়ার্স, মা-বউ দুজনেই জাস্ট হাউসওয়াইফ, ওনলি আমি ফ্যামিলির জোয়াল টানছি। টা-টা।” আর এখন কম্পিউটার, ফেসবুক ইত্যাদি এসে সমস্যা আরও বাড়িয়েছে, মা-বাবারা স্বাভাবিক স্বপ্ন নিয়েই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াচ্ছেন ছেলেমেয়েদের। সেখানে শুনেছি বাংলা বলতে মানা করা হচ্ছে, যা আমি নির্বোধ নির্দেশ বলেই মনে করি। ইংরেজি ভালো করে শেখানোর জন্যে বাংলাটা ভুলিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, এ কথা কতবার করে বলতে হবে জানি না। তাই বাঙালি ছেলেমেয়েদের মুখে অকারণে but, so, yes, no, OK, fine, actually, practically, casually, as soon as possible, let me see, damn, stupid, oh my God, please don’t mind ইত্যাদি ঢুকে পড়ছে বাংলা কথার মধ্যেও, ইংরেজি বাংলার খিচুড়ি তৈরি হচ্ছে। অবশ্য এই সমস্যা শুধু বাংলার নয়, ভারতের অন্য ভাষাতেও ‘হিংলিশ’, ‘তাম্লিশ’, ‘পান্লিশ’ ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে।
ফলে, আমরা যদি সচেতন না হই, কবে যে বাংলাটা বাংলিশ থেকে ‘বেংলিশ’, ‘বিংলিশ’ হয়ে একেবারে একটা অন্য ভাষা বা ‘না-বাংলা’ হয়ে যাবে তা আমরা জানি না। তখন এত বাংলা পত্রপত্রিকা, বাংলা বই, এত সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য পড়বে কে, এই প্রশ্ন দেখা দেবে। রবীন্দ্রনাথ থেকে সব বাঙালি লেখক পৃথিবী থেকে মুছে যাবেন। আগেই বলেছি, অবস্থা অত খারাপ নিশ্চয়ই নয়। তবু বলি, বাঙালি ইংরেজি নিশ্চয়ই শিখবে, আমাদের মতে ভালো করে শিখবে। এখন তার অনেক উপায় আছে, শুধু স্কুলের উপর দায় চাপিয়ে বসে থাকতে হয় না। অনলাইনে ইউটিউবে শেখা য়ায়। স্কুলের শিক্ষকরা অনেক সময় মুখের ইংরেজি ভালোভাবে শেখাতে পারেন না, আর সেটা তাঁদের দোষ নয়। তাঁরা বেশিরভাগ বইয়ের ইংরেজি শিখেছেন। তাই ছেলেমেয়েরা ইংরেজি শিখুক, কিন্তু তার জন্যে তাদের বাংলাটা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যেন আমরা না করি। আর আমরাও যেন কাছাখোলা হয়ে বাংলাটাকে বাংলার মতো বলার চেষ্টা করি, ইংরেজিটা ইংরেজির মতো।