লক্ষ্মী মেয়ে মানেই পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণির সদস্য
কয়েক বছর আগের কথা। পণ্ডিচেরির(পুদুচেরি) সমুদ্রের কাছে এক রেস্টুরেন্টে লক্ষ্মী মেয়েটার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। দেখা হয়েছিল, কিন্তু কথা হয়নি। যদিও জানা গেল তার অনেক কথাই।
সমুদ্রের কাছে ঘণ্টা খানেক দাঁড়িয়ে থেকে আমার তখন খুব কোথাও একটু হেলান দিয়ে বসতে ইচ্ছে করছিল। সন্ধে নেমেছে অনেকক্ষণ। ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। মনে হচ্ছে জোয়ার চলছে। বড়ো বড়ো ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাথরের উপর। মাঝে মাঝে পাঁচ ছ’টা করে বাদুড়ের দল সমুদ্রের ধার ঘেষে উড়ে যাচ্ছে। এইভাবে সমুদ্রের ধার ঘেষে বাদুড়ের দলকে আমি অবশ্য মেঘলা সকালেও উড়ে যেতে দেখেছি এখানে।
আরও পড়ুন
পিছু হটছেন রবীন্দ্রনাথ, পুজো পাচ্ছেন গডসে– দেশপ্রেমের নামে এই রাজনীতি অভ্যন্তরীণ ঐক্য-বিরোধী
কাছেই জওহরলাল নেহরু স্ট্রিট। সেখানেই চোখে পড়ল বেশ আলো দেওয়া একটা রেস্টুরেন্ট। ভেতরে বেশ ভিড়। ভাবলাম, কিছু খাওয়াও হোক আর বৃষ্টিটাও যদি ততক্ষণে একটু ধরে। ভেতরে ঢুকে দেখি সেলফ সার্ভিস। আমার স্ত্রী কুপন কেটে লাইনে দাঁড়ালেন। আমি একটা দু’দিকে তিন তিন, ছয়-চেয়ারঘেরা-টেবিলে-র একটা ফাঁকা চেয়ারে বসে হাঁফ ছাড়লাম। আমার দিকে তিনটি চেয়ার। মাঝেরটা ফাঁকা। এক দিকে আমি। অন্য দিকে একটি বছর ছ’য়েকের ছেলে। উল্টো দিকে আমার সামনে বসে ওই ছেলেটির দিদি। দুই বেণী করা, নীল রঙের জামা গায়। ডাকাডাকি থেকে জানলাম নাম কল্পনা। বয়েস বছর দশেক হবে। তার পাশে বসেছেন ওদের দু’জনের মা। বাবা ব্যস্ত মানুষ। কুপন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েও মোবাইলে কথা বলে চলেছেন। মাঝে মাঝে এই টেবিলের সদস্যদের সঙ্গেও বাক্য বিনিময় চলছে তামিলে। মনে হল কোন কোন খাবারের অর্ডার দেওয়া হবে, তা নিয়েই সেই সব কথা হচ্ছিল।
খাবার আসতে শুরু করল। তামিল পিতা প্রথমে এক প্লেট ইডলি এনে বেশ সাবধানে এবং স্নেহময় চোখ নিয়ে টেবিলে রাখলেন। প্লেটে তিনটে ইডলি। সঙ্গে সম্বর এবং চাটনি। মা সেই প্লেটটা আমার এক চেয়ার দূরে বসা শিশুপুত্রটির দিকে এগিয়ে দিলেন। সে খেতে শুরু করল। মিনিট দুয়েক বাদে বাবা দু’প্লেট চানা-বাটুরা এনে টেবিলে রাখলেন। ছেলেটি কিছু বলল। মা ওর ইডলির প্লেটটা তুলে কল্পনাকে দিল। প্লেটে তখন দেখলাম দু’টো ইডলি। আর এক প্লেট চানা-বাটুরা এগিয়ে দিলেন ছেলের দিকে। মেয়েটি চোখ তুলে এক বার সেই প্লেটটার দিকে দেখল। তার পর মায়ের সাথে গল্প করতে করতে ইডলি খেতে শুরু করল। মা ততক্ষণে অন্য চানা-বাটুরার প্লেটটি আমার আর ছেলেটির মাঝে রাখা ফাঁকা চেয়ারের সামনে রেখে দিলেন। বুঝলাম ওটা বাবার। এর পর বাবা পনিরের কিছু একটা রান্না রেখে গেলেন টেবিলে। বেশ সোনালি ঝোল। ছেলেটি নিজেই সেই পনিরের বাটি টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে মা আর একটু এগিয়ে দিলেন। মেয়েটি মন দিয়ে ইডলি খাচ্ছিল। মা এবার মেয়ের ইডলির প্লেট সরিয়ে ছেলের সেই চানাবাটুরার প্লেটটা ওর সামনে রাখলেন। মেয়েটি বেণী দুলিয়ে হাসল মায়ের দিকে তাকিয়ে। খেতেও শুরু করল। এবার বাবা মোবাইলে কথা বলতে বলতে আর এক বাটি পনির নিয়ে এলেন। এবং নিজে খেতে বসলেন। বসার আগে ছেলে-মেয়ে দু’জনের মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু একটা বললেন। পরিবারের চার জনই হেসে উঠল। মেয়েটি কিছু একটা বলল মাকে। মা ছেলেটার পনিরের বাটি থেকে কিছুটা ঝোল ঢেলে দিলেন মেয়ের খাবারের প্লেটে। ততক্ষণে আমাদের প্লেন-ধোসার প্লেট ফাঁকা। উঠে পড়লাম।
আরও পড়ুন
এক ভুলে যাওয়া বাঙালি শিক্ষকের কাহিনি
আমরা উঠে বাইরে এলাম। দেখলাম, একটু একটু জল জমেছে। তবে বৃষ্টি থেমেছে। বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম, লক্ষ্মী মেয়ে শব্দটা আমি জীবনে আর উচ্চারণ করব না। লক্ষ্মীমেয়ে তৈরি করার কারখানা হল প্রতিটি বাড়ি। লক্ষ্মী মেয়ে মানেই পরিবারের দ্বিতীয় শ্রেণির সদস্য। মেয়েরা সমান নয়, এই শিক্ষা আমাদের ডিএনএ-তে থাকে, এই শিক্ষাই সাহস জোগায় একটি মেয়ের উপর হামলা করতে। আরও অনেক কারণ নিশ্চয়ই থাকে, কিন্তু এটা অন্যতম কারণ।
পুরাণে আছে, লক্ষ্মীর বড়ো বোনের নাম অলক্ষ্মী। সমুদ্র মন্থনকালে লক্ষ্মীর সঙ্গে অলক্ষ্মীও আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন কৃষ্ণবর্ণ, ঝগড়া করতেন, তর্ক করতেন, মোটেই বাধ্য ছিলেন না। তাই তাকে কোনও দেবতা গ্রহণ করলেন না। দানবেরাও কেউ তাঁকে আশ্রয় দিলেন না। দেবতা ও দানবে এখানে বিরাট মিল, দু’পক্ষেরই প্রিয় ‘লক্ষ্মী’। অলক্ষ্মীকে সবাই ভয় পায়। এক মহাতপা মুনি দুঃসহ, অলক্ষ্মীকে বিয়ে করলেন। কিন্তু বিয়ে করে উদ্ধার করেছেন ভেবে অলক্ষ্মী মোটেই নতচোখে হাতজোড় করে ছিলেন না দুঃসহ মুনির সামনে। তর্কও করতেন। ঝগড়াও করতেন নিয়মিত। ফলে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। সেদিন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে মনে হয়েছিল, অলক্ষ্মী হয়ে ওঠাটা কত জরুরি!
(ছবি-প্রতীকী)