উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজে হাতে-কলমে কাঠখোদাইয়ের প্রশিক্ষণ

লোকশিল্প প্রসারের সঙ্গে স্বাবলম্বী হতে শেখাচ্ছে এই কর্মশালা

নারীশিক্ষা প্রসারের সঙ্গে লোকশিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে, নাগরিক পরিসরে শিকড়ের সন্ধান জারি রাখার জন্য এবং মেয়েদের স্বাবলম্বনের জন্য সারাবছর ধরে কাজ করে চলেছে উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজ। বছরভোর বিভিন্ন সংকল্পকে পরিণতি দেওয়ার জন্য কলেজেই রয়েছে তিনটি সংগঠন- সুমেলি, সুচারু ও উন্মেষ। গত বছর কলেজের ফোক রিসার্চ আর্কাইভ সুমেলি’র সহযোগিতায় কলেজের কালচারাল কমিটি আয়োজন করেছিল দু’দিন ব্যাপী (১৭-১৮ মার্চ, ২০২৩) একটি কর্মশালার। মোটিফের নির্মাণ এবং নাগরিক শিল্পের পরিসরে লোকশিল্পের চর্চা কেন ক্রমশ: অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য, সেই বিষয়ে সচেতন করার জন্যই এমন উদ্যোগ। মেন্টর ছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। কালীঘাটের ৭৮ বছরের পুরোনো, বাংলার অন্যতম নারীশিক্ষার পথপ্রদর্শক এই কলেজের দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠেছিল নারীশক্তির কারুকথা—কালীঘাটের পটশিল্পে ‘উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট’, আর্বান মোটিফে এই প্রজন্মের মেয়েদের ঘরে-বাইরের কথা। ফোক এবং আরবান মোটিফ নিয়ে এই কর্মশালার পরবর্তী সেশন ছিল এ বছরের শুরুতেই, ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি। এ বারের কর্মশালার বিষয় ছিল কাঠখোদাই ও ছাপচিত্র শিল্প। এবারের মেন্টর ছিলেন শিল্পী সৌর চ্যাটার্জি, প্রিন্ট মেকিং-এ যিনি বরোদা স্কুল অফ আর্ট এবং দিল্লি স্কুল অফ আর্ট-এর প্রাক্তন গোল্ড মেডেলিস্ট।

শিল্পী সৌর চ্যাটার্জি’র কাছে কাঠখোদাই ও ছাপচিত্রের খুঁটিনাটি শিখছে পড়ুয়ারা

যাঁরা বলেন এই প্রজন্মের ধৈর্য্য, সঠিক শিক্ষা-সংস্কৃতির অভাব, তাঁদের জন্য দ্রষ্টব্য উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজ আয়োজিত এই কর্মশালাগুলো। ইচ্ছে থাকলে অপটূ হাতে অল্পসময়ের মধ্যেই পটচিত্র বা উডকাট শেখা যায়, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে কলকাতার কলেজ পড়ুয়ারা। এই ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছিলেন এপিজে আব্দুল কালাম কলেজ-এর একজন ফ্যাকাল্টিও। যোগ দিয়েছিল স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্ররা। অধ্যাপিকা জিনিয়া রায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত ভাবনায়, অধ্যক্ষ অজন্তা পালের পৃষ্টপোষকতায় এই কর্মশালার জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম কলেজ থেকেই দেওয়া হয়েছিল। জিনিয়া বলছিলেন, “পরীক্ষা চলা স্বত্বেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রী, বাইরের অংশগ্রহণকারী মিলিয়ে মোট ২৩ জন ছিল। আমরা ২৫ জনের মধ্যেই এটা সীমিত রাখতে চেয়েছিলাম, যাতে প্রত্যেককে ধরে ধরে শেখানো যায়। ছাপচিত্রের সূচনা হয় গুহাচিত্র থেকে, সেখান থেকে গুটেনবার্গ আসার আগে ও পরের ইতিহাস—কীভাবে চিন, জাপান, তিব্বত এবং পারস্য এইসব দেশে কাঠখোদাই ছাপচিত্রের বিবর্তন হয়েছে সবই উঠে এসছে এই ওয়ার্কশপে।”

নিজেদের কাজে স্বাক্ষর রাখছে শিক্ষার্থীরা

ইচ্ছে থাকলে অপটূ হাতে অল্পসময়ের মধ্যেই পটচিত্র বা কাঠখোদাই শেখা যায়, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে কলকাতার কলেজ পড়ুয়ারা। এই ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছিলেন এপিজে আব্দুল কালাম কলেজ-এর একজন ফ্যাকাল্টিও। যোগ দিয়েছিল স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্ররা।

জিনিয়া আরও বলেন, “সবাই যা যা কাজ করেছে, সবই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। সহজপাঠ আর পদ্মলতার দুটো ব্লক প্রিন্ট সহ কলেজকে দিয়ে গেছেন সৌর চ্যাটার্জি, যা থেকে ভবিষ্যতে প্রচুর প্রিন্ট বানানো সম্ভব হবে।”

অধ্যক্ষ অজন্তা পাল, শিল্পী সৌর চ্যাটার্জি ও অধ্যাপিকা জিনিয়া রায় (বাঁদিক থেকে)

 

প্রসঙ্গত, আজ ইতিহাসের ধুলোয় ঢেকে আছে কলকাতার নিজস্ব আর্ট—চিৎপুরের কাঠখোদাই শিল্প। কাঠখোদাইয়ে ছাপা ছবি আগে ঘরে ঘরে দেয়ালে ঝোলানো থাকতো, আস্তে আস্তে যা বন্ধ হয়ে যায়। চাটাইয়ের ওপর বসে শিল্পীরা একনাগাড়ে কাঠের ব্লকে লোহার বুলি চালিয়ে এচিং করে সামান্য অর্থের বিনিময়ে খোদাই করে যেতেন। ব্লকে কাঠের বাংলা বা ইংরেজি হরফ ও ছবির প্রতিটি রেখায় থাকতো নান্দনিক রূপ। অতীতের জনপ্রিয় বটতলার বইতে বড়ো আকারের কাঠখোদাই ছবি একসময়ে ছিল বাঙালির ঘরে ঘরে। পঞ্জিকার ছবিতে কাঠখোদাই কাজের এক আলাদা চাহিদা ছিল। উনিশ শতকে শিল্পীরা বংশ পরম্পরা মেনে কারিগরি দক্ষতায় কাঠের ব্লক খোদাই করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেকালের জীবনযাত্রার ছবি, কালী, গণেশ, দেবদেবীর কাহিনি, পোট্রেট, সুসজ্জিত রমণী, ছোটো বড়ো অক্ষর ইত্যাদি।

চাহিদা কমলেও এই শিল্পকর্ম বাঙালি জাতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। কাঠখোদাই অপূর্ব সূক্ষতা ও কাজের দক্ষতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। আগে সাধারণ মানুষের যাপনের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতো মূল্যবান সব শিল্পকর্ম। তারপর এলো অস্থিরতা ও রেডিমেডের যুগ। অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বেনোজলে সেই মনন বাঙালির রইলো না। শুধু গ্রামবাংলা এবং কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে পড়ে লোকশিল্প। একটা সময়ে আর্থিক অনটনে শিল্পীরা কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে, এখন আবার নতুন করে হস্তশিল্পের কদর শুরু হয়েছে সাধারণের মধ্যে। উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজের মতো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে আলো দেখাচ্ছে আগের মতো, আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পগুলোকে বেধেঁ বেধেঁ রাখার।   

ছবি ও তথ্যঋণ:
অধ্যাপিকা জিনিয়া রায় (উইমেন্স ক্রিশ্চান কলেজ)

Developed by DXDasia