শুধু আন্দোলন নয়, ট্রামের পুরোনো-বাতিল জিনিস আগলে রাখছেন সাগ্নিকরঞ্জন গুপ্ত

২০১ নম্বর ট্রামই তাঁর জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল

সাগ্নিকরঞ্জন গুপ্ত

সাদা কালো পর্দা। স্ক্রিন জুড়ে এক নারাজ কন্যে। তার পিছে চলেছেন জনি ওয়াকার। কখনও পায়ে পায়ে কখনও সাইকেলে। কাঙ্খিত নারীর মন তিনি গলিয়েই ছাড়বেন। তাঁদের চলার পথে ৩০-এর কলকাতা। ভিক্টরিয়ার গেট, সিংহ পেরিয়ে সেই কন্যে আচমকা উঠে পড়ে ট্রামে! ২০১ নম্বর ট্রাম। জনি তখনও গেয়ে যান শুনো শুনো মিস চ্যাটার্জী…

মেরে দিল কা ম্যাটার জী…

১৯৬৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল ধর্মেন্দ্র, তনুজা, মালা সিনহা অভিনীত নিউজরুম লাভস্টোরি ‘বাহারে ফির ভি আয়েঙ্গি’। প্রেক্ষাপট কলকাতা। পরিচালক শহীদ লতিফ। ইসমত চুখতাইয়ের স্বামী। এই ছবি গুরু দত্তর শেষ ছবি। কলকাতায় নিউ থিয়েটার্সের স্মৃতি তাঁর এই ছবিতে প্রভাব ফেলেছিল বেশ। কিন্তু ছবির কাজ চলতে চলতেই ১৯৬৪-র ১০ অক্টোবর প্রযোজক গুরু দত্তের আত্মহত্যার ঘটনায় ঘুরে যায় ছবির ভাগ্য। ইতিহাস তৈরি করেছিল ছবি।

মহম্মদ রফির গলায় ওপি নায়ারের ‘শুনো শুনো মিস চ্যাটার্জী’ হিট হয়েছিল বেশ।

১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘বাহারে ফির ভি আয়েঙ্গি’-তে ২০১ নম্বর ট্রাম

এই সিনেমা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল কলকাতাবাসী এক তরুণেরও। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়- সিনেমা নয়, নায়ক-নায়িকা কেউ নয় তার জীবন বদলে দিয়েছিল গানের মাঝে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঢুকে পড়া ২০১ নম্বর ট্রাম।

কীভাবে?

সে কাহিনি জানতে হলে চলে আসতে হবে টালিগঞ্জ ট্রামডিপোয়। সালটা ২০১৯। ট্রাম ডিপোয় বাবার সঙ্গে ট্রাম দেখতে এসেছে সদ্য একুশে পা দেওয়া এক তরুণ। বাবা আদ্যান্ত ট্রাম প্রেমিক। সেখানেই সে আবিষ্কার করে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোটোবেলায় টিভির পর্দায় দেখা সেই ২০১ নম্বর ট্রাম! চমকে ওঠে সে! ১৯৬৬-২০১৯ এখনও বেঁচে আছে! এ যেন জীবন্ত ইতিহাস! এখান থেকেই সেই কবেকার কলকাতা শহরের গানে অন্য খাতে বইতে শুরু করল তার জীবন।

কে সেই ছেলে?

গালভর্তি দাড়ি। এলোমেলো মাথার চুল। রোগা ঢ্যাঙ্গা চেহারা। তবে চোখ টেনে নেয় ভাসা ভাসা চোখের নরম দৃষ্টি।

কালীঘাট ট্রামডিপো-তে ২০১ নম্বর ট্রামের বর্তমান অবস্থা

পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ধর্মতলার ট্রাম ডিপোতে যখন সে পা রাখে তখন যেন রাতারাতি অন্য মানুষ। কী এক উত্তেজনায় ফুটতে থাকে সাগ্নিক। পুরো নাম সাগ্নিকরঞ্জন গুপ্ত। পেশায় ভিডিয়ো এডিটর। এই সময়ের ট্রেন্ডের সঙ্গে যেমন মেলে না তার নাম, তেমনি সাগ্নিকরঞ্জন যেন তার সমকালের বিপরীতে চলা মানুষ।

কলকাতার ট্রামের সংখ্যা, ট্রামের রুট, বিবর্তন, ইতিহাস ভূগোল এমনকি ট্রামের শরীরের প্রতিটা যন্ত্রাংশ – নাটবোলটসের হিসাবও গড়গড় করে বলে যায় সে। এ নেহাত মুখস্ত বিদ্যের দৌড় নয়। প্রতি কথার শেষে ঝরে পড়া আফসোস বুঝিয়ে দেয় ট্রামের প্রতি তার দুর্নিবার ভালবাসার কথা।

সাগ্নিকরঞ্জন গুপ্ত

তার নেশা ট্রাম। প্যাশন ট্রাম। কলকাতা তো বটেই পৃথিবীর কোন শহরে কীভাবে ট্রাম চলে আর সেই ট্রামের খুঁটিনাটি তার নখদর্পনে। ট্রামের বিষয়ে চলন্তিকাও বলতে পারেন সহজেই। মৃত্যুর দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া এক গণযানকে এ শহরের বুকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন যুদ্ধ করে চলেছে সে। এই যুদ্ধে সে ক্লান্তিহীন সৈনিক। কী মমতায় ঘুরে বেড়ায় ট্রামের ডিপোতে ডিপোতে। দেখে আসে কেমন আছে তারা। এ তার নিত্য নৈমিত্তিক রুটিন।

কলকাতার ট্রামের সংখ্যা, ট্রামের রুট, বিবর্তন, ইতিহাস ভূগোল এমনকি ট্রামের শরীরের প্রতিটা যন্ত্রাংশ – নাটবোলটসের হিসাবও গড়গড় করে বলে যায় সে। এ নেহাত মুখস্ত বিদ্যের দৌড় নয়। প্রতি কথার শেষে ঝরে পড়া আফসোস বুঝিয়ে দেয় ট্রামের প্রতি তার দুর্নিবার ভালবাসার কথা।

লেকটাউনে বাড়ি। লেক রোডে অফিস। ১০-৮টার অফিস। এডিটিং-এর ঝড়ের বেগে কাজের চাপ। সেই সময়টুকু বাদ দিয়ে তার বাকি সবটা সময় জুড়ে কেবল কলকাতার ট্রাম। ট্রামের লেটেস্ট আপডেট, মিটিং, আলোচনা, আইন আদালত, উকিলি লড়াই সব দায়িত্বে আছে সে।

কীভাবে পেয়ে বসল এমন ট্রামের নেশা?

সেই গল্প বলতে গিয়ে সাগ্নিক বলে ছোটোবেলা থেকেই নিজের শহরটাকে চিনতে জানতে দেখতে ইচ্ছে করত। ক্লাস ইলেভেনের পর যখন বাড়ি থেকে একটু ছাড় মিলল, তখন থেকেই শহরটাকে অন্যভাবে চেনার শুরু। পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ পা চলত। এক কলকাতার মধ্যে কত রকম কলকাতা। শহর চেনার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের গণপরিবহন – মেট্রো, ট্রাম, ট্রেন এগুলির প্রতিও ক্রমশ আগ্রহ বাড়তে লাগল।

তাদের আদি বাড়ি উত্তর কলকাতার হাতিবাগানে। পিছনে গঙ্গা। পাশে কুমোরটুলি। আর তারও পাশে ট্রাম লাইন। ঘণ্টি  বাজিয়ে ট্রাম চলে যায়। বাড়িময় ট্রামের গল্প। বাবা-দাদু ডাবলডেকার বাসে চেপে অফিস যেতেন। ঘরে ফেরেন ট্রামে। তাঁরাও বেজায় ট্রামভক্ত। সাগ্নিকের কথায় তার ট্রাম ভক্ত হয়ে ওঠার পিছনে এইসবই অনুঘটকের কাজ করেছে।

বড়ো হয়ে যখন ২০১ ট্রামের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, দেখেই মনে হয়েছিল কোনওভাবেই এই জিনিসটাকে এই শহর থেকে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। কারণ এই শহরের ইতিহাস আর ট্রামের ইতিহাস গায়ে গা লাগিয়ে আছে। সমস্ত ধরনের গণ পরিবহনের থেকে আলাদা তার চরিত্র।

শুরু হয়ে গেল রিসার্চ। গোটা পৃথিবীতে ট্রাম ফিরছে কিন্তু কলকাতায় কেন ক্রমশ ছোটো হচ্ছে ট্রামের আয়ুরেখা? নানাভাবে চলতে লাগল উত্তরের খোঁজ। সেভাবেই যুক্ত হয়ে পড়ে ‘ট্রাম বাঁচাও’ আন্দোলনের সঙ্গে।

ট্রামের স্মৃতি সংগ্রহ তার কাছে আলাদা কোনও নেশা নয়, ট্রামের প্রতি ভালবাসা থেকেই এসেছে। বলা ভাল এ যেন তার নিজের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা। তার কথায়, এশিয়ার প্রাচীনতম কলকাতা ট্রামের ১৫০ বছর উদযাপন করা হলেও তার সেভাবে আধুনিকীকরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। যা হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন সামান্যই। তাই এই যানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা যে কোনও চিহ্নই ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান। কিন্তু তার মূল্যকে বোঝার মতো সচেতন মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই অনেক জিনিস বাতিল হয়ে যায় অবলীলায়। পড়ে পড়ে নষ্ট হয় ট্রামের রুট বোর্ড, অনেক পুরোনো টিকিট, ট্রাম কর্মীদের ব্যবহার করা বহু আগের ইউনিফর্ম, টুপির মতো জিনিস। সেই সব ‘বাতিল’ জিনিস সংগ্রহ করে সে। আগামী প্রজন্মের জন্য। সময়ের আঁচড়ে ক্ষয়ে যাওয়া জিনিস বাঁচিয়েই সাগ্নিকের আনন্দ।

কলকাতা ট্রামের পুরোনো টিকিট

সাগ্নিকের মনে ট্রামপ্রীতির বীজ বুনে দিয়েছিলেন বাবা উদিতরঞ্জন গুপ্ত। ২০১৬ সালে তাঁর সঙ্গেই কলকাতা-মেলবর্ন ট্রাম ফেস্টিভ্যালে গিয়ে জানতে পারে যে কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমস্ত ট্রামপ্রেমীদের এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে কলকাতার ঐতিহ্য ট্রামকে। ট্রামের আধুনিকীকরণ, বিশ্বমানের যাত্রী পরিষেবামতো ইস্যুগুলিও আছে। এভাবেই তৈরি হয় ‘ক্যালক্যাটা ট্রাম ইউজার্স এসোসিয়েশন’ (Calcutta Tram Users Association)। যার সক্রিয় কর্মী সাগ্নিক।

বাঁদিক থেকে ডানদিক: প্রফেসর ভার্গব মৈত্র (আইআইটি খড়গপুর), সাগ্নিকরঞ্জন, ডঃ দেবাশিস ভট্টাচার্য (গবেষক, CTUA-এর সভাপতি), চঞ্চল দাস (CTC-এর ট্রাম-চালক)

বুড়ো শহরে বুড়ো যান- মন্থর গতি, লজঝড়ে চেহারা, ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বলে যতই ব্যঙ্গ করা হোক সাগ্নিকের দলে সে কিন্তু একা নাবিক নয়। তার সঙ্গেই আছে আরও বহু মুখ। ইলেভেন-টুয়েলভ থেকে ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রছাত্রীও আছে। তারা মনেপ্রাণে চায় বেঁচে থাক কলকাতার ট্রাম। ব্যস্ত শহরে অভাগী দুয়োরানীর মতো নয়, বরং গোটা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সদর্পে আপন অভিজাত্যে। ট্রাম বাঁচাতে পথে নামে তারা। দিনের পর দিন পড়ে থাকে ট্রাম গুমটিতে। উৎসবে অনুষ্ঠানে নিজেদের তুলির টানে রাঙিয়ে তোলে বুড়ো ট্রামগাড়ির প্রাচীন শরীর। যানের ছবি ওঠে, রিল বানায়,সেলফি তোলে মানুষ। শুধু আড়ালে রয়ে যায় নিঃস্বার্থ ভালবাসার গল্পগুলো।

মন প্রাণ জুড়ে যে কেবল ট্রাম-নাম, প্রেমিকা রাগ করে না? উত্তরে হাসতে হাসতে সাগ্নিক বলে, “ধুর! ট্রামের কাজ করতে গিয়েই তো আমাদের আলাপ। বাড়ি থেকেও বাধা আসার প্রশ্নই নেই। এই শহরের গর্বের যানকে বাঁচিয়ে রাখতে যে লড়াই তাকে পূর্ণ সমর্থন দেয় বাড়ি।”

তবে ট্রামের লড়াই লড়তে গিয়ে বিপদ আসেনি তেমন নয়। হুমকি এসেছে। সাবধানবাণী শুনিয়ে গেছে অচেনা লোক- সাগ্নিক তবু স্বপ্ন দেখার দৃষ্টি বদলাতে রাজি হয়নি। এমন সদা ব্যস্ত জেট গতির শহরে ধীর গতির যান ট্রাম কি সত্যিই বেমানান নয়? সপাটে উত্তর দেয় সাগ্নিক- ‘একেবারেই না’। পৃথিবীর সাড়ে চারশো শহরে ট্রাম চলে। কলকাতায় ট্রাম চলছে দেড়শো বছর ধরে। সারা পৃথিবী কলকাতার ট্রামকে কদর করে, শুধু নিজেদের শহরের মানুষ ছাড়া। আমরা বোধহয় তাকে মিউজিয়ামে দেখতে পেলেই সবচেয়ে খুশি হই।

এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আছে চাইছে সাগ্নিক আর তার দলবল। তারা চায় ১৯৮০-র পুরোনো সেই ট্রাম নয়, ঝকঝকে মেগাসিটিতে চলুক তরতরিয়ে স্মার্ট ট্রাম।

জাপানের শহর হিরোশিমা। সেখানে শহর জুড়ে চলত ট্রাম। ১৯৪৫-এর ৬ অগাস্ট সকালে হঠাৎ শহরের বুকে নেমে এলো পরমানুবিক বোমার আঘাত। তার ঠিক ২ ঘণ্টা আগেও যাত্রী নিয়ে চলছিল ট্রাম। এমনকি আনবিক আঘাতও স্তব্ধ করতে পারেনি তার গতি। ধ্বংসস্তুপ হিরোশিমায় মাত্র তিনদিন বন্ধ ছিল ট্রাম পরিষেবা। তারপর সে আবার স্বাভাবিক। আজও চলছে…

কলকাতার ট্রাম কি মৃত্যুঘণ্টার ডাক শুনতে পাচ্ছে? এক কথায় তেমন সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে আশাবাদী সাগ্নিকের জোর গলার দাবী- কলকাতা শহরে ট্রাম ছিল, আছে, থাকবেও…

Post Tags
Developed by DXDasia