
‘চোখ থাকতে অন্ধ’ প্রবাদটি হতাশাজনকভাবে আজ সকলের জন্য প্রযোজ্য মনে হলেও, আসলে তা নয়। বরাবরই চোখ ইন্দ্রয়টি কারো কারো জন্য শুধুই দেখার যন্ত্র আবার, কারো কারো কাছে চোখ হল বিশেষ সচল দর্শন। কিছু দৃশ্য অক্ষয় হয়ে মনে থেকে যায়। অক্ষয় করে রাখেন রঘু রাই (Raghu Rai) – তাঁদের মতো মহীরুহরা। আমরা যারা কলকাতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে বাঁচি বলে ভাবি, তারা কি কলকাতাকে (Kolkata) সেভাবে চিনি, যেভাবে রঘু রাই দেখেছেন?

৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারত-প্রতিমায় চক্ষুদান করে গেছেন প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রী। রঘুনাথ রাই চৌধুরীর চোখে চোখ রেখে তাবড় তাবড় ভারতীয় আলোকচিত্রীরা ক্যামারার আর্তি শুনতে শিখেছেন। তাঁর ছবি সমকালীন পৃথিবীকে চিনিয়েছে। চিনিয়েছে কলকাতাকে। ১৯৬৫ সালে কলকাতায় স্টেটসম্যানের চিফ ফটোগ্রাফার হিসেবে কর্মজীবনের শুরু। সেই যে পা রাখলেন এই শহরে, এই বাংলায়; ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে এক আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়ে গেল। তাঁর কথায় “অন্য কোনও শহর নিয়ে আমি এত কাজ করিনি। বার বার ফিরে এসেছি এখানকার মানুষের অদম্য জীবনীশক্তিকে উপভোগ করতে। গঙ্গার ক্রমবর্দ্ধমান দূষণ সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল, কিন্তু যখন আমি প্রথমবার কলকাতা বা হুগলির গঙ্গার ঘাটগুলো দেখি, সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, যেটা নিয়ে আমার কোনও ধারণা ছিল না।”


অত্যাধুনিক সেকেন্ড হুগলি ব্রিজের নিচ দিয়ে নৌকার দাঁড় বেয়ে চলেছে সারে সারে মাঝি, তাঁর কাছে এটাই কলকাতার ছবি। আবার সকাল সকাল মল্লিক ঘাটে, একজন পালোয়ান শবাসন করছে, একজন প্রাণপণ আর্চ করছে, আর এই ফোঁসফোঁস শরীরচর্চার পাশে, একজন ভবঘুরে চাদর জড়িয়ে ঢুলছে, একজন আনমনে মাথা চুলকোচ্ছে। আবার, ফুটপাতে একটা পরিবার ঘুমোচ্ছে, ছোট্ট বোনকে তার ছোট্ট দিদি গালে হাত বুলিয়ে কান্না থামাচ্ছে, আর তাদের মাথার পেছনে কী করে কে জানে দেওয়ালে আঁকা হয়ে আছে মাদার টেরেসার একটা ছবি, তাঁর কাছে এই ম্যাজিকটাই কলকাতা।
অসাধারণ সব ইতিহাসের সাক্ষী থাকা বাড়ি, তার আশ্চর্য প্রাচীন ও অভিজাত স্থাপত্য, তার ডিটেল, প্রত্যেকটি দেওয়ালে সাহেবিয়ানা এবং তার মধ্যে বসবাসকারী আজকের কলোনিয়াল বাঙালিরা— অসামান্য সব বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট। জমজমাট, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। তাঁর দেখা অন্যান্য শহরগুলির মধ্যে কলকাতা সবাইকে ছাপিয়ে গেছে কাছে টেনে নেওয়ার এক বিরল, উষ্ণ ইচ্ছাশক্তির জোরে। এই মানসিকতাটাই তিনি লেন্সবন্দি করে গিয়েছেন। তাই বারে বারে ফিরে এসেও আসাটা ফুরিয়ে যায়নি তাঁর। তাঁর চোখে এই শহর ধারাবাহিক ভাবে মনোক্রোম থেকে রঙিন হয়েছে – ক্যালকাটা থেকে কলকাতা হয়েছে। https://raghuraifoundation.org/films/-এখানে আর্কাইভ করা আছে রঘু রাইয়ের কলকাতা।


তাঁর ছবি এতটাই গতিময় যে মনে হয় স্থির হয়ে আছে। প্রতিটা ছবিতেই তিনি শহরটার স্পিরিটটাকে ধরতে চেয়েছেন। ছবি তোলা ব্যাপারটাই তো তা-ই। এ তো শুধু একটা দৃশ্যের বিবরণ দেওয়া নয়। সেই দৃশ্যের মধ্যে থাকা স্পিরিটটাকে বের করে আনতে চাওয়া। নিজে লিখেছেন, “কলকাতায় দেখেছি, অন্য লোকে যা নিয়ে চলতে গেলে মুষড়ে পড়বে, হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে, তাকে অনায়াসে বগলদাবা করে ঘুরে বেড়াতে, দুর্দশার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে হো-হো করে অট্টহাসি হেসে উঠতে।”
রঘু রাই
তিনি যেভাবে কলকাতাকে আবিষ্কার করেছিলেন, সেইভাবে তাঁকে আবিষ্কার করেছিলেন ‘দ্য ডিসিসিভ মোমেন্ট’-এর প্রবক্তা, সাড়া জাগানো আলোকচিত্রী হেনরি কারতিয়ের ব্রেসঁ। ১৯৭১-এ প্যারিসে একটি আলোকচিত্র-প্রদর্শনীতে কিংবদন্তি ফটোগ্রাফার হেনরি কারতিয়ের ব্রেসঁ-র সঙ্গে আলাপ রঘু রাইয়ের, তাঁর সুপারিশেই ম্যাগনাম ফোটোস-এ যুক্ত হওয়া। কলকাতার বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শুভময় মৈত্র, রঘু রাই-এর কলকাতার ছবিগুলিকে তিনি কীভাবে দেখেন? শুভময় জানান, “ওঁর সঙ্গে অনেকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। এই বয়সেও এত বিপুল এনার্জি, সারাক্ষণ কিছু না কিছু করছেন। যেমন হাসিখুশি, তেমনই তাঁর গাম্ভীর্য, ব্যক্তিত্ব। রঘু রাইইয়ের ছবি চুম্বকের মতো, তার জোরালো আবেদন আছে, আকর্ষণ আছে, যা এখনও পর্যন্ত কেউ ছাপিয়ে যেতে পারেনি। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, বাংলাদেশ ৭১-এর শরণার্থী শিবিরের ছবি তো অনেকেই তুলতে গিয়েছিল, সারা পৃথিবী একজনের ছবিই মাথায় করে রাখলো। তিনি ‘লিভিং লেজেন্ড’ রঘু রাই। পৃথিবীতে দুঃখ-দুর্দশা আজও চড়া দামে বিক্রি হয়। রঘু রাই-এর ছবিতেও ধরা পড়ে অস্থির সময়ের প্রতিবিম্ব, দুঃখ, দুর্দশা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা। তারপরেও সেসব ছবির এমন একটি ‘বোধ’ থাকে, যা অমূল্য, একবার দেখলে ভোলা যায় না। জীবনানন্দের ‘আমরা যাইনি ম’রে আজো— তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’। তাঁর কলকাতার ছবিগুলোর ক্ষেত্রেও তার হেরফের হয়নি। কত নামী ফটোগ্রাফার কলকাতার ছবি তুলেছেন, সেসব খারাপ ছবি, তা নয়। দারুণ দারুণ সব ছবি। কিন্তু রঘু রাই যেভাবে এই শহরটাকে দেখতে পেয়েছিলেন, সেভাবে অন্য কেউ পারেননি, একজন আলোকচিত্রী হিসেবে এ কথা বলছি। সকলে রঘু রাই হতে চায় তবে রঘু রাই একজনই।”
_____________________
তথ্যসূত্র: raghuraifoundation.org, Raghu Rai Hearing Through The Eyes (ফিল্ম ডিভিশন-এর তথ্যচিত্র), আনন্দবাজার পত্রিকায় রঘু রাইয়ের লেখা ‘ছোট্ট বোনকে ছোট্ট দিদি ঘুম পাড়াচ্ছে ফুটপাতে’
কৃতজ্ঞতা: শুভময় মৈত্র
